বৃহস্পতিবার ২১, সেপ্টেম্বর ২০১৭ - ৬, আশ্বিন, ১৪২৪ - হিজরী



অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ

অধ্যক্ষ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ, ঢাকা


অ্যান্টিবায়োটিকে সাবধানতা

ব্যাকটেরিয়ার আগ্রাসন ঠেকানোর অব্যর্থ ওষুধ অ্যান্টিবায়োটিক। পেনিসিলিন থেকে শুরু করে অ্যাম্পিসিলিন, অ্যামোক্সিসিলিন কিংবা বেনজিলপেনিসিলিন যুগে যুগে মানুষকে জীবাণু থেকে বাঁচিয়ে ব্যাকটেরিয়ার বংশবৃদ্ধি রুখে দিয়ে তাদের ধ্বংস করে। অবশ্য ব্যাকটেরিয়াগুলো বিপজ্জনক মাত্রায় পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত দেহের স্বাভাবিক রোগ প্রতিরোধী ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডিই মূল সুরক্ষা দেয়। যখন শরীরের অ্যান্টিবডি আর কুলিয়ে উঠতে পারে না, তখনই শরীরকে বাড়তি সহায়তা দিতে অ্যান্টিবায়োটিকের শরণাপন্ন হতে হয়।

যেভাবে কাজ করে

একেক অ্যান্টিবায়োটিক একেকভাবে কাজ করে। উদাহরণ হিসেবে পেনিসিলিনের কথা টানা যায়। এগুলো সরাসরি ব্যাকটেরিয়া কোষের দেয়ালে আক্রমণ চালায়। অন্যগুলো জীবাণুর কোষের কর্মক্ষমতায় প্রভাব ফেলে। আরো আছে ব্যাকটেরিয়োস্টেটিক, যার কাজ ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যাবৃদ্ধি রোধ করা। প্রতিটি অ্যান্টিবায়োটিকে এক বা একাধিক কার্যকর উপাদান থাকে। এটাই ওই অ্যান্টিবায়োটিকের মূল অস্ত্র।

ওষুধের প্যাকেটেও লেখা থাকে তার নাম।

ব্যবহারের সঠিক নিয়ম

মুখে সেবন ছাড়াও ইনজেকশনের মাধ্যমেও অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু সতর্কতা হলো :

♦          কারো লিভার বা কিডনিতে সমস্যা থাকলে, গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে এবং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ালে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে।

♦          শিশুদের সব সময় অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া ঠিক নয়। এতে দেহে সঠিক রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা অ্যান্টিবডি তৈরি হয় না।

♦          অনেকে চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করেন, কিন্তু উপসর্গ কমে এলে বা শারীরিকভাবে সুস্থ অনুভব করলে কোর্সটি শেষ করেন না। অথচ সংক্রমণ থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে বা অসুখ সারাতে পুরো কোর্স শেষ করা জরুরি। সুস্থতা বোধ করলে বা অসুখ সেরে গেলেও কোর্স শেষ করা উচিত। বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ আবারও ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের আশঙ্কা জিইয়ে রাখা। তাই শুধু রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে এবং ব্যবস্থাপত্রে উল্লিখিত সময় ও নির্দেশনা অনুযায়ী পূর্ণ কোর্স শেষ করতে হবে।

♦          কিছু অ্যান্টিবায়োটিক খাদ্য ও পানীয়র সঙ্গে গ্রহণ করা নিয়ম। আবার কিছু আছে খালি পেটে খাওয়া ভালো। এগুলো সাধারণত খাওয়ার ঘণ্টাখানেক আগে অথবা ঘণ্টা দুয়েক পর সেবন করতে হয়। সঠিক নিয়মে না খেলে সমস্যা হতে পারে।

♦          অনেকেই খুব দ্রুত রোগমুক্তি চান। এ জন্য দু-এক ডোজ অ্যান্টিবায়োটিক খেয়েই উপসর্গ না কমায় আবার চিকিৎসককে ওষুধ পরিবর্তনের জন্য চাপ দেন। বারবার অ্যান্টিবায়োটিক পরিবর্তন করা ঠিক নয়।

সাবধানতা

অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের আগে প্রথমেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানতে হবে সংশ্লিষ্ট অসুখের জন্য দায়ী ভাইরাস, নাকি ব্যাকটেরিয়া। সংক্রমণের নেপথ্যে ব্যাকটেরিয়া থাকলে সে ক্ষেত্রেই ভালো সমাধান এই অ্যান্টিবায়োটিক। আক্রান্ত হলেই কিন্তু অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা ঠিক নয়, বরং তা ক্ষতিকর। তা ছাড়া অতি মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ বা ভুল প্রয়োগে কিন্তু ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা রুখে দেওয়ার সক্ষমতাও লাভ করে। এর চেয়ে মারাত্মক পরিস্থিতি আর হয় না। অনেক সময় রোগ সারানোর চেয়ে সংক্রমণ ঠেকাতে রোগীদের অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। সাধারণত অন্ত্র বা অর্থোপেডিক সার্জারির আগে এমনটা করা হয়। এ ধরনের ব্যবহারকে প্রোফাইল্যাক্টিক বলে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স

অ্যান্টিবায়োটিক যদি কাজ না করে বা দেহের নগণ্য সংক্রমণকে যদি শ্বেতকণিকা রুখে দিতে না পারে, তাহলে পরিণতি বিপদের দিকে চলে যায়। তখন বুঝতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক দেহে আর কাজ করছে না। সাধারণত অপ্রয়োজনে ভুল অ্যান্টিবায়োটিক খেলে দেহে ওষুধ তার কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। এ অবস্থাটাই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। বিষয়টি বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীদের রাতের ঘুম নষ্ট করে দিয়েছে। তাঁদের মতে, মানবজাতির জন্য এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের নাম এই অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স। এর ফলে প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষের অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ঘটছে। অ্যান্টিবায়োটিকের আবিষ্কারক আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ১৯৪৫ সালে নোবেল পুরস্কার গ্রহণের পর অসতর্ক ও অতি মাত্রার ব্যবহারে অ্যান্টিবায়োটিককে ঠেকিয়ে দেওয়ার মতো ব্যাকটেরিয়া সম্পর্কে আভাসও দিয়েছিলেন।

সেনসিভিটি অ্যানালিসিস

সংক্রামক কোনো ব্যাধি নিয়ে কেউ হয়তো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হলেন। চিকিৎসক দেখেশুনে একটা অ্যান্টিবায়োটিক লিখে দিলেন অথবা লোকাল ফার্মেসি থেকে কোনো একটা গ্রুপের অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করতে দেওয়া হলো (এমনটাই বেশি হচ্ছে)। রোগী নিয়ম করেই হয়তো কোর্স শেষ করলেন। কিন্তু উপকার মিলল না! তাহলে কি অ্যান্টিবায়োটিকটি দেহে কাজ করছে না?

আসলে কিন্তু তা নয়, বরং এখানে ভুল করে কিংবা অপ্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়াকে দায়ী করা যায়। কেননা সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক বাছাইয়ের জন্য সংক্রমণের ধরন ও অবস্থা বুঝে কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার দরকার, যাকে বলে ‘সেনসিভিটি অ্যানালিসিস’। অ্যান্টিবায়োটিকের সঙ্গে ব্যাকটেরিয়ার সংবেদনশীলতা যাচাই করাই এই পরীক্ষার উদ্দেশ্য। এর ফলাফল বিশ্লেষণ করেই চিকিৎসক রোগীর জন্য সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পরামর্শ বা ব্যবস্থাপত্র দেবেন। অথচ সেই পরীক্ষা করা হয়নি বলে ওষুধও কাজ করেনি।

এমন অনেক ব্যাকটেরিয়া আছে, যা সাধারণ মানের অ্যান্টিবায়োটিককে পাত্তাই দেয় না। তাদের জন্য অন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক সমস্যা হয়ে ওঠে। আবার সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকে অনেক সংক্রমণ সারে না; যেমন—গলা ব্যথা, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) অথবা নিউমোনিয়া। সেনসিভিটি অ্যানালিসিসের মাধ্যমে তখন স্পষ্ট করতে হয় যে ব্যাকটেরিয়াগুলো ঠিক কোন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে ধ্বংস হবে। যদি একটি কোর্স শেষ করার পরও কেউ সুস্থ বোধ না করেন, সে ক্ষেত্রে সেনসিভিটি অ্যানালিসিসের বিকল্প নেই। এই পরীক্ষা না করে দ্বিতীয়বার অন্য কোর্স শুরু করাও ঠিক নয়।

সেনসিটিভ, না রেজিস্ট্যান্ট?

পরীক্ষার জন্য দেহের আক্রান্ত অংশ থেকে ব্যাকটেরিয়ার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এই নমুনা রক্ত, মূত্র, থুতু, গলদেশের অভ্যন্তর কিংবা কোনো ক্ষতের পুঁজও হতে পারে। নমুনার ওপর বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা পরখ করা হয়। অ্যান্টিবায়োটিকগুলোর ক্ষেত্রে তিন ধরনের ফলাফল বেরিয়ে আসে—

♦          এটা ব্যাকটেরিয়াগুলোর বৃদ্ধি ঠেকাতে সক্ষম, অর্থাৎ এটি কাজ করবে। সে ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিকটি হবে ‘সাসসেপ্টিবল’।

♦          এদের বৃদ্ধি রুখে দেওয়া যাচ্ছে না, অর্থাৎ অ্যান্টিবায়োটিকগুলো কোনো কাজই করতে পারবে না। অর্থাৎ ফলাফল ব্যাকটেরিয়াগুলো ‘রেজিস্ট্যান্ট’।

♦          মাঝামাঝি কোনো একটি ফল মিলবে। সে ক্ষেত্রে হয়তো অ্যান্টিবায়োটিকের উচ্চমাত্রার ডোজে দিব্যি কাজ হবে। ফলাফল ‘ইন্টারমেডিটেট’।

যদি প্রথম অবস্থা দেখা দেয় তো চিন্তা নেই। দ্বিতীয় ফল মিললে তৃতীয়তে সমাধান খোঁজা হবে। যদি দ্বিতীয়টিই একমাত্র ফলাফল হয়, তাহলে একাধিক অ্যান্টিবায়োটিকের সমন্বয়ে জীবাণু ধ্বংসের নকশা সাজাবেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। তবে রেজিস্ট্যান্ট ফলাফলের ক্ষেত্রে চিকিৎসক সাসসেপ্টিবিলিটি টেস্টিং নামের একটি পরীক্ষা দিতে পারেন, যা করিয়ে নেওয়া ভালো। অনেক সময় এমন হতে পারে, গৃহীত নমুনায় ক্রিয়াশীল সব ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায়নি। কোন অ্যান্টিবায়োটিক বেশ ভালো কাজ করবে, তা এই পরীক্ষায় ভালোভাবে উঠে আসে।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া

অ্যান্টিবায়োটিকের কিছু সাধারণ পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে; যেমন—ডায়রিয়া, অসুস্থ বোধ, মুখ বা পরিপাকতন্ত্র কিংবা জরায়ুতে ছত্রাকের সংক্রমণ ইত্যাদি। আবার সালফোনামাইডস খেলে কিডনিতে পাথর হতে পারে, সেফালোসপোরিন্স গ্রহণে অস্বাভাবিকভাবে রক্ত জমাট বেঁধে যেতে পারে, টেট্রাসাইক্লিন্সের কারণে সূর্যের আলোতে দেহ স্পর্শকাতর হয়ে উঠতে পারে, ট্রিমেথোপ্রিমের প্রভাবে ব্লাড ডিস-অর্ডার দেখা দিতে পারে বা এরিথ্রোমাইসিন ও অ্যামিনোগ্লাইকোসাইডসের জন্য বধির অবস্থা তৈরি হওয়ার মতো কিছু বিরল অবস্থাও দেখা দিতে পারে। বয়স্কদের এক ধরনের পেটের পীড়া হতে পারে।

আবার অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিক্রিয়া মারাত্মক পর্যায়েরও হতে পারে। এ অবস্থাকে অনেক সময়ই অ্যানাফাইল্যাক্টিক বলে।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ

ত্রিশের পরে মা হতে চান?

ত্রিশের পরে মা হতে চান?

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৭:২৯

কাশি হলেই কফ–সিরাপ নয়

কাশি হলেই কফ–সিরাপ নয়

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২২:২৩

গরমে শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যা ও করণীয়

গরমে শিশুদের স্বাস্থ্য সমস্যা ও করণীয়

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১০:৫৬

আপনার শিশুটি বাড়ছে তো?

আপনার শিশুটি বাড়ছে তো?

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২২:০১

রক্তচাপের অস্বাভাবিক ওঠানামা

রক্তচাপের অস্বাভাবিক ওঠানামা

১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২১:৫২

মাইগ্রেন হলে কী করবেন

মাইগ্রেন হলে কী করবেন

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৯:৪৫

শিশুর পেটে ব্যথা মানেই কৃমি?

শিশুর পেটে ব্যথা মানেই কৃমি?

১৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৯:২৯

সাঁতারে সুস্থতা

সাঁতারে সুস্থতা

১৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২২:৫৫

শিশুর হেঁচকি : করণীয়

শিশুর হেঁচকি : করণীয়

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৯:১০

মনে চাপ পড়লে শরীর কেন ব্যথা পায়?

মনে চাপ পড়লে শরীর কেন ব্যথা পায়?

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১১:৫০

কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্ত থাকুন

কোষ্ঠকাঠিন্য থেকে মুক্ত থাকুন

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৯:১৫


অপুষ্টির শিকার রোহিঙ্গা নারী ও শিশু

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১২:১৭







৬১ তম সিএমসি-ডে পালিত

২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৬:২৮





















মেডিকেলীয় অফলাইন

১৯ অগাস্ট, ২০১৭ ১৫:১২



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর