ঢাকা      রবিবার ১৮, অগাস্ট ২০১৯ - ৩, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রেদওয়ান বিন আবদুল বাতেন

জনস্বাস্থ্য গবেষক

ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া


রোড টু পিএইচডি-০৩: ‘ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছো’ নামক সামাজিক অত্যাচার এবং ‘প্রফেসরের চেম্বার’ নামক মরীচিকা

ডাক্তার শব্দটির নানান ডাইমেনশান আছে। একটির চেয়ে অন্যটি বরং আরও ভয়াবহ।

ডাক্তার মানেই রোগী দেখা। মানবসেবা তো হচ্ছেই সাথে পকেট ভরতে তো অসুবিধা নেই তাই না? ডাক্তারদের পকেট উপচিয়ে টাকা পড়তে থাকবে – এটাই নিয়ম। নিয়মের বাইরে গেলেই আপনি কুলীন সমাজ থেকে বিচ্যুত হয়ে অচ্ছুৎ পাড়ায় পতিত হবেন। 

আমাদের সমাজে ডাক্তারি পড়াটা যতটা না মানবসেবার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তার চেয়ে বেশি হয়ে থাকে পকেট ভরার উদ্দেশ্যে। কি? শুনতে খারাপ লাগছে? এর মানে হলো, আপনি বাস্তবতাকে এখনও বুঝে উঠতে পারেননি। সে ম্যাচিউরিটি এখনও আসেনি আপনার। অপেক্ষা করুন। অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বুঝতে পারবেন কী বুঝাতে চাইছি আমি।

বাবা-মা গোত্রের লোকজন সবাই একবাক্যে চায় তাঁদের ছেলে-মেয়ে ডাক্তারি পরুক। এটি তারা চান সিকিউরিটির কারণে। ইকোনমিক সিকিউরিটি। ডাক্তারি পড়লে মানবসেবা তো হবেই সাথে পকেট ভরে কাড়ি কাড়ি টাকা আসবে। সে টাকার জোরে সমাজের সকল অনিয়মের স্রোতে আপনি টিকে থাকতে পারবেন। এই প্র্যাক্টিক্যাল সিকিউরিটির সন্ধানে সবাই চান যে আপনি ডাক্তারি পড়ুন।

এই ইলিউশানের উৎস কী? আমার কাছে উত্তর, ‘প্রফেসরের চেম্বার’ নামক মরীচিকা।

আমরা সবাই কখনও না কখনও অসুস্থ হয়েছি। নিজে না হলেও পরিবারের, কাছের বা দূরের কেউ অসুস্থ হয়েছে। তখন খুঁজেছি সবচেয়ে ভালো আর বড় ডাক্তার কে, কোথায় বসেন, সিরিয়াল দিয়ে ঠিকানা খুঁজে সে বড় ডাক্তারের চেম্বারে গিয়ে হাজির হয়েছি।

সেখানে গিয়ে দেখেছি শত শত মানুষের ভীড়। এত মানুষ এসেছে একজন মহামানবের সাথে সাক্ষাৎ করতে। তাঁর ২টি মাত্র মিনিট সময় নিতে। তাঁকে একনজর দেখলেই তো জীবনটা সার্থক হয়ে যায়। এত লোকের চাপ সামলাতে না পেরে বাইরে সিরিয়ালের খাতা নিয়ে বসে থাকা অ্যাটেনডেন্টও খুব ভাবে আছে। তার সাথেও খুব হিসেব করে কথা বলতে হচ্ছে। এই একটু আগেই তো, এক রোগীর চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে কিছু বয়ান করেছেন এই অ্যাটেনডেন্ট তাই কথা বলতে হবে সাবধানে। এহেন উন্নত প্রজাতির শাখামৃগকে চটানো যাবে না।

আরেকপাশে ওষুধ কোম্পানির চকচকে শার্ট প্যান্ট জুতা পড়া রিপ্রেজেন্টেটিভ কি সুন্দর লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। প্রত্যেকের হাতে ঐ বড় ডাক্তারের জন্য কেজি কেজি ওষুধের স্যাম্পল। সাথে আছে গিফটের বিশাল প্যাকেট। একজন মানুষ সারাদিন রোগী দেখছেন, মানুষের সেবা করছেন, তাঁকে আবার সবাই উপহারের বন্যায় ভাসিয়ে দিচ্ছে – হুলস্থূল অবস্থা। এমনটাই তো চাই!

কয়েক ঘণ্টা পর আপনার সিরিয়ালের ডাক পড়লো। প্রবেশ করবেন বহু আরাধ্য সেই প্রফেসরের দরবারে। তাঁকে দেখামাত্রই আপনার রোগ অর্ধেক ভালো হয়ে যাবে তাই না? কী সুন্দর করে কথা বলেন তিনি! ইনি মানুষ! না না, মানুষ হতেই পারেন না! এযে মহামানব, সাক্ষাৎ ফেরেশতা! তিনি আপনাকে প্রেসক্রিপশান লিখে দেবেন – সে ওষুধ খেয়ে আপনার বাকী অর্ধেক রোগও সেরে যাবে।

এই ‘ইনটেন্স স্পিরিচ্যুয়াল এক্সপিরিয়ান্স’ এর পর ভিজিট যত টাকাই আসুক, যত হাজার টাকার ডায়াগনস্টিক টেস্টই দিক – কে করবে না বলুন?

তো এসব ড্রামার ফল কি জানেন? বাবা-মার আপনাকে ডাক্তার বানানোর ব্যাপারে দৃঢ় সংকল্প তৈরি হওয়া।

এহেন সামাজিক বাস্তবতায় আপনি ক্লিনিক্যাল লাইন ছেড়ে পাবলিক হেলথে আসতে চাচ্ছেন। ইন্ডিভিজুয়াল রোগীর পরিবর্তে গোটা সমাজের রোগ নিয়ে কাজ করার এক ‘অলীক মহৎ চিন্তা’ আপনার উপর ভর করেছে। টাকা পয়সার মায়া ত্যাগ করে বীরের মত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে আপনি গবেষক হবেন। এসবকে জাস্টিফাই করার জন্য বইপত্র ঘেটে পরিসংখ্যান বের করেছেন। আপনি কাশলেই মনিষীদের দু’চারটা কোটেশান বেড়িয়ে যাচ্ছে। ভেতরে ধরে রাখতে পারছেন না কোনভাবেই। সাময়িকভাবে আশে পাশের লোকজনকে মিউট করতে পারবেন হয়তো।

পুরো সমাজের স্রোতের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যত ভালো ডায়ালগই দিন, দিনশেষে আপনাকে পাগল (অ্যান্ড ছাগল) ছাড়া আর কিছু কেউ বলবে না। সবাই আপনাকে নিয়ে ফিসফিস করবে, হাসাহাসি করবে। এত কষ্ট করে পোলা/মাইয়াডারে ডাক্তর বানাইলাম আর হে কিনা কয় ডাক্তারি করবো না!

বিশেষ করে এই ‘সিকিউরড’ লাইফ ছেড়ে আপনি কোন যে অনিশ্চয়তার পথে পা বাড়াচ্ছেন এই চিন্তায় সবার ঘুম হারাম হয়ে যাবে। নিদ্রাহীনতা রোগাক্রান্ত নিকটজনেরা আপনাকেও ঘুমাতে দেবে না। মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে আপনাকে ঝাঁকিয়ে জাগিয়ে দেবে। বল, কাল থেকে তুই চেম্বারে যাবি, বল! পার্ট ওয়ান দিবি, বল হতচ্ছাড়া! মানসিক রোগী হতে আপনারাও খুব একটা দেরি নেই।

সবকিছুকে পজিটিভলি নিতে হবে। বাবা-মা, নিকটজনদের এই আবেগ – আপনার সিকিউরিটির টেনশনেই তো তাইনা? ইট শুড বি এ গুড থিং রাইট? শুধু খেয়াল রাখবেন এই আবেগের বাক্যগুলো আপনার কর্নকুহর থেকে যেন নিউরন পর্যন্ত পৌঁছাতে না পারে। পরিবারের কনসার্নকে উপেক্ষাও করা যাবে না, আবার সাময়িক কোন তাক লাগানো সাফল্য অর্জন করে তাঁদেরকে সন্তুষ্টও করা যাবে না। বড়ই জটিল পরিস্থিতি। মানসিক শক্তি খুব বেশী না হলে খবর আছে আপনার।

পাবলিক হেলথে পড়তে চাইলে এই মানসিক শক্তির বড় প্রয়োজন। সোশ্যাল ড্রামার স্টেজ এর পর অ্যাপ্লিকেশানের পুলসিরাত পেরিয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেছেন পাবলিক হেলথে। এবার আপনার গবেষণা রেজাল্টের অপ্রিয় সত্যগুলোকে পলিসি মেকারদের শোনাতে হবে। সে ম্যাটেরিয়াল আছে তো আপনার মাঝে? না থাকলে আবারও ভাবুন। ডাক্তারি করার এপিক লাইফের দরজা এখনও কিন্তু বন্ধ হয়ে যায়নি।

প্রতিষ্ঠিত সত্যের বিপরীতে নতুন নতুন উপাত্ত নিয়ে হাজির হয়ে সিস্টেমকে চ্যালেঞ্জ করা – জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের পার্ট অব দ্যা জব। নইলে মানুষ বুঝবে কি করে যে সে কোন কাজটি ভুল করছে?

সাধারণ একটি বিষয় চিন্তা করে দেখুন, টয়লেট করে যে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হয় এই ছোট্ট একটি পাবলিক হেলথ ইন্টারভেনশান কত হাজারো লোকের জীবন বাঁচিয়েছে। লাইফের কোয়ালিটি বাড়িয়েছে।

কিন্তু এটি বাজারে আনতে অজানা অচেনা কত পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্টের নির্ঘুম রাতের পরিশ্রম কাজ করেছে তা কিন্তু আমরা কেউ জানি না।

আমরা শুধু দেখেছি মিনা কার্টুনে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া শেখাচ্ছে, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া শেখাচ্ছে। কিন্তু দেশের পপুলেশানের হেলথে এর প্রভাব যে কত বিরাট ছিল এটি কিন্তু সবাই বুঝতে পারবে না। এর পেছনে যারা কাজ করেছে তারা কিন্তু চেম্বারে বসে দৈনিক ২০০ মানুষের সেবা করেননি। প্রতিদিন টাকার ব্যাগ নিয়ে বাসায় ফেরেননি। এই মানুষগুলো মাস শেষে নির্ধারিত বেতনই পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের কাজের ফলভোগ করেছে লক্ষ লক্ষ মানুষ।

এটাই রোমান্স উইথ পপুলেশান। এটাই পাবলিক হেলথ। কি? চলবে নাকি একটুখানি রোমান্স?

 

ডিসক্লেইমার

 

পূর্ববর্তী পর্ব : রোড টু পিএইচডি-০২: গবেষণা বনাম ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস

[পরবর্তী পর্ব : রোড টু পিএইচডি, পর্ব-০৪: কেন আমেরিকা?]

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 




জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর