ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ২, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



সাবরিনা সুমাইয়া

শিক্ষার্থী, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ


হেনরি গ্রে: গ্রে’স এনাটমির অন্তরালের মানুষটি

বইয়ের দুনিয়া সম্পর্কে খোঁজখবর রাখেন কিন্তু গ্রে’স এনাটমির নাম শোনেননি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর মেডিকেলের শিক্ষার্থী হলে তো কথাই নেই, তারা খুব ভালোভাবেই পরিচিত এর সাথে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পঠিত এবং গ্রহণযোগ্য পাঠ্যবইটি হচ্ছে গ্রে’স এনাটমি। ক্লিনিক্যাল এবং সার্জিক্যাল এনাটমির যেকোনো সমস্যার নির্ভরযোগ্য সমাধান এটি। হিউম্যান এনাটমি নিয়ে গ্রে’স এনাটমির সমকক্ষ কোনো বই আর রচিত হয়নি। প্রথম প্রকাশের পর থেকে আজ পর্যন্ত এনাটমি শিক্ষায় অবিস্মরণীয় অবদান রেখে আসছে কিংবদন্তীতুল্য এই গ্রন্থ।

গ্রে’স এনাটমিকে অনেকেই চেনেন, কিন্তু এর পেছনের মানুষটাকে ক’জন চেনেন? নাম তার হেনরি গ্রে। গ্রে’স এনাটমির স্রষ্টা তিনিই। এনাটমির একজন একনিষ্ঠ সাধক এই কিংবদন্তীর কথাই আজ জানা যাক।

হেনরি গ্রে; source: Wikimedia Commons

ইংরেজ চিকিৎসক ও সার্জন হেনরি গ্রের জন্ম হয় যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের বেলগ্রেভিয়াতে, ১৮২৭ খ্রিস্টাব্দে। গ্রের বাবা ছিলেন ব্রিটেনের রাজা চতুর্থ জর্জ ও চতুর্থ উইলিয়ামের ব্যক্তিগত বার্তাবাহক। রাজকর্মচারী হওয়ার সুবাদে তাদের পরিবার মোটামুটি স্বচ্ছলই ছিল। গ্রেরা ছিলেন চার ভাইবোন।

হেনরি গ্রে ১৮৪৫ সালে সেইন্ট জর্জ হাসপাতালে তার মেডিকেল জীবন শুরু করেন। তিনি তার সমসাময়িক শিক্ষার্থীদের চেয়ে একেবারেই ব্যতিক্রম ছিলেন। তিনি নিজ হাতে প্রতিটি অঙ্গ ব্যবচ্ছেদ করে এনাটমি শেখার পক্ষপাতী ছিলেন। অসাধারণ মেধাবী ও পরিশ্রমী এই মানুষটি করেছেনও তাই। তার এই অভিজ্ঞতাই পরে তাকে গ্রে’স এনাটমি রচনায় সহায়তা করেছিল। ১৮৪৯ সালে তার মেডিকেলের পাঠ নেয়া সমাপ্ত হয়।

গ্রের কর্মজীবন মূলত সেইন্ট জর্জ হাসপাতালকে ঘিরে আবর্তিত হয়। পাশ করার পরের বছর গ্রে সেইন্ট জর্জ হাসপাতালে এক বছরের জন্য হাউজ সার্জন হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৮৫২ সালে সেখানে তিনি এনাটমির প্রদর্শক হিসেবে যোগ দেন। ১৮৫৩ সালে তিনি এনাটমির লেকচারার পদে কাজ করা শুরু করেন। সেইন্ট জর্জ হাসপাতাল জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্বও পালন করেছেন গ্রে।

গবেষণা

ছাত্র থাকা অবস্থাতেই গ্রে গবেষণার কাজ শুরু করেন। ছাত্র থাকাকালীন, ১৮৪৮ সালে তার একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় অন্যান্য মেরুদণ্ডী প্রাণীদের সাথে মানুষের চোখের তুলনামূলক গঠন সম্পর্কে, ‘The Origin, Connexions and Distribution of nerves to the human eye and its appendages, illustrated by comparative dissections of the eye in other vertebrate animals‘ শিরোনামে। এই গবেষণাটির জন্য তিনি রয়্যাল কলেজ অব সার্জন কর্তৃক ট্রিনিয়্যাল পুরস্কারে ভূষিত হন।

১৮৫২ সালে তিনি রয়্যাল সোসাইটির জার্নাল ‘Philosophical Transactions’-এ দুটি নিবন্ধ লিখেন। নিবন্ধ দুটিতে ছিল মুরগির ভ্রূণ নিয়ে তার গবেষণার ফলাফল। প্রথম নিবন্ধটি ছিল, ‘On the Development of the Retina and Optic Nerve, and of the Membranous Labyrinth and Auditory Nerve‘। এতে তিনি দেখিয়েছেন, চোখের আলোক সংবেদনশীল অংশ রেটিনা আসলে মস্তিষ্কের একটি অংশের প্রসারণের ফলে সৃষ্টি হয়। গ্রের দ্বিতীয় প্রবন্ধটি ছিল, ‘On the Development of the Ductless Glands in the Chick‘। এই প্রবন্ধে এড্রেনাল ও থাইরয়েডের মতো অন্তঃক্ষরা গ্রন্থি এবং প্লীহা নিয়ে আলোচনা করেন তিনি।

গ্রে’স এনাটমি বইয়ের একটি ছবি; source: Anatomy Learn

তার এই প্রবন্ধগুলো রয়্যাল সোসাইটির পণ্ডিতদের এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, তারা সে বছরেই গ্রেকে রয়্যাল সোসাইটির সদস্যপদ দিয়ে বসেন। তখন গ্রের বয়স ছিল মাত্র পঁচিশ বছর! এরপর তিনি রয়্যাল সোসাইটির সহযোগিতায় প্লীহা নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যান। গ্রে আবিস্কার করেন প্লীহার রক্ত সঞ্চালনের প্রক্রিয়া, রেড পাল্প, হোয়াইট পাল্প- যা আমরা আজ পড়ে থাকি। প্লীহা নিয়ে তার নিজের গবেষণা এবং প্লীহা সম্পর্কিত পূর্বের সমস্ত তথ্য স্থান পায় ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত তার অনন্যসাধারণ গবেষণাপত্র ‘On the Structure and Use of the Spleen‘ এ। এই গবেষণার জন্য তিনি লাভ করেন অ্যাশলে কুপার পুরস্কার। এরপর তিনি রচনাকরেন তার কালজয়ী গ্রন্থ ‘গ্রে’স এনাটমি’। প্যাথলজিতেও গ্রের কিছু গবেষণাকর্ম রয়েছে।

গ্রে’স এনাটমির পেছনের গল্প

চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের হাতেখড়ি হয় এনাটমি দিয়ে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিস্তৃত এবং জটিল জগতে এনাটমির জ্ঞানই তাদের শক্ত ভিত তৈরি করে। তারপর একজন চিকিৎসকের, বিশেষ করে সার্জনদের সারাটা জীবনজুড়ে নাছোড়বান্দার মতো লেগে থাকে এনাটমি।

হেনরি গ্রে মেডিকেলের শিক্ষার্থী এবং চিকিৎসক ও সার্জনদের এই প্রয়োজন মাথায় রেখেই সহজ ভাষায় একটি বই লেখার পরিকল্পনা করেন। এই পরিকল্পনায় তিনি সঙ্গী করেন তার বন্ধু, তার  থেকে চার বছরের জুনিয়র হেনরি ভনডেইক কার্টারকে। এই পর্যায়ে কার্টার সম্পর্কে কিছু কথা না বললেই নয়।

হেনরি ভনডেইক কার্টার; source: Wikimedia Commons

কার্টার ছিলেন হেনরি বার্লো কার্টারের বড় ছেলে। কার্টারের বাবা ছিলেন পেশায় চিত্রশিল্পী। বাবার এই গুণ তার মাঝেও সঞ্চারিত হয়। তিনি কৈশোরে মেডিসিনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন এবং সেইন্ট জর্জ হাসপাতালে ভর্তি হন। কার্টার পরবর্তীতে সেখানে এনাটমির প্রদর্শক পদে কর্মজীবন শুরু করেন। গ্রের সাথে কার্টারের প্রথম দেখা হয় সেই হাসপাতালের ডিসেকশন রুমে। ছবি আঁকায় দারুণ পারদর্শিতার কল্যাণে এনাটমিক্যাল আর্টিস্ট হিসেবে নামডাক ছিল কার্টারের। সেজন্যই গ্রে কার্টারকে তাঁর বইয়ের জন্য ছবি আঁকার প্রস্তাব দেন। এতে রাজি হয়ে যান কার্টার।

১৮৩২ সালের এনাটমি আইন অনুযায়ী ডাক্তার ও এনাটমির শিক্ষকদের কারখানা বা হাসপাতালের মর্গে রাখা বেওয়ারিশ মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদ করলে শাস্তির বিধান ছিল না। এই সুযোগটাই কাজে লাগান গ্রে। দুই হেনরি দীর্ঘ আঠারো মাস অক্লান্ত পরিশ্রম করে এনাটমির এই বইটি দাঁড় করান। ৭৫০টি পৃষ্ঠা এবং ৩৬৩টি চিত্র সম্বলিত বইটির তখন নাম দেয়া হয় ‘Anatomy: Descriptive and Surgical’। ১৮৫৮ সালে জন উইলিয়াম পার্কার বইটি প্রকাশ করেন। গ্রে তাঁর এই বইটি উৎসর্গ করেন সেইন্ট জর্জ হাসপাতালের সবচেয়ে সিনিয়র সার্জন স্যার বেঞ্জামিন কলিন্সকে।

গ্রে’স এনাটমির দুর্লভ প্রথম সংস্করণ; source: Raptis Rare Books

প্রকাশের পরপরই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় বইটি। এর কারণ ছিল, সেই সময়ের যেকোনো বইয়ের তুলনায় বইটির প্রাঞ্জল ভাষা এবং স্পষ্ট চিত্র। কার্টারের আঁকা ছবিগুলোতে ছিল আলো-ছায়ার নিপুণ ব্যবহার, যা বইটিকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছিল। এছাড়া বইটিতে প্রতিটি স্নায়ু, মাংসপেশী, হাড়ের নিখুঁত বর্ণনা বইটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

১৮৫৯ সালে বইটির মার্কিন সংস্করণ প্রকাশিত হয়। তারপর দ্রুতই সারা বিশ্বে বইটি ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম প্রকাশের পর থেকে এ পর্যন্ত গ্রে’স এনাটমির ৪১টি সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে। সংস্করণের এই সংখ্যাই প্রমাণ করে, বিশ্বজুড়ে গ্রে’স এনাটমি কতটা জনপ্রিয়। বইয়ের নামটি পরে পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘Anatomy: Descriptive and Applied’। একসময় বইটিকে সংক্ষেপে গ্রে’স এনাটমি নামে ডাকা শুরু হয়।

গ্রে’স এনাটমির ৪১তম সংস্করণের প্রচ্ছদ; source: twitter.com/allbooksdl

ভাতিজা চার্লস গ্রে বসন্তে আক্রান্ত হলে গ্রে রাতদিন তার সেবা করতে শুরু করেন । ফলে ভাতিজার থেকে বসন্ত তার শরীরেও বাসা বাঁধে। বসন্তের প্রকোপেই ১৮৬১ সালে পরলোকগমন করেন এই মহান চিকিৎসক।

গ্রে’স এনাটমির মতো অতুলনীয় গ্রন্থ উপহার দেওয়ার জন্য বিশ্বের প্রতিটি চিকিৎসা শিক্ষার প্রতিষ্ঠানই আজও শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে হেনরি গ্রের নাম। অসাধারণ সব গবেষণার জন্য বিজ্ঞানের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবেন হেনরি গ্রে।

 

সৌজন্যে : roar.media

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর