শনিবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৭ - ৮, আশ্বিন, ১৪২৪ - হিজরী

চিকিৎসককে কেন সনদ নিতে হবে অধিদপ্তরের

প্রস্তাবিত 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৭'-এর খসড়ার কয়েকটি ধারাকে চিকিৎসা ও মাদকাসক্ত রোগীদের স্বার্থের সঙ্গে বিরোধপূর্ণ বলে অভিযোগ করছেন চিকিৎসকরা। এ সংক্রান্ত ১৯৯০ সালের আইনের পরে এই নতুন আইনটির উদ্যোগ নিয়ে খসড়া তৈরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন মাদক অধিশাখা। মাদকাসক্তির চিকিৎসার ওপর সার্বিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিধান করতে চাইলেও আইনের খসড়া বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং চিকিৎসক, মনোচিকিৎসকদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি বলে তাদের অভিযোগ। 

তবে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ) মো. আতিকুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, খসড়া চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়টিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে মতামত দেওয়ার সুযোগ থাকবে। 

জানা গেছে, খসড়া অনুযায়ী মাদকাসক্তি চিকিৎসা, পরামর্শ, পুনর্বাসন কেন্দ্রের লাইসেন্স, তত্ত্বাবধানসহ সবকিছু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এমনকি ডিগ্রিধারী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সনদ ছাড়া মাদকসেবীর চিকিৎসা দিতে পারবেন না। অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের লিখিত অনুমোদন ছাড়া বিশেষ কিছু ওষুধের ব্যবস্থাপত্র দিতে পারবেন না। সরকার 'জাতীয় মাদকাসক্তি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সনদ বোর্ড' গঠন করবে। সনদপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনা করলে অনূর্ধ্ব ৩ বছর শাস্তি ও জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে খসড়ায়। 

বিদ্যমান আইন অনুযায়ী মাদকদ্রব্যের অবৈধ ব্যবসা বা চোরাচালান, প্রচলন, তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি বিস্তার এবং সরকারি খাতের মাদকাসক্তি চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো পরিচালনা তথা চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দায়িত্ব মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতেই আছে। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে চিকিৎসকরা প্রেষণে নিযুক্ত হয়ে কেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসা দেওয়ার কাজ করেন। দেশের সকল চিকিৎসক চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সনদ পান বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (বিএমডিসি) থেকে। এর পর আবার মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের সনদ নেওয়ার প্রস্তাবকে তারা অযৌক্তিক ও অমর্যাদাকর মনে করেন। 

মনোচিকিৎসকদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সভাপতি অধ্যাপক ডা. ওয়াজিউল আলম চৌধুরী বিএমডিসির সনদের বাইরে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সনদ নেওয়ার প্রস্তাবকে 'অবাস্তব ও হাস্যকর' বলে অভিহিত করেন। 

খসড়ায় আরও বলা হয়েছে, মাদকাসক্তের চিকিৎসা গ্রহণ বাধ্যতামূলক এবং চিকিৎসার সব ব্যয় পরিবারকে বহন করতে হবে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের মতে, সংশোধন ছাড়া এই আইন কার্যকর করা হলে অপচিকিৎসার সুযোগ সৃষ্টি হবে। 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাদকাসক্তি নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় কার্যক্রম তিনটি বিষয়কে কমিয়ে আনার লক্ষ্যে পরিচালিত। তারা বলেন হার্মর্, ডিমান্ড অ্যান্ড সাপ্লাই রিডাকশন। হার্ম বা ক্ষতি হ্রাস ও ডিমান্ড অর্থাৎ চাহিদা হ্রাস_ এ দু'টো পুরোপুরি চিকিৎসার সঙ্গে সম্পৃক্ত। চিকিৎসার মাধ্যমে আসক্ত ব্যক্তিতে এমন একটি অবস্থায় উপনীত করতে হয় যাতে মাদক কাছে থাকলেও সে তা সেবন করা থেকে বিরত থাকবে। আর চিকিৎসার সঙ্গে সম্পর্কহীন হলো সাপ্লাই তথা মাদকের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করা। সেটা গোয়েন্দা-পুলিশি ধরনের কাজ। 

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. ফারুক আলম বলেন, হার্ম ও ডিমান্ড রিডাকশন প্রস্তাবিত মানসিক স্বাস্থ্য আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কেবল সাপ্লাই রিডাকশন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের বিষয়। কিন্তু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এখন সবকিছুকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।

ডা. ফারুক আলম আরও বলেন, খসড়া আইনে মাদকাসক্তি রোগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সংজ্ঞাই অনুপস্থিত। মাদকাসক্তি একটি রোগ, এটি কোনো অপরাধ নয়। তাই মাদকাসক্তির চিকিৎসা, পরামর্শ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের লাইসেন্স ও তত্ত্বাবধান স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের আওতাধীন হতে হবে। জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ উপদেষ্টা কমিটিতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, বিএমডিসি, চিকিৎসকদের জাতীয় সংগঠন বিএমএ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও মনোচিকিৎসকদের সংগঠন সাইকিয়াট্রিস্টস অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধি রাখতে হবে। আগের মতো মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের চিফ কনসালট্যান্ট অথবা পরিচালক পদে মনোরোগ বিদ্যার একজন অধ্যাপককে রাখতে হবে। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, চিকিৎসকদের ব্যর্থতার জন্যই তিনটি দায়িত্ব অধিদপ্তরকে নিতে হচ্ছে। 

কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের প্রধান পরামর্শক ডা. সৈয়দ ইমামুল হোসেন স্বাস্থ্য ক্যাডার ছেড়ে প্রশাসন ক্যাডারে যোগ দিয়ে এখন উপসচিব হিসেবে আছেন। তিনি বলেন, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে ৫০ শয্যা মাদকাসক্তদের চিকিৎসার জন্য ছিল। কিন্তু তারা কোনো রোগীর চিকিৎসা দেননি। 

এ বিষয়ে দ্বিমত প্রকাশ করে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরিচালক ডা. ফারুক আলম বলেন, ৫০ শয্যার মাদকাসক্তি ইউনিটে গত দুই বছরে প্রায় সাড়ে তিনশ' রোগী ভর্তি করা হয়েছে। আউটডোর থেকে শত শত রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। 

সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রগুলো ছাড়া দেশে বেসরকারি খাতে অনেক চিকিৎসা ও পুনর্বাসন ক্লিনিক আছে। এগুলোতে মাদকাসক্তি থেকে মুক্ত হওয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকেরা চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়ার কাজ করেন। এসব ক্লিনিকের লাইসেন্স দেয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। 

ডা. ফারুক আলম আরও বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর চিকিৎসকদের ব্যর্থ বলে চালিয়ে সাবেক মাদকাসক্তদের দিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালনা করতে চায়। এটি অনৈতিক এবং এ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থি। 

তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বিপরীতে পুনর্বাসন কেন্দ্রের অর্ধশিক্ষিত ব্যবস্থাপক ও সাবেক মাদকাসক্তরা কখনই মাদকাসক্ত রোগের চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ হতে পারে না। এ ধরনের ধারা ওরিয়েন্টশন কোর্সের নামে সনদ বিক্রি ও মডিউল বাণিজ্যের প্রশিক্ষণকে উৎসাহিত করবে বলে মনে করেন তিনি। 

নতুন খসড়ায় বলা হয়েছে, বাধ্যতামূলক চিকিৎসার যাবতীয় খরচ মাদকসেবনকারীর পরিবার অথবা অভিভাবক বহন করবে। তবে তাদের না পাওয়া গেলে অথবা আর্থিকভাবে অসচ্ছল হলে বিধি অনুযায়ী এই খরচ বহন করা যাবে। 

খসড়া অনুসারে মাদকাসক্ত কেউ অপ্রকৃতিস্থ হলে তাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অথবা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লিখিত নোটিশ দিয়ে তাকে সাত দিনের মধ্যে চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত কোনো চিকিৎসক অথবা মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রে নেওয়ার নির্দেশ দিতে পারবেন। 

এই ধারা দুটির বিষয়ে মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ও অ্যাসোসিয়েশন অব সাইকিয়াট্রিস্টসের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, বাধ্যতামূলক চিকিৎসা সরকারি কেন্দ্রে হয়ে থাকলে সব ব্যয় সরকারের বহন করা উচিত। ১৯৯০ সালে প্রণীত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন অনুযায়ী সরকারিভাবে এই ব্যয় বহনের বিধান ছিল। খসড়া আইনের এই ধারা বর্তমান সরকারের জনকল্যাণমুখী দর্শনের পরিপন্থি। 

ডা. মোহিত কামাল আরও বলেন, প্রশাসনিক পদাধিকার বলে মানসিক বা শারীরিক কোনো রোগ অথবা রোগের প্রকৃতি নির্ধারণের যোগ্যতা অর্জন করা অবাস্তব ও বেআইনি। একমাত্র বিএমডিসির সনদপ্রাপ্ত চিকিৎসকই এ ধরনের রোগী ভর্তির সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অন্যথায় প্রস্তাবিত মানসিক স্বাস্থ্য আইন, ২০১৪-এর সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হবে।

সূত্র: সমকাল

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ





অপুষ্টির শিকার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু

অপুষ্টির শিকার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১২:১৭







গর্ভবতী মায়েদের কাছে সিজার এখন ফ্যাশন

গর্ভবতী মায়েদের কাছে সিজার এখন ফ্যাশন

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২০:১৪




হঠাৎ করে শিশু কেন মোটা হচ্ছে?

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৬:৪২






শিশুর নিউমোনিয়া, যা জানা প্রয়োজন

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৯:০৫



















মেডিকেলীয় অফলাইন

১৯ অগাস্ট, ২০১৭ ১৫:১২



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর