শনিবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৭ - ৮, আশ্বিন, ১৪২৪ - হিজরী

সরকারি ৬৩ হাসপাতাল নিয়ে চিন্তিত সরকার

রোগী সেবা দিতে না পারায় কার্যত সরকারের মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে সারাদেশের ১০ ও ২০ শয্যার ৬৩টি হাসপাতাল। অধিকাংশ হাসপাতালেই নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও ওষুধ। পদায়ন করা হলেও অনুপস্থিত থাকছেন চিকিৎসক ও নার্স অনেকে। তাই রোগীরা প্রয়োজনীয় সেবা দূরে থাক, পরামর্শ পর্যন্ত পাচ্ছেন না। কোনো কোনো হাসপাতালের ভবন পর্যন্ত ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কোনো কোনোটি পরিণত হয়েছে আবার মাদকাসক্তদের আখড়ায়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট কয়েক মাস ধরে এগুলোর সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছে। কীভাবে, কোন প্রক্রিয়ায় হাসপাতালগুলো কার্যকর করা যায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে এসব হাসপাতালের সার্বিক অবস্থা নিয়ে বৈঠক হয়। এতে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, সভায় হাসপাতালগুলোকে সচল করার লক্ষ্যে বেশ কিছু প্রস্তাব এসেছে। কেউ কেউ এগুলো পরিচালনার দায়িত্ব ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। কেউ কেউ এসব হাসপাতাল রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব স্থানীয় এমপিদের কাছে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। 

স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক আসাদুল ইসলাম বলেন, হাসপাতালগুলোর সার্বিক অবস্থা জানার চেষ্টা করছি। যেসব হাসপাতাল ইতিমধ্যে পরিদর্শন করা হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে কয়েকটির ভবন ব্যবহারের অনুপযোগী। কোনো কোনো চিকিৎসাকেন্দ্রে জনবল সংকট রয়েছে। এসব কারণে রোগীরাও হাসপাতালমুখী হচ্ছেন না।

হাসপাতালগুলো নিয়ে সরকারের নতুন পরিকল্পনার সত্যতা স্বীকার করে আসাদুল ইসলাম বলেন, কেরানীগঞ্জের দুটি হাসপাতাল চালুর বিষয়ে স্থানীয় এমপি এবং জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ আগ্রহ দেখিয়েছেন। কিন্তু সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠান চাইলেও দাতব্য প্রতিষ্ঠান কিংবা ব্যক্তিকে দেওয়া যায় না। তবে কোন প্রক্রিয়ায় হাসপাতালগুলো চালু করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন সময়ে এ হাসপাতালগুলো গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে কয়েক বছরে শয্যাসংখ্যা বাড়ানোয় চিকিৎসক, নার্সসহ বাড়তি জনবলের প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন স্বল্প শয্যার ওইসব হাসপাতাল থেকে জনবল প্রত্যাহার করা হয়। তবে ১০ হাজার চিকিৎসক নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। এ নিয়োগ দেওয়া হলে চিকিৎসকদের ওইসব হাসপাতালে পদায়ন করা হবে। তখন সংকট দূর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

চিকিৎসা সামগ্রী না থাকায় চিকিৎসকও নেই: কেরানীগঞ্জের জিনজিরা ২০ শয্যা হাসপাতাল চালু হয় ২০০৪ সালের ৯ জানুয়ারি। কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি মোহাম্মদ রায়হান খান জানান, মাসখানেক চলার পর ঠিকমতো চিকিৎসক না থাকায় এটি বন্ধ হয়ে যায়। পরে হাসপাতালের ভেতরে অস্থায়ীভাবে র‌্যাব-১০-এর কার্যালয় বসানো হয়েছিল। গত ২৮ আগস্ট সরেজমিন পরিদর্শনে হাসপাতালে কোনো চিকিৎসক ও রোগী খুঁজে পাওয়া যায়নি। দেখা গেছে, সব কক্ষেই তালা লাগানো। ডা. মোহাম্মদ রাজীব ও ডা. সায়মা জাহান নামে যে দু'জন চিকিৎসককে হাসপাতালটিতে পদায়ন করা হয়েছে, তারা কোনোদিনই সেখানে যাননি। হাসপাতাল লাগোয়া নজরগঞ্জ এলাকায় চিকিৎসক ও কর্মচারীদের জন্য যে কোয়ার্টার রয়েছে, তারা সেখানে থাকেন। অবশ্য ডা. রাজীব ও ডা. সায়মা দু'জনেই বলেন, চিকিৎসা সামগ্রী না থাকায় তারা হাসপাতালে ডিউটি করেন না। তবে ডা. রাজীব মিটফোর্ড হাসপাতালে এবং সায়মা কেরানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত রোগীর সেবা দেন।

একই উপজেলার কোন্ডা ইউনিয়নের ১০ শয্যার হাসপাতালটি পরিণত হয়েছে ভুতুড়ে বাড়িতে। পুরো হাসপাতালটিই এখন মাদকসেবীদের ঘাঁটি। কয়েক মাস আগে মাদক ব্যবসার জের ধরে নাসরিন নামে এক নারী হাসপাতাল চত্বরে খুন হন। নিহত নাসরিনের মা আনোয়ারা বেগম হাসপাতালে বসবাস করেন। তিনি জানান, ওই হাসপাতালে কোনোদিন কোনো রোগী আসতে দেখেননি তিনি। এমনকি কোনো চিকিৎসকও যান না সেখানে। হাসপাতালের সব আসবাব, শয্যা চুরি হয়ে গেছে। ডা. শেখ আবুল ফজলকে হাসপাতালে পদায়ন করা হলেও তিনি কোনোদিন সেখানে যাননি।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তা ডা. মীর মোবারক হোসেন বলেন, তিনি যোগ দেওয়ার আগে থেকেই হাসপাতাল দুটি বন্ধ ছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে আলোচনা করে হাসপাতাল দুটি চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে। 

শূন্য হাসপাতালে আটটি ভাঙা শয্যা: ধামরাই সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে কৃষ্ণনগর গ্রামে ২০০৬ সালে তিন একর জমির ওপর ২০ শয্যার একটি হাসপাতাল ভবন ও চিকিৎসকদের জন্য চারটি আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হয়। ২০০৮ সালে এখানে চার চিকিৎসকসহ ১৭ জন স্টাফ প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে হাসপাতাল কার্যক্রম শুরু হয়। 

ধামরাই (ঢাকা) প্রতিনিধি মোকলেছুর রহমান জানান, বর্তমানে ওই হাসপাতালটিতে কাগজে-কলমে ডা. রুবাইত-ই সামস, ডা. মঞ্জু মনরা সরকার, ডা. ফৌজিয়া আক্তার, ডা. জেসমিন আক্তার, ডা. আয়শা সিদ্দিকী, ডা. আরমানুল ইসলামসহ ছয় নার্স, ফার্মাসিস্ট আছেন। তবে বাস্তবে সেখানে কোনো চিকিৎসক যান না। 

গত ২৭ আগস্ট সরেজমিনে হাসপাতালটি পরিদর্শন করে সেখানে আটটি ভাঙাচোরা শয্যা ছাড়া অন্য কোনো চিকিৎসা সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি। পুরো হাসপাতাল এলাকা ঝোপঝাড়ে ভরা। হাসপাতালের ফার্মাসিস্ট সাফায়েত হোসেন জানান, সহকারী মেডিকেল অফিসার আবু তালেব এবং তিনি নিয়মিত এলেও অন্যরা মাঝে মধ্যে আসেন।

স্থানীয় রোয়াইল ইউপি চেয়ারম্যান একেএম সামসুদ্দিন মিন্টু বলেন, পরিপূর্ণ একটি হাসপাতাল ভবন নির্মিত হলেও চিকিৎসক না থাকায় এলাকাবাসী চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। হাসপাতালটির চিত্র তুলে ধরে ঢাকা জেলা সিভিল সার্জন ডা. এহসানুল করিম দুলুর বক্তব্য চাইলে তিনি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন।

ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফজলুল হক বলেন, তিনি ২৬ আগস্ট যোগ দিয়েছেন। খোঁজখবর নিয়ে এ বিষয়ে কথা বলতে হবে।

ফোন কেটে দিলেন তিনি: রাজধানীর উপকণ্ঠে আমিনবাজার বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া এলাকায় ২০১০ সালে ২০ শয্যার হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ৩টি আবাসিক ভবনও রয়েছে। 
সাভার থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক গোবিন্দ আচার্য্য জানান, সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের বেশিরভাগ কক্ষই তালাবদ্ধ। নিচ তলায় আবাসিক মেডিকেল অফিসার, ফার্মাসিস্টের কক্ষ খোলা থাকলেও তাদের পাওয়া যায়নি। পরে ফোন নম্বর সংগ্রহ করে আবাসিক মেডিকেল অফিসার কামরুজ্জামানকে ফোন করা হলে তিনি ব্যস্ত থাকার কথা জানিয়ে ফোন কেটে দেন।

কোথায় কোন হাসপাতাল: স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সারাদেশে প্রতিষ্ঠিত ৬৩ হাসপাতালের মধ্যে ৩৮টি ২০ শয্যাবিশিষ্ট ও ২৫টি ১০ শয্যাবিশিষ্ট। এগুলোর মধ্যে ২০ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে ঢাকা জেলার কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, ধামরাইয়ের কৃষ্ণনগর ও সাভারের আমিনবাজার, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা ও সিদ্দিরগঞ্জ, শরীয়তপুরের তারাবুনিয়া, ফরিদপুর সদর, মাদারীপুরের কবিরাজপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা ও প্রাণগঞ্জ, চট্টগ্রামের বিবিরহাট, সন্দ্বীপের হারামিয়া, রাউজানের সুলতানপুর ও লোহাগড়া, কুমিল্লার সোনাইমুড়ি, জোদ্দা, বাগমারা, দোনারচর, মালিগাঁও, মালিকাপুর ও শহীদনগর, ফেনীর মঙ্গলকান্দি ও মহীপাল, সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া, বগুড়ার শান্তাহার, নন্দীগ্রাম ও আলীরহাট, রাজশাহীর বাগমারা, মাগুরার বিনোদপুর ও বিরলপালিতা, ভোলার চরআইচা, পটুয়াখালীর কুয়াকাটা ও কাঁঠালতলী, বরগুনার তালতলী, সুনামগঞ্জের জগদ্দল এলাকায়।

ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুর ও কুণ্ডা, গোপালগঞ্জের গোপীনাথপুর, কক্সবাজারের সেন্টমার্টিন, রাঙামাটির কাপ্তাই, কুমিল্লার কালিকাপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গুইনাক, সিরাজগঞ্জের খোকসাবাড়ি, লালমনিরহাটের দহগ্রাম, কুড়িগ্রামের রায়গঞ্জ, গাইবান্ধার রামচাঁদপুর, ভোলার দৌলতখানের খায়েরহাট, বরিশালের বানারীপাড়ার চাখার, ঝালকাঠির কৃত্তিপাশা, বরগুনার কুকুয়া, হবিগঞ্জের ট্রমা সেন্টার ও সুনামগঞ্জের মধ্যনগর এলাকায় ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালগুলো অবস্থিত। সব হাসপাতালেরই অবস্থা বেহাল। 

এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, জনগণের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌছে দিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়নে সরকার কাজ করছে। এ জন্য প্রতিটি ইউনিয়নে ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পাশাপাশি কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যেখান থেকে মানুষ সেবা পাচ্ছে। সবার সঙ্গে আলোচনা করে ১০ ও ২০ শয্যার হাসপাতালগুলো চালুর বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। 

সূত্র: সমকাল

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ





অপুষ্টির শিকার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু

অপুষ্টির শিকার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১২:১৭







গর্ভবতী মায়েদের কাছে সিজার এখন ফ্যাশন

গর্ভবতী মায়েদের কাছে সিজার এখন ফ্যাশন

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২০:১৪





হঠাৎ করে শিশু কেন মোটা হচ্ছে?

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৬:৪২
























মেডিকেলীয় অফলাইন

১৯ অগাস্ট, ২০১৭ ১৫:১২



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর