ঢাকা      রবিবার ১৮, অগাস্ট ২০১৯ - ৩, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রেদওয়ান বিন আবদুল বাতেন

জনস্বাস্থ্য গবেষক

ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া


রোড টু পিএইচডি-০২: গবেষণা বনাম ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস

ডাক্তারি করার প্রধান দিক দু’টি, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস এবং মেডিক্যাল রিসার্চ। আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে ডাক্তার শুধু  তারাই, যারা ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস করেন। এখানে রিসার্চ সেভাবে হয় না বললেই চলে। আর যদি কিছু গবেষণা হয় ও বা, তার অবস্থা যেন আইসিইউতে অন্তিম প্রহর গুনতে থাকা কোন মুমূর্ষু রোগীর চেয়েও করুণ!

এর বড় কারণ হলো দেশে গবেষণা ক্ষেত্রে টাকার অভাব। আপনি হয়তো ক্যারিয়ার হিসেবে গবেষণাকে নিতে চাচ্ছেন। আপনার সামনে মুহূর্তেই হাজারো তেঁতো প্রশ্ন হাজির হবে, আপনি কী খাবেন? চলবেন কীভাবে?? পরিবারকেই বা কীভাবে চালাবেন??? ব্যক্তিগত বলেন, কি জাতীয়- এটাই গবেষক জীবনের বাস্তবতা। কিংবা বাস্তবতার নির্মমতা! জীবনে যখন খেয়ে পড়ে বেঁচে থাকাই এক বিশাল চ্যালেঞ্জ, তখন গবেষণার মতো উচ্চমার্গ আরেক বিলাসিতাই তো!

তাই বলে কি দেশে কোন গবেষণা হচ্ছে না? গবেষণা বেঁচে আছে। বাঁচিয়ে রেখেছেন হাতেগোনা কয়েকজন প্রফেসার। তাঁরা গবেষণাকে ভালোবাসেন। এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। অ্যাকাডেমিক লাইফের ক্লান্তিকর ধাপ পেরিয়ে, ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিসের ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে,  ঠিকই তাঁরা গবেষণার জন্য সময় বের করেন। সংগত কারণে তাঁরা হয়ে উঠতে পারেন না একেকজন যুগান্তকারী গবেষক। তাদের অসামান্য পরিশ্রমের সন্তানরূপী গবেষণাকর্ম কোন রকমে একটা লোয়ার মিডল ক্লাস পর্যায়ের পেপার হয় কখনো কখনো। অসাধারণ কোন কৃতি হয় না, কীর্তি হয় না। দুই একজন ব্যতিক্রম হলেও এটাই সাধারণ চিত্র।

আর সেখানে নবীন কোন চিকিৎসক গবেষণাকে ভালোবেসে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চাওয়ার তো প্রশ্নই আসে না। এই স্বপ্ন অকালেই মরে যায়, পচে গিয়ে দুঃস্বপ্ন হয়!

এর মাঝে আইসিডিডিআরবি'র মতো ২-১টি প্রতিষ্ঠান গবেষণা নামক টিমটিমে প্রদীপকে জ্বালিয়ে রেখেছে ভালোভাবেই। তবুও সেই গবেষণার প্যাশন বাংলাদেশের আর দশটা সেক্টরের মতো মার খেয়ে যায় বৈষম্য, পক্ষপাতিত্ব ও লবিং এর কাছে।

একটি বড় বৈষম্যের মুখোমুখি হতে হয় এই অধমের মত ডেন্টাল সার্জনদেরকে। কোন এক অজ্ঞাত কারণে আইসিডিডিআরবি তাদের প্রজেক্টগুলোতে ডেন্টাল সার্জনদেরকে নেয় না । এটাই তাদের অফিসিয়াল পলিসি। সরকারীভাবে পাবলিক হেলথের প্রতিষ্ঠানগুলোতেও ডেন্টাল সার্জনদের প্রতি চরম অবজ্ঞা করা হয়ে থাকে। যদিও নিপসম কিংবা অন্য যেকোন ইউনিভার্সিটি থেকে একই পরীক্ষার প্রতিযোগিতায় উত্তীর্ণ হয়ে একই যোগ্যতা অর্জন করি আমরা, তবুও এই বৈষম্য।

একটি অভিজ্ঞতার কথা না বলে পারছি না। অধম একবার ভুল করে, আবেগের বশে, বয়সের দোষে, অতি আগ্রহে - সরকারি রোগতত্ত্ব নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান (IEDCR) এর ফেলোশিপ প্রোগ্রামে আবেদন করেছিল। ফলাফল যা হবার তাই হলো। প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর স্যার আমার সিভি পেয়ে যারপরনাই  খুশি 

হলেন। আমার যোগ্যতাকে খুব এপ্রিশিয়েটও করলেন। শুধু বের হবার আগে বললেন, “বাবা তোমার সবই ভালো, তারপরেও তোমাকে নিতে পারছি না। আমাদের এখানে ডেন্টাল সার্জনদের নেয়া নেয়া হয় না। তুমি বাবা অন্যদিকে ট্রাই করো।” স্যার কথাগুলো হাসিমুখেই বলেছিলেন। কিন্তু এরপর মাসখানেক আমার মুখে হাসি আসেনি। আর এভাবেই বিসিএস ক্যাডার হওয়া সত্ত্বেও, যোগ্যতার কমতি না থাকলেও  আমার স্বপ্নের মৃত্যু হলো, অপঘাতে।

IEDCR এ ফেলোশিপ নিয়ে পড়া হলো না। অধমের কপালে বরং লিখা ছিল - ছোটখাটো একটা প্রতিষ্ঠানে পাবলিক হেলথ নিয়ে পড়া। আমেরিকা নামের এই সভ্যতার দৌড়ে পিছিয়ে থাকা, অনুন্নত দেশে এরা একবারের জন্যও অধমের সাথে ডিসক্রিমিনেশান করেনি, ব্যাকগ্রাউন্ডের চেয়ে ফিউচার প্রসপেক্ট দেখেছে। খারাপ ধরনের নীচু ইউনিভার্সিটিগুলো হয়তো এমনটাই করে। ডিসক্রিমিনেশান করে না এরা।

 

ডিসক্লেইমার

 

পূর্ববর্তী পর্ব : রোড টু পিএইচডি-০১: পাবলিক হেলথ বস্তুটি আবার কী!

[পরবর্তী পর্ব : রোড টু পিএইচডি, পর্ব-০৩: ‘ডাক্তারি ছেড়ে দিয়েছো’ নামক সামাজিক অত্যাচার  এবং ‘প্রফেসরের চেম্বার’ নামক মরীচিকা।]

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 




জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর