০৮ অক্টোবর, ২০১৭ ১০:৩৪ এএম

তবু মানুষের সেবায় ইরানি বাড়ৈ

তবু মানুষের সেবায় ইরানি বাড়ৈ

ইরানি বাড়ৈ নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে (ভিক্টোরিয়া) কাটিয়েছেন অনেক বছর। তাই যখন তিনি জীবনের খাতা মেলে ধরলেন, তার অনেকটা জুড়েই রইল এই হাসপাতালের কথা।

৩ অক্টোবর আমাদের আলাপ শুরু হয়েছিল সেই হাসপাতালেরই নিচতলায়। র‍্যাম্প ধরে ওপরে যেতে যেতেই জিজ্ঞেস করেছিলাম, আপনার অনুপ্রেরণা কে? নতুন বৈদ্যুতিক হুইলচেয়ারটা থামিয়ে, মুখে মৃদু হাসি ধরে রেখে বললেন, ‘নিজেই’। একটু পর বললেন, ‘জীবনের অনেকটা সময় যুদ্ধ করেই এতটা পথ চলছি।’

তরুণ ইরানি বাড়ৈ

ইরানি বাড়ৈর জীবনগল্প শোনার পর এই কথাগুলো আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। ৫১ বছর বয়সী ইরানি বাড়ৈ যখন দুই পায়ের শক্তি হারান, তাঁর বয়স তখন ৩০। তারও বছর সাতেক আগে বিয়ে করেছেন, ঘর আলো করে এসেছে দুটি সন্তান। মানুষের জীবনের রঙিন সময় এই তো। ঠিক তখনই এক আকস্মিক ঝড়ে ভেঙে যেতে বসেছিল সবকিছু। কিন্তু তিনি ঘুরে দাঁড়িয়েছেন। সব প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ফিরেছেন হাসপাতালে। হুইলচেয়ারবন্দী জীবন নিয়েও সেবা দিয়ে চলেছেন অসুস্থ রোগীদের। এমন একজন মানুষ আর কাকেই বা নিজের অনুপ্রেরণা মানবেন!

কথা বলতে বলতে ততক্ষণে আমরা থেমেছি হাসপাতালের উপসেবা তত্ত্বাবধায়কের কক্ষে। সেখানে বসে ছিলেন জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স ইরানি বাড়ৈর কয়েকজন সহকর্মী। তত্ত্বাবধায়কের চলতি দায়িত্বে থাকা জ্যেষ্ঠ স্টাফ নার্স লুৎফা বেগম বললেন, ‘আমরা তাঁর সুবিধার কথা বিবেচনা করে নিচতলার ডায়রিয়া ওয়ার্ডে দায়িত্ব দিয়েছি। সেখানেই শিফট ধরে কাজ করেন তিনি।’

নার্সের কাজই ইরানি বাড়ৈর প্রাণ। প্রতিদিন নিয়ম মেনে হাসপাতালে আসেন। ওয়ার্ডে ঢুকেই একে একে রোগীদের খোঁজ নেন। সাধ্যমতো পরামর্শ দেন। যখন সুস্থ ছিলেন, তখনো যেভাবে রোগীদের সেবা দিতেন, ১৯ বছর ধরে হুইলচেয়ারে ভর করে সেই সেবা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ইরানি বাড়ৈ আমাদের নিয়ে যান হাসপাতালের কোয়ার্টারে, তাঁর বাসায়। সেই বাসাতেই শোনা হলো তাঁর বাকি কথা।

 

এক রাতের জ্বর

১৯৯৬ সালের ডিসেম্বর মাসের এক রাতের কথা। খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছিলেন ইরানি বাড়ৈ। রাতে যখন ঘুম ভাঙল, অনুভব করলেন জ্বরে তাঁর গা পুড়ে যাচ্ছে। রাতটা কাটল বেঘোরে। সেই সকালের কথা বললেন পাশে বসা ইরানি বাড়ৈর স্বামী সায়মন সিকদার, ‘খুব ভোরে ওঠা ইরানির প্রতিদিনের রুটিন। তখন সকাল নয়টা, খেয়াল করলাম সে ঘুম থেকে ওঠেনি। ডাকতে গিয়ে দেখি ভীষণ অসুস্থ, জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে।’

বিছানায় উঠে বসতে গিয়ে বুঝতে পারলেন, ইরানি বাড়ৈর হাত-পা সাড়া দিচ্ছে না। তিনি উঠতে পারছেন না। শরীর আটকে আছে বিছানার সঙ্গে। বুক ফেটে কান্না চলে এল ইরানির।

দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলো। এ-হাসপাতাল ও-হাসপাতাল করে কাটল বছরখানেক। এরপর নেওয়া হলো ভারতের চেন্নাইয়ে, কিন্তু সেখানেও কোনো আশার আলো দেখতে পেলেন না।

 

রোজকার সব কাজ করেন এই হুইলচেয়ারে বসেই

সন্ধিক্ষণে সিআরপি

সুস্থ জীবনে ফেরার আলো তখন নিবুনিবু। শয্যাশায়ী ইরানি বাড়ৈ খুব করে চাচ্ছিলেন, তাঁকে যেন কোনো পুনর্বাসন কেন্দ্রে রেখে আসা হয়। কারণ, তাঁর পেছনেই একজনকে নিয়মিত লেগে থাকতে হয়। ছোট দুই মেয়েকে দেখার কেউ থাকে না। এ রকম একটি সময়ে ভর্তির সুযোগ পান সাভারের পক্ষাঘাত পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি)। নিউরোসার্জন ডা. ফজলুল হকের তত্ত্বাবধানে সেখানেই তাঁর চিকিৎসা শুরু হয়। কয়েক মাস গড়াতেই হাতে শক্তি ফিরে পান। ইরানি বাড়ৈ বলেন, ‘আমি যেহেতু নার্স ছিলাম, তাই পুনর্বাসন-প্রক্রিয়ায় আমাকে সেই কাজটিই করতে দেওয়া হলো।’ ওয়ার্ডে নার্স হিসেবে কাজের সুযোগ পেয়ে ইরানি যেন ফিরে পেলেন নতুন করে বাঁচার পথ। আনন্দের সঙ্গে তিনি সেই কাজ করতে লাগলেন।

১৯৯৮ সালে অনেকটাই সুস্থ হলেন। তবে দুই পায়ের শক্তি আর ফিরে এল না। ইরানি ফিরলেন হাসপাতালে। বললেন, ‘অনেক সমস্যা ছিল যোগ দেওয়ার পর। অনেকে ভাবত, আমিও সেবা নিতে আসা রোগী। কিন্তু মানিয়ে নিয়েছি। তখন নার্সের সংখ্যা অনেক কম ছিল, হুইলচেয়ারে বসে আউটডোরে আসা রোগীদের দেখাশোনা করেছি।’

 

হাসপাতালে সহকর্মীদের সঙ্গে ইরানি বাড়ৈ। ছবি: ছুটির দিনে

শান্তি কুটিরে স্বপ্নপূরণ

ইরানি বাড়ৈর জন্ম গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়া উপজেলার বেতকাঠিয়া গ্রামে। এলাকার নারকেলবাড়িয়া উচ্চবিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে ভর্তি হন বরিশালের ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখান থেকেই তিনি এসএসসি পাস করেন। এরপরই নতুন এক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন ইরানি বাড়ৈ। অসচ্ছল পরিবারে আট ভাইবোনের পড়াশোনার খরচ চলাতে হিমশিম খেতে হয়েছে বাবাকে। তাই পরিবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার।

নিজের বিয়ের খবর শুনে খুব কাঁদতেন ইরানি। তাঁর স্বপ্ন উচ্চশিক্ষার। সেই দোটানার দিনগুলোতে ইরানি বাড়ৈর কান্নাকাটির কারণ তাঁর মায়ের কাছে জানতে চান সিস্টার এল গা। এই জার্মান মিশনারি তখন ইরানিদের গ্রামে এসেছিলেন। ইরানির বিয়ে না করার পক্ষে জোরালো অবস্থানের কথা শুনে সিস্টার এল গা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে যান বরিশালের শান্তি কুটির ব্যাপ্টিস্ট মিশনারি মা ও শিশু হাসপাতালে। ইরানি বাড়ৈ বলেন, ‘মিশনারি স্কুলে পড়ার ফলে ভালোই ইংরেজি পারতাম। সিস্টার বাংলা জানতেন, তবে স্থানীয় লোকদের বাংলা বোঝাটা তাঁর জন্য কঠিন ছিল। এই কাজে আমি সহায়তা করতাম।’

কিছুদিন যেতেই সিস্টার এল গার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেলেন। মিশনারি হাসপাতালে তত দিনে নার্সিং বিষয়টা বেশ উপভোগ করছেন ইরানি। মানুষের সেবা করার এমন সুযোগ তিনি মনে মনে চেয়েছিলেন।

ছোট মেয়ে ইলিশাবেথ ও স্বামী সায়মন সিকদারের সঙ্গে ইরানি বাড়ৈ

এরই মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার ফল বেরোল। চলে এলেন ঢাকায়। ডিপ্লোমা ইন নার্সিং কোর্সে ভর্তির সুযোগ পেলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজে। তিন বছরের কোর্স ও এক বছরের মিডওয়াইফারি শেষ হলো ১৯৮৬ সালে। আবার চলে গেলেন শান্তি কুটিরে। সিস্টার এল গা ইরানি বাড়ৈকে পেয়ে ভীষণ খুশি। কয়েক মাস কাজ করলেন। এরই ফাঁকে সরকারি নার্সের জন্য পরীক্ষা দিয়েছিলেন। ফল বেরোলে মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা হাসপাতালে নিয়োগ পেলেন। যোগও দিলেন। সেখানেই পরিচয় সায়মন সিকদারের সঙ্গে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডভিশনের একটি প্রকল্পে কাজ করতেন সায়মন সিকদার। তাঁদের পরিচয় গড়াল বিয়েতে। তত দিনে ইরানি বদলি হয়ে এসেছেন নারায়ণগঞ্জে। তাঁর জীবনের বাকি গল্প এখানেই।

ফেলে আসা রঙিন জীবনের গল্প শোনাতে শোনাতে মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠল ইরানি বাড়ৈর। শেষ বেলায় বললেন, ‘মানুষের সেবা করার স্বপ্নই আমি সারা জীবন লালন করেছি। কয়েক বছর পর আমার অবসর নিতে হবে। এরপর যেন মানুষের পাশে থাকতে পারি, তাই একটা পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই।’

সূত্র: প্রথম আলো

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত