২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৮:৫০ পিএম

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স

আন্তর্জাতিক এওয়ার্ড পেলেন রাজশাহী মেডিকেলের নার্স

এরিন কে ফ্লেটলি পেডিয়াট্রিক এওয়ার্ড ২০১৭ ঘোষণা করেছে সেপসিস এলিয়েন্স। এবছর এওয়ার্ডের জন্য তিনজন নার্সের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছেন দুজন আমেরিকান এবং একজন বাংলাদেশি। এবছর দু'টি ক্যাটাগরিতে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। আমেরিকান এবং আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরিতে যথাক্রমে দুজন এবং একজন স্বীকৃত নার্সকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। যারা শিশুদের মধ্যে সেপসিস এর প্রাদুর্ভাব নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। আমেরিকান ক্যাটাগরিতে বেথ ওয়াথেন, ওয়েন্ডি রেডফ্রেন এবং আন্তর্জাতিক ক্যাটাগরিতে এই পুরষ্কার জিতে নিয়েছেন বাংলাদেশের মাহমুদা আক্তার। তিনি কিভাবে এই সফলতা অর্জন করলেন মেডিভয়েস-এর সাথে একান্ত সাক্ষাৎকারে তা উঠে এসেছে। মেডিভয়েসের পাঠকদের জন্য সাক্ষাৎকারটি তুলে ধরা হলোঃ

মেডিভয়েসঃ আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?

মাহমুদা আক্তার: ওয়ালাইকুম সালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি।

মেডিভয়েস: পুরস্কারের কথা প্রথম কার কাছ থেকে জানলেন? তখন কেমন অনুভূতি হয়েছিল?

মাহমুদা আক্তার: জ্বী। সম্প্রতি এরিন কে ফ্লেটলি পেডিয়াট্রিক সেপসিস এওয়ার্ড ২০১৭ ঘোষনা করেছে সেপসিস এলিয়েন্স। সেখানে আমি এবং আরো দুইজন আমেরিকান নার্স এর নাম রয়েছে। কাজের স্বীকৃতি হিসাবে আমি আন্তর্জাতিক এই এওয়ার্ড অর্জন করেছি। আর পুরস্কারের কথা প্রথম আমি ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যারের (কন্সালটেন্ট ও ইনচার্জ, আই.সি.ইউ, আর.এম. সি.এইচ) কাছে শুনেছি। এর অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আমি খুবই আনন্দিত হয়েছিলাম। আমি আল্লাহর প্রতি অনেক শুকরিয়া আদায় করছি। পাশাপাশি স্যারদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

মেডিভয়েস: এওয়ার্ডের তালিকায় নাম আসার পর সহকর্মী নার্স এবং স্যার/ম্যাডামদের কাছ থেকে কেমন অভিনন্দন পাচ্ছেন?

মাহমুদা আক্তার: এওয়ার্ড এর তালিকায় নাম আসার পর আমার সহকর্মী নার্স, স্যার ও ম্যাডামরা সবাই অনেক অনেক খুশি হয়েছেন। "সেপসিস ডে ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ " উপলক্ষে 'আর.এম. সি.এইচ' এ 'আই.সি.ইউ' এর পক্ষ থেকে এক সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিলো। সেখানে সম্মানিত ডাক্তাররাসহ প্রতিটা ওয়ার্ড ইনচার্জ সিনিয়র নার্সরা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আমি সেপসিস সচেতনতার জন্য এক প্রেজেনটেশান নিয়েছিলাম। এবং সেই প্রোগ্রামে অত্র হাসপাতালের পরিচালক এই এওয়ার্ড এর ঘোষনা করেন ও আমাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। যা আমার জীবনের এক অন্য রকম অভিজ্ঞতা। এছাড়া ১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ইং তে আমার কলেজ রাজশাহী নার্সিং কলেজ, রাজশাহীতে একই ভাবে ছাত্র ও ছাত্রীদের সেপসিস সচেতনতার জন্য একটি প্রেজেনটেশান নিয়েছিলাম। অত্র কলেজের প্রিন্সিপাল ও ছাত্র- ছাত্রীবৃন্দ আমাকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান। এইরকম বিভিন্ন জায়গা থেকে আমি বিভিন্ন ভাবে অভিনন্দন পাচ্ছি।

মেডিভয়েস: সেপসিস সম্পর্কে কিভাবে জানলেন? সেপসিস মোকাবিলায় আপনার কাজের বিশেষত্ব কি ছিলো?

মাহমুদা আক্তার: আমি সেপসিস সম্পর্কে প্রথম জেনেছি আমার নার্সিং স্টুডেন্ট থাকা অবস্থায়। আমার ক্লিনিক্যাল প্রাকটিসে আই.সি.ইউ, আর.এম.সি.এইচতে প্লেসমেন্ট হয়। তখন স্যারকে দেখতাম ইনফেকশন কন্ট্রোল এর ব্যাপারে খুবই জোরদার ভুমিকা রাখতেন। তিনি সবাইকে উৎসাহিত করতেন ইনফেকশন ও সেপসিস কন্ট্রোল এর ব্যাপারে। সেখান থেকেই মূলত আমি আগ্রহী হয়েছিলাম ও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম যে আমি ইনফেকশন ও সেপসিস কন্ট্রোল নিয়ে কাজ করব। সেপসিস মোকাবেলা আমার একার পক্ষে সম্ভব না। যেহেতু এখানে সবার সমান ভুমিকা রাখা খুবই দরকার। কিন্তু আমি আমার সহকর্মীদের উৎসাহিত করেছি সেপসিস কন্ট্রোল এর ব্যাপারে। যেমন: হ্যান্ড ওয়াশ, রেগুলার ইন্সট্রুমেন্ট ক্লিনিং, ৫ মোমেন্টস অফ হ্যান্ড হাইজিন ইত্যাদি। বিভিন্ন ইনফেকশন কন্ট্রোল মূলক ভিডিও সহকর্মীদের সাথে শেয়ার করেছি তাদের উৎসাহিত করেছি। রোগীর আত্বীয়দের উৎসাহিত করেছি তারা যেন তাদের দায়িত্ব ঠিক মত পালন করে। তাদের যা ভুমিকা রাখা দরকার বুঝিয়ে বলেছি। এবং আমি মোটামুটি আশানুরূপ ফল পেয়েছি। যার কারণে আই.সি.ইউ থেকে অনেক রোগী পুরোপুরি ভালো হয়ে তাদের পরিবারে ফিরে যেতে পারে। এইটা আমার এক বড় বিশেষত্ব বলে আমি মনে করি।

মেডিভয়েস: কাজের অনুপ্রেরণা কে?

মাহমুদা আক্তার: আমি সেবা করব এর অনুপ্রেরণা আমি আমার বাবা-মার কাছ থেকে পেয়েছি। আর সেপসিস নিয়ে কাজ করব তার অনুপ্রেরণা আমি ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল স্যারের (কন্সালটেন্ট ও ইনচার্জ, আই.সি.ইউ, আর.এম. সি.এইচ) এর থেকে পেয়েছি।

মেডিভয়েস: নার্স হিসেবে কাজ করতে কেমন বোধ করেন?

মাহমুদা আক্তার: একজন নার্স হিসাবে কাজ করতে পেরে আমি খুবই গর্ববোধ করি। আর এই কারণে আমি আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া আদায় করি। কারণ আমার রোগীকে সুস্হ্য করে তোলার পর তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে আমি এক অন্য রকম আনন্দ পাই। এবং তারা আমাকে যে দোয়া করেন তা আমার জীবনের সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার এক অন্যতম হাতিয়ার বলে আমি মনে করি। আর আমি একজন সেবিকা বলেই এই সব পাচ্ছি।

মেডিভয়েস: রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসকের পাশাপাশি নার্সের ভূমিকা কতটুকু?

মাহমুদা আক্তার: চিকিৎসক যখন রোগীর চিকিৎসার জন্য কোনো পদক্ষেপ নেন তখন সব কাজেই নার্সরাও  সমান ভূমিকা রাখেন। কারণ কারোর একার পক্ষে একাজ সম্ভব না। এইটা ইউনিটির কাজ। সুতরাং আমি মনে করি রোগীর সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক এর পাশাপাশি নার্স এর ভূমিকাও কম নয়।

মেডিভয়েস: তরুণ নার্সদের জন্য আপনার পরামর্শ কি?

মাহমুদা আক্তার: তরুণ নার্সরা যেন রোগীদের সঠিক সেবা নিশ্চিত করেন, কারণ তাদের মধ্যে কেউ আমাদেরই বাবা-মা বা কোনো নিকট আত্নীয়। তরুণ নার্সদের প্রতি আমার পরামর্শ থাকবে, রোগীরা যেন এক রোগের থেকে মুক্তি পেতে এসে অন্য কোনো ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত না হয়। যেমন: commiunicable disease, Hospital accuard infection,etc. এই জন্য সবাইকে ইনফেকশন ও সেপসিস কন্ট্রোল নিয়ে কাজ করতে হবে। যা আমাদের দেশে খুবই কম হয়। কিছু প্রাইভেট হাসপাতালে আছে। সুতরাং তরুণ নার্সদের প্রতিজ্ঞা হবে, তারা ইনফেকশন ও সেপসিস নিয়ে জোরদার কাজ করবে। সবাইকে সচেতন করবে এবং সেপসিস ও ইনফেকশন কন্ট্রোল করবে। আর বিশ্বের দরবারে স্বাস্ব্য সেবায় আমাদের সোনার বাংলাদেশকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যাবে।

মেডিভয়েস: পড়ালেখা ও উচ্চতর প্রশিক্ষণ সম্পর্কে জানাবেন?

মাহমুদা আক্তার: আমাদের নার্সিং কোর্সে দুইটা ভাগ আছে। ১) ডিপ্লোমা ইন নার্সিং ২) বি.এস.সি ইন নার্সিং। নিম্ন মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ সহ যে কোনো বিভাগ থেকে ডিপ্লোমা ইন নার্সিং এ কোর্স করা যায়। আর বি.এস.সি ইন নার্সিং এ অন্যান্য কোর্সের মত উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে পাশ করে নার্সিং এ ভর্তি হতে হয়। বর্তমানে অনেকেই ডাবল গোল্ডেন প্লাস নিয়ে বি.এস.সি ইন নার্সিং এ ভর্তি হয়। আমাদের দেশে ৮ টি সরকারি নার্সিং কলেজ আছে। যা বিভিন্ন ইউনিভার্সিটির আন্ডারে। যেমন রাজশাহী নার্সিং কলেজ, রাজশাহী ইউনিভার্সিটির আন্ডারে। এর পর সরকারি ও বেসরকারি ভাবে বিভিন্ন সাবজেক্ট এ M.Sc,MPh,M.Phil ও PhD সহ বিভিন্ন ডিগ্রী নেয়া যায়। এবং বাইরের দেশ থেকেও এই ডিগ্রীগুলো নেয়া যায়। এছাড়াও অনেক ট্রেইনিং আছে। আমাদের অনেক নার্সরা এই ডিগ্রী গুলোর অধিকারী ও বিদেশ থেকে বিভিন্ন ডিগ্রী ও ট্রেইনিং প্রাপ্ত।

মেডিভয়েস: জন্ম ও বেড়ে ওঠা সম্পর্কে সংক্ষেপে জানতে চাই?

মাহমুদা আক্তার: আমার জন্ম রাজশাহী জেলার পবা, নওহাটাতে। বেড়ে উঠেছি রাজশাহী শহরেই। আমি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করি যথাক্রমে ২০০৮ ও ২০১০ সালে। বাবা-মা ও আমার স্বপ্ন ছিল আমি একজন চিকিৎসক হব। মানুষের সেবা করব। আমার ছোট বেলার খেলা গুলোও এই কেন্দ্রিক ছিলো। কিন্তু সেই স্বপ্নের আংশিক পূর্ণ হলো না। আমি চিকিৎসক হতে পারলাম না। কারণ আমি মেডিকেলে চান্স পাই নি। আমি ইউনিভার্সিটিতে ভালো সাবজেক্টে চান্স পাওয়ার পরও বাবা আমাকে নার্সিং এ ভর্তি করে দেন। তার ইচ্ছা ছিলো আমি মানুষের সেবা করব। যেখানে বাবা-মা আমাকে প্রচুর উৎসাহ দিয়েছেন আর সহযোগীতাও করেছেন। আমি ২০১০ এর ডিসেম্বর এ রাজশাহী নার্সিং কলেজে ভর্তি হই। ২০১৫ তে ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করে রেজাল্ট হওয়ার পর ৩ মাসের থেসিস শেষ করি। আমার থেসিস টপিক ছিলো "Nurses knowledge & practices regarding exclusive breast feeding in pediatric ward". তারপর ৬ মাসের ইন্টার্নী শেষ করি জানুয়ারি, ২০১৬ইং তারিখে। এরপর ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ইং তারিখে লাইসেন্স পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মার্চ, ২০১৬ইং তারিখে সরকারী চাকুরীর পরিক্ষাতে অংশ গ্রহন করি। আর ১৫ ডিসেম্বর, ২০১৬ইং তারিখে উপজেলা স্বাস্হ্য কমপ্লেক্স, মোহনপুর, রাজশাহীতে যোগদান করি।  ১৭ এপ্রিল, ২০১৭ইং তারিখে আমি ট্রান্সফার হয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাস্পাতাল, রাজশাহী এর আই.সি. ইউতে আমার স্বপ্ন পূরনের জন্য যোগদান করি। আমি যখন নার্সিং ছাত্রী ছিলাম আর স্যার এর কাজ দেখতাম তখন থেকে ইচ্ছা ছিল, আমি যদি কোনো দিন সুযোগ পাই তাহলে আই.সি. ইউতে কাজ করব। আই.সি.ইউ হচ্ছে একজন মৃত্যু পথযাত্রীর বেঁচে উঠার শেষ আশ্রয়স্থল। এই খানে চিকিৎসক, নার্স সহ যারা কর্মরত থাকেন, তারা অনেক পরিশ্রম করেন আর একজন রোগীকে সুস্হ্য করে তোলেন। যা অন্যান্য জায়গা থেকে বেশী কষ্টকর। আর আমি এই রকম একটা কষ্টকর জায়গাতে কাজ করতে এসেছি আমার স্যার এর সাথে সেপসিস নিয়ে কাজ করতে পারব বলে। আমার কর্মস্হলে আমি IPCN (infection prevention control nurse) হিসাবে কর্মরত আছি। IPCN পদ দেশের অন্য কোথাও নেই। কিন্তু বিদেশের সব জায়গায় আছে। অন্যদেশের মতো আই.সি.ইউতে স্যার আমাকে IPCN পদ দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন বলেই আমি আজ এই ইন্টারন্যাশনাল পুরস্কার পেয়েছি। সরকারী চাকুরীতে যোগদানের আগে আমি কিছু প্রাইভেট হাস্পাতালে ও নার্সিং ইনিস্টিটিউটে কর্মরত ছিলাম।

মেডিভয়েস: দীর্ঘ সময় ধরে মেডিভয়েসকে সময় দেয়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। 

মাহমুদা আক্তার: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ।

সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন: রাফি

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত