ঢাকা      সোমবার ১৮, জুন ২০১৮ - ৪, আষাঢ়, ১৪২৫ - হিজরী



ডা. রেদওয়ান বিন আবদুল বাতেন

জনস্বাস্থ্য গবেষক

ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া


রোড টু পিএইচডি-১৪: GRE ভীতি

আমেরিকায় অ্যাপ্লাই করতে গেলে অনেকের কাছে যে বিষয়টি সবচেয়ে কঠিন হয়ে দাঁড়ায় তা হলো GRE. GRE হলো ETS পরিচালিত একটি পরীক্ষা যার পুরো প্রসেসটি অনলাইনে সম্পন্ন করতে হয়।

প্রথমে GRE ওয়েবসাইটে গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলবেন। পরীক্ষার তারিখ, স্থান এবং সময় চয়েস করে নির্দিষ্ট ফি জমা দেবেন। এই তো – খুব সহজ।

এক্সাম সেন্টারে যাবার পর ওরা আপনার পাসপোর্ট দেখে, ছবি তুলে ভেরিফাই করার পর একটি রুমে নিয়ে গিয়ে একটি কম্পিউটারের সামনে বসিয়ে দেবে। সেখানে বসে আপনি পরীক্ষা দেবেন। এক্সামের মাঝে একটি বিরতি পাবেন। তখন ক্লান্ত হয়ে আসা নিউরনগুলোকে চাঙ্গা করার ব্যর্থ চেষ্টা করবেন।

GRE হয় ৩৪০ নাম্বারে। এর মধ্যে ম্যাথ বা এনালাইটিক্যাল পার্টে ১৭০ এবং ইংরেজি বা ভার্বাল পার্টে ১৭০ নম্বরের পরীক্ষা হয়। রাইটিং এ দু’টি কম্প্রিহেনশান লিখতে হয় – সেটিকে আলাদাভাবে স্কোরিং করা হয়।

৭-৮ ভাগে প্রায় ৫ ঘন্টা ধরে এক্সাম চলবে। প্রথমে আধা ঘন্টা করে ২টি কম্প্রিহেনশানের জন্য ১ ঘণ্টা সময় পাবেন। তারপর আধা ঘণ্টা করে ৪টি সেশন। প্রথমে ম্যাথ বা ইংরেজি যে কোন একটি পেতে পারেন। তারপর অল্টারনেটলি চলতে থাকবে। ৪টি সেশনের মাঝে আরও একটি সেশন থাকবে যেটি আপনার স্কোরিং এ যোগ হবে না, কিন্তু সেটি পরবর্তী কোন পরীক্ষায় জন্য ব্যবহৃত হবে। এটি আপনাকে জানাবে না তাই পুরো ৫টি সেশনই ভালোভাবে সম্পন্ন করতে হবে।

এবারে আসুন পরীক্ষায় কী আসে, কীভাবে প্রস্তুতি নেবেন এসব ব্যাপারে। প্রথমেই পরিষ্কারভাবে বলে নেই, আমার কাছে GRE খুব কঠিন মনে হয়েছে। মেডিকেল লাইফে বহু ধাপে অনেক কিছু পার করে এলেও এই GRE আমাকে যেরকম ভুগিয়েছে তার তুলনা হয় না।

এর নানাবিধ কারণ আছে। আমার ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুদের কাছে GRE ডালভাত ব্যাপার। পরীক্ষায় বসলে হেলায় ৩৩০ এর উপরে নাম্বার পাচ্ছে। ৩৪০ এর কাছে চলে যাচ্ছে। ওদের জন্য কাজটা তুলনামূলক সহজ মনে হয়। আসলে তা নয়, কাজটি ভালোই কঠিন। কিন্তু ওদের ম্যাথ প্র্যাকটিস থাকে বলে ম্যাথের ১৭০ এর মধ্যে প্রায় পুরোটাই ওরা নিজের স্কোরবোর্ডে নিয়ে আসতে পারে। ফলে ইংরেজিতে কিছুটা কম পেলেও সমস্যা হয়না। কাভার হয়ে যায়।

এখানে আমরা ডাক্তারেরা দ্বিমুখী সমস্যায় পড়ি। ম্যাথ প্র্যাকটিস থাকে না বলে এগুলো আয়ত্তে আনতে সময় নষ্ট করতে হয়। কিছু এডভান্সড লেভেলের ম্যাথ থাকে যেগুলো বোঝার জন্য মাথা চুলকাতে হয়। এভাবে কিছু সময় বেশি লাগে।

ইংরেজি পার্টটি সবার জন্যই কঠিন বলেই মনে হয়। GRE’র এই ইংরেজি আর সারা জীবন যে ইংরেজি শিখে এসেছেন তার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। তাই সারা জীবন ইংরেজিতে হাইয়েস্ট নাম্বার পেয়ে আসলেও এখানে আপনাকে স্ট্রাগল করতে হবে।

এর মূল কারণ, GRE’র জন্য আপনাকে অনেক ওয়ার্ড মুখস্ত করতে হবে যেগুলো আমাদের দেশে সচরাচর ব্যবহার হয় না বললেই চলে। এজন্য বিভিন্ন বইয়ে ওয়ার্ড লিস্ট আছে। যে কোন একটা বই ধরে পড়া শুরু করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

একটি বই এর লিস্ট শেষ করার পর অন্য বই নিয়ে কাজ শুরু করুন। ততদিনে অনেক ওয়ার্ড আপনার দখলে চলে আসবে। মোটামুটি হাজার দু’য়েক ওয়ার্ড জানা থাকা প্রয়োজন। ব্যক্তিভেদে এই সংখ্যাটি কম বেশি হবে। যাদের ভোকাবুলারি আগে থেকেই শক্ত, তাঁদের কষ্ট কম হবে। কিন্তু কষ্ট সবারই হবে এটি গ্যারান্টি দিয়ে বলা যায়।

এর কারণ হলো শুধু ওয়ার্ড জানলেই হবে না। সে ওয়ার্ডের এপ্লিকেশানও জানতে হবে। মূল সমস্যাটা এখানেই। আপনি হাজার কয়েক ওয়ার্ড জানেন – শাবাশ। কিন্তু কোন বাক্যে সে ওয়ার্ডটি দেখলে আপনার মাথায় গুবলেট পাকিয়ে যায়। এই শব্দ এখানে কেন? কি বলতে চাইছে এ দুষ্টু শব্দটি? – এ ধরনের তাত্ত্বিক চিন্তাধারা আপনাকে বিহ্বল করে ফেলবে।

জগত এবং জীবনের প্রতি আকর্ষণ হারিয়ে বনবাসে চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবেন এবং সুন্দরবনে আজও রয়েল বেঙ্গল টাইগার আছে কি নেই সে বিষয়ে গুগলে একখানা সার্চও দিয়ে ফেলবেন। কিন্তু তারপর ব্যাকস্পেস চেপে সার্চবারে আবারও কোন একটি ফালতু GRE ওয়ার্ড টাইপ করবেন এবং এন্টার বাটনে ঘুষি দিয়ে ফের চুল ছিড়বেন। ব্যাপার না ভাই। আপনি একা নন। সবাই একই কাজ করছে। এজন্যই শ্যাম্পু কোম্পানিগুলো টিকে আছে এই ভেবে সান্ত্বনা নিন।

তো এই কন্টেক্সট বোঝাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কোন ওয়ার্ড কোথায় কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে বুঝে পড়তে হবে। এটা আবার রাইটিং এর সময় আপনার কাজে আসবে। এগুলো আপনাকে হেল্প করবে TOEFL/IELTS পর্যন্ত।

GRE’র জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো খুব দ্রুত পড়ার অভ্যাস করা। দ্রুত পড়ে আর্টিকেলে আসলে কী বলতে চাইছে , মূল থিমটি কী – এটা বোঝা খুব জরুরি একটি স্কিল। এটি না থাকলে তৈরি করতে হবে। স্কিপ করা যাবেনা। তাই প্রচুর পড়ার অভ্যাস করতে হবে।

নেটে খুব ভালো কিছু রিডিং সাইট আছে – যেখানে আর্টকেলগুলো GRE ওয়ার্ড ব্যবহার করে লিখে – যেমন Newyorker, Atlantic ইত্যাদি। এই সাইটগুলো নিয়মিত পড়বেন। বাংলা পত্রিকার ফালতু পলিটিক্যাল নিউজ আর গোবড়ভরা রাজনৈতিক কলাম পড়ে সময় নষ্ট করবেন না। সাধারণ পত্রিকার ইংরেজি আর্টিকেল পড়ে খুব একটা লাভ হয়না। GRE ওয়ার্ড ব্যবহার করে লিখা আর্টিকেলের কোয়ালিটিগত পার্থক্য আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন।

GRE’র জন্য বাজারে অনেক বই পাওয়া যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি Princeton এর বই ব্যবহার করে সবচেয়ে বেশি উপকার পেয়েছি। ম্যাথ এর জন্য Nova’s Math Bible, Manhattan 1-6 এগুলো ব্যবহার করতে পারেন। ইংরেজির জন্য Barrons, Manhattan 5Lb, Magoosh, ETS নানা ধরনের বই পাওয়া যায়। সবগুলোই প্রয়োজন।

কোন বইটি আগে পড়বেন আর কোনটি পরে পড়বেন এটি ব্যক্তিভেদে হেরফের করবে। এখানে কোন স্পেসিফিক অর্ডার বা সিরিয়াল নেই। যেটা আপনার সহজ মনে হয় সেটা দিয়ে শুরু করাই ভালো।

GRE’র জ্ঞান আহরণের এই প্রক্রিয়াটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমেরিকায় বা পৃথিবীর যেখানেই আপনি পড়তে যান না কেন GREতে শিখে আসা শব্দ এবং তার অ্যাপ্লিকেশান আপনার কাজে আসবেই। এ নলেজের বেজ ছাড়া রিসার্চ লাইনে আপনি খুব একটা সুবিধা করতে পারবনে না। তাই কষ্ট করে হলেও বুঝে পড়বেন, GRE আয়ত্তে আনার বৃথা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন।

ফেসবুকে প্রচুর GRE রিলেটেড গ্রুপ আছে। সেগুলোতে যোগদান করুন। এগুলোর আলোচনায় সময় ব্যয় করুন। অনেক গ্রুপে পুরনো কিন্তু ভালো কোন নোট বা টিপস বা বই বা এক্সপেরিয়েন্স ফাইল আকারে আপলোড করা থাকে। প্রতিটি জিনিসই গুরুত্বপূর্ণ।

GRE নিয়ে আমার সকল জ্ঞান ফেসবুক থেকে পাওয়া – এক বাক্যে স্বীকার করি এবং নাম জানা অজানা কন্ট্রিবিউটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই এবং দোয়া করি তাঁদের জন্য।

একটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট হলো আপনি GRE’র অনেকগুলো ফ্রি মক টেস্ট বাসায় বসে ল্যাপটপে দিতে পারবেন। উপরে উল্লেখ করা বইগুলোর প্রতিটির নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে। প্রতিটি সাইটে ১/২/৪ টি করে ফ্রি মক টেস্ট দেয়া যায়। আমি প্রায় ৬-৮টি মডেল টেস্ট দিয়েছিলাম। বলার অপেক্ষা রাখে না যে চরমভাবে উপকৃত হয়েছিলাম।

মডেল টেস্টগুলো একেবারে মূল এক্সামের ফরম্যাটে হয়ে থাকে। তাই GRE পরীক্ষার জন্য যে সময়, পরিবেশ দরকার তা তৈরি করে ঠান্ডা মাথায় ভরপেটে মক টেস্ট দিতে বসুন। এখানে আবারও – ল্যাপটপ, মডেম ইত্যাদি লজিস্টিক্স আপনাকে সাহায্য করবে।

এক্সামের পর স্কোর দেখতে পাবেন। নিজের সৃষ্ট অশ্ব ডিম্বটিকে বিশাল আকারে দেখতে পেয়ে বেজায় পুলকিত হবেন। কোন হাতির জন্য এতদিন ঘাস কাটলাম – এ আত্মবিশ্লেষনমূলক প্রশ্নের সম্মুখীন হননি – এমন মহামানব/বী বিরল।

মক টেস্টগুলো মূল পরীক্ষার ঠিক আগ দিয়ে দিতে থাকবেন। বেশি আগে দেবেন না তাহলে কাঙ্ক্ষিত উপকার পাবেন না। মক টেস্ট দেবার পাসওয়ার্ড, লিংক ইত্যাদি সবকিছু ফেসবুকে পাবেন। নিজের সার্চ স্কিল অ্যাপ্লাই করে এগুলোর তালিকা করে ফেলুন এবং পূর্ণ প্রস্তুতির পর মক টেস্ট দিয়ে নিজেই নিজেকে মক করুন।

কোন এক বিশিষ্ট বুদ্ধি-বিক্রেতা গুনীজন বলেছিলেন, “প্রতিটি মানুষের জীবনে অন্তত একবার GRE দেয়া উচিত। GRE দেবার পর হল থেকে বের হয়ে নিজের যে মানসিক অবস্থা দাঁড়ায় তা ভুক্তভোগী ব্যতীত কেউ বুঝতে পারবে না। আপনি কিছুই জানেন না এমন অনুভূতি অন্য কোন এক্সাম বা অভিজ্ঞতা আপনাকে দিতে পারবে না। তাই প্রতিটি শিক্ষিত মানুষেরই জীবনে অন্তত একবার GRE দেয়া উচিত।”

ডিসক্লেইমার

পূর্ববর্তী পর্ব: রোড টু পিএইচডি-১৩: ল্যাপটপ মডেম ইন্টারনেট

পরবর্তী পর্ব: রোড টু পিএইচডি-১৫: IELTS নাকি TOEFL

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


এডু কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

ক্যারিয়ার ও সাবজেক্ট চয়েস

ক্যারিয়ার ও সাবজেক্ট চয়েস

মনে রাখব, ডাক্তার জীবন একটি কন্টিনিয়াস জার্নি অফ এক্সিলেন্স।  সো ক্যারিয়ার প্ল্যান…

উচ্চশিক্ষা সীমানা পেরিয়ে

উচ্চশিক্ষা সীমানা পেরিয়ে

কথা দিয়েছিলাম ২য় পর্ব নিয়ে আবার আসব। তাই দেরী না করে চলে…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর