ঢাকা      রবিবার ১৮, অগাস্ট ২০১৯ - ৩, ভাদ্র, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. রেদওয়ান বিন আবদুল বাতেন

জনস্বাস্থ্য গবেষক

ইউনিভার্সিটি অব আইওয়া


রোড টু পিএইচডি-০১: পাবলিক হেলথ বস্তুটি আবার কী!

পাবলিক হেলথ। বাংলায় জনস্বাস্থ্য। নামেই যার পরিচয়। অর্থাৎ পাবলিকের স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার নামই পাবলিক হেলথ। আমাদের দেশে পাবলিক শব্দটি সাধারনত বাঁকা অর্থে ব্যবহৃত হয়। অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবে পাবলিক হেলথকেও তাই বাঁকাভাবেই ট্রিট করা হয়।

ডাক্তার হিসেবে পাবলিক হেলথকে কিভাবে দেখবেন – এটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের দেশে এবং আমাদের মতো দরিদ্র উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডাক্তার মানেই হলো রোগী দেখা, প্রেসক্রিপশন লিখা। অসুস্থ মানুষকে এক্সামিন করে রোগ ডায়াগনোসিস করে তার ট্রিটমেন্ট করা। ডাক্তারি পেশার ক্লিনিক্যাল দিকটিই সেখানে প্রতিষ্ঠিত। ডাক্তারি কথাটির অন্য কোন মানে কেউ জানে না। এবং এই না জানার হেতু, কোন উজবুক ডাক্তারি শব্দের ভিন্ন কোন মানে খুঁজতে গেলে সকলে মিলে তাকে চটকে ফুচকার ভেতর দিয়ে মচমচ করে খেয়ে ফেলে। খেয়ে অভদ্রের মত সজোরে আবার ঢেকুর তুলে। হায়রে পাবলিক।

পাবলিক হেলথ কাজ করে পুরো জনসংখ্যা নিয়ে। অর্থাৎ ব্যক্তি হিসেবে কোন রোগীকে ট্রিটমেন্ট না দিয়ে বরং সামষ্টিকভাবে পুরো জনসংখ্যাকে রোগী হিসেবে ট্রিট করে পাবলিক হেলথ। এখানে আপনি কোন একজন নির্দিষ্ট রোগীর বুকে স্টেথোস্কোপ লাগানোর পরিবর্তে পুরো জনগোষ্ঠীর বুকে স্টেথো লাগিয়ে তার হার্ট বিট শোনার চেষ্টা করবেন।

পাবলিক হেলথ কাজ করে কোন রোগের উৎস নিয়ে। তার ছড়িয়ে পড়া নিয়ে। সে রোগকে কিভাবে গ্রস/ন্যাশনাল স্কেলে প্রিভেন্ট করা যায়। সেজন্য দেশের স্বাস্থ্য পলিসি কী হবে। কিভাবে তা আইনে পরিণত করা হবে। কিভাবে তার ইমপ্লিমেন্টেশান হবে ইত্যাদি। অর্থাৎ পাবলিক হেলথে কাজ করতে হলে আপনাকে অনেক বড় স্কেলে চিন্তা করার সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। কল্পনাশক্তি হতে হবে আকাশসমান। কোন একটি বিষয় / রোগকে ক্ষুদ্র স্কেলে মাপার পরিবর্তে অনেক বড় মাত্রায় ভাবার নামই পাবলিক হেলথ।

একটি দেশ, একটি এলাকার জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য কেবল ২-১টি বিষয়ের উপর নির্ভর করে না। একেবারে সাম্প্রতিক গবেষণায় এসেছে কোন জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য কেমন হবে তার নিয়ামক বা পেছনের ফ্যাক্টরগুলো হলো ক্লিনিক্যাল কেয়ার, জেনেটিক্যাল ফ্যাক্টর, লাইফস্টাইল / বিহেভিয়ারাল ফ্যাক্টর এবং সোশ্যাল / এনভায়রনমেন্টাল ফ্যাক্টর। এ ৪টি ফ্যাক্টরকে পার্সেন্টেজে প্রকাশ করলে দাঁড়ায় -

জেনেটিক্স – ২০%

এনভারনমেন্টাল – ২০%

লাইফস্টাইল – ৫০%

ক্লিনিক্যাল – ১০%

(গবেষণার ফলগুলো Leiyu Shi & Douglas A. Singh এর লিখা আমাদের টেক্সটবই Delivering Healthcare in America: A Systems Approach থেকে নেয়া।)

কি অবাক হচ্ছেন? হ্যাঁ, অবাক হবার মতোই ব্যাপার। মানুষের স্বাস্থ্য বলতে আমরা যে ডাক্তার এবং ডাক্তারি করাকে বুঝে থাকি, দেশের জনসংখ্যার স্বাস্থ্যের নিয়ামক হিসেবে তার অবদান মাত্র ১০ভাগ।

২০ ভাগের নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতের বাইরে। কারণ তা জেনেটিক্যাল ব্যাপার-স্যাপার। অর্থাৎ এই জীবনে যে অসুখগুলোতে ইতোমধ্যে ভুগেছেন এবং ভবিষ্যতে ভুগবেন তার পেছনে ২০ ভাগ দায়ী হলো পারিবারিক সূত্রে পাওয়া জিনগুলো। পূর্বপ্রজন্মের দিকে ফিরে তাকানোর আগে সামনের দিকে তাকিয়ে আপনার সন্তানকে দেখুন। আপনার সন্তানের স্বাস্থ্যের ২০ভাগ কিন্তু আপনার কন্ট্রিবিউশান। এবার নিজেকে সংযত করুন।   

এরপর আসে পরিবেশ। আমাদের স্বাস্থ্যে তার অবদান ২০ ভাগ। কেমন এলাকায় থাকছেন, অক্সিজেনের সাথে সাথে অন্যের ফুঁকা সিগারেটের ধোঁয়াকেও ‘বাতাস’ হিসেবেই ফুঁকছেন কি না, কেমন পরিবেশে বড় হয়েছেন, তার আলো বাতাস মাটি আবহাওয়া কেমন, এসব আপাত নিরীহ ফ্যাক্টরগুলো ২০ ভাগ অবদান নিয়ে আপনার আমার হেলথ স্ট্যাটাসের উপর নীরবে কাজ করে চলছে।

বাকি থাকলো ৫০ ভাগ, যা লাইফস্টাইল বা বিহেভিয়ার দ্বারা ডিটারমাইন হয়। আপনি কী খাচ্ছেন, কিভাবে চলাফেরা করছেন, আপনার হাইজিন সেন্স কেমন, ফুড হ্যাবিট কেমন, কোথায় যাচ্ছেন, কোথায় কাজ করছেন, আপনার মেন্টাল হেলথের কী অবস্থা, শরীর নামক যন্ত্রটির মাঝেসাজে মেইনটেইন্যান্স করেন কি না, সারাদিন বসে থাকেন না মাঝে মাঝে উঠে গা ঝাড়া দেন, বিড়ি-সিগারেট-গাঞ্জা তরল টাইপের ছাইপাশ খান কি না, সারাদিন ঝাড়ির উপর রাখেন না ঝাড়ির উপর থাকেন, স্ত্রীকে নিয়মিত প্রশংসা করে, ফুল দিয়ে ঠিকমত ম্যানেজ করতে পারেন, এই শত শত ফ্যাক্টর মিলে ৫০ ভাগ তৈরি করে।

পাবলিক হেলথ মূলত কাজ করে থাকে এই এনভায়রনমেন্টের ২০ এবং লাইফস্টাইলের ৫০ ভাগ নিয়ে। পাবলিক হেলথ তাই আসলে স্বাস্থ্যের ৭০ ভাগ বিষয় নিয়ে কাজ করে। গিলতে কষ্ট হলেও অত্যন্ত তেতো এই তথ্যটি হজম করার চেষ্টা করুন। পাবলিক হেলথকে আসলে মাইক্রোস্কোপের উল্টো দিক থেকে দেখছিলাম সবাই এতদিন। বাকি ৩০ ভাগেও পাবলিক হেলথ পুরোপুরি রোল প্লে করে ফ্রম পলিসি পার্সপেক্টিভ। ধারাবাহিকভাবে এ নিয়ে সিরিজে কথা হবে।

এজন্যই পাবলিক হেলথে পড়তে চাওয়া। আমার জন্য ডিসিশন নেয়াটা খুব সহজ ছিল। পাবলিক হেলথে পড়তে চাওয়ার ডিসিশনের কথা বলছি। সবার জন্য এমনটা নাও হতে পারে। বাংলাদেশে যতজন প্রফেসরকে আমার এই ইচ্ছের কথা বলেছি, একেবারে ১০০%, সবাই চমকে উঠেছেন। সাধারণ মানুষ, আত্মীয়স্বজন চমকে উঠেছেন ২০০%। তবে পাবলিক হেলথের স্কোপ বুঝতে শুরু করার পর থেকে ডিসিশন আর চেঞ্জ হয়নি।

পাবলিক হেলথে কাজ করতে গেলে আপনাকে গবেষণার বিস্তারিত মেথডোলজি আয়ত্ত করতে হবে। খুব সাধারণ কোন একটা অবজার্ভেশন আপনাকে রিসার্চ করে স্ট্যাটিস্টিক্স দিয়ে প্রুভ করতে হবে। যেমন, সিগারেট খেলে লাং ক্যান্সার হয় এটি ধ্রুব সত্য টাইপের একটা ব্যাপার। এতে গবেষণার খুব বেশি কিছু হয়ত নেই। কিন্তু আসলে স্মোকারদের উপর গবেষণা চালিয়ে দেখলেন যে, অনেক স্মোকার সারা জীবন সিগারেট ফুঁকেই চলেছেন, ক্যান্সারের দেখাও নেই। আবার আরেক গোবেচারা কোনদিন সিগারেট চেখেও দেখেনি, তার সাথে ক্যান্সারের দেখা হয়ে গেছে। বেচারার অবস্থা সুবিধার না।

এই ২ ধরনের রেজাল্টের কারণ ঘাটতে গিয়ে শত শত ফ্যাক্টর বেড়িয়ে আসবে। পাবলিক হেলথ বিশেষজ্ঞের কাজ হলো কোন কোন ফ্যাক্টর তাদের সিগারেট খাওয়া এবং লাং ক্যান্সার হওয়ার উপর প্রভাব ফেলছে তা নিয়ে সূক্ষ্মভাবে কাজ করা এবং তা সায়েন্টিফিক্যালি প্রুভ করা। তারপর এই প্রুফ নিয়ে দেশের পলিসি মেকারদের কাছে গিয়ে বলা যে এই এই কারণে দেশে এই রোগের বিস্তার এত বেশি হচ্ছে। সেটা বন্ধ করতে এই এই ইন্টারভেনশান নিতে হবে। নইলে জাতীয়ভাবে এই এই সমস্যা হবে। এই পলিসি না নিলে এত এতদিন পর আপনার অবস্থাও এমনটা হতে পারে। তাই ধান্দাবাজি আর মারামারি করা বন্ধ করে ঠান্ডা মাথায় ১০ মিনিট আমার কথা শুনুন।

পাবলিক হেলথ পলিটিশিয়ানদের মত পরিসংখ্যান, প্রমাণ ছাড়া ডায়ালগ মারে না। বরং অত্যন্ত কষ্ট করে গবেষণার মাপকাঠিতে সঠিক কারণগুলো আইডেন্টিফাই করে। এজন্য গবেষকরা খুব হিসেব করে, মেপে মেপে কথা বলবেন। কারণ তাঁরা জানেন উপর থেকে যেমনই মনে হোক না কেন, ভেতরে হাজারো কারণ লুকিয়ে আছে। তার মধ্যে এই কারণটি যে মূল রোল প্লে করছে সেটা বোঝা এত সহজ নয়।

একজন পাবলিক হেলথ স্পেশালিস্টের কাজ তাই বেশ কঠিন। কারণ আপনাকে প্রচুর পরিমাণে ম্যাচিউরিটি, প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে হবে। কোন একটি কেস বা ঘটনাকে সাধারণ দৃষ্টিতে না দেখে অসাধারণভাবে দেখতে হবে। সাধারণের চোখ এড়িয়ে যায় এমন ক্ষুদ্র বিষয়গুলোর প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। এই প্রসেসে আপাতভাবে হঠাৎ করে কোন রেজাল্ট আসবে না। একজন রোগীকে ওষুধ দিলে কয়েকদিনের মধ্যেই যে ফল পাওয়া যায়, পাবলিক হেলথের কাজে এমন শর্ট টার্ম ফল আসে খুব কমই। হায়…(দীর্ঘশ্বাসের শব্দ হইবে)।

পাবলিক হেলথ বরং সাধারণ রোগের ইন্ডিভিজুয়াল কেসগুলোকে যোগ করে, গুণ করে, পপুলেশানে কনভার্ট করে, লং টার্মে গবেষণা করে, রেজাল্ট হিসেবে ঐ রোগের উপর একটি পলিসি নিয়ে এসে সেটাকে ইমপ্লিমেন্টাশানে নিয়ে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করে সফল হয়। আমার কাছে এটাই পাবলিক হেলথ।

 

ডিসক্লেইমার

 

পূর্ববর্তী পর্ব : রোড টু পিএইচডি-০০: যাত্রা শুরুর পূর্বে

[পরবর্তী পর্ব : রোড টু পিএইচডি, পর্ব-০২: গবেষণা বনাম ক্লিনিক্যাল প্র্যাকটিস প্রকাশিত হবে।]

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 




জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর