ডা. হাসনাইন সৌরভ

ডা. হাসনাইন সৌরভ

মেডিকেল অফিসার


০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১০:৩২ পিএম

ছায়াসঙ্গী

ছায়াসঙ্গী

-নাম?

-মরহুম আবুল কাশেম।

-জ্বি?

-মরহুম আবুল কাশেম। কাশেম শব্দটা ইংরেজি 'কিউ' অক্ষর দিয়ে লিখবেন। অনেকে 'কে' অক্ষর দিয়ে লিখে, এটা ভুল।

-ভুল কেন?

-কাশেম শব্দটা গলার ভিতর থেকে একটু টেনে উচ্চারণ করতে হয়। এই যে এরকম।

মরহুম আবুল কাশেম নিজের নামটি সঠিকভাবে উচ্চারণ করে শোনালেন। ভদ্রলোকের দিকে ভালো করে তাকালাম। দেখে মরহুম বলে মনে হচ্ছে না। নিতান্তই সুস্থ মাঝবয়সী শক্ত সামর্থ্য লোক। ধবধবে সাদা পায়জামা পাঞ্জাবি পড়ে আছেন।পাঞ্জাবিতে হলুদ দাগ লেগে আছে। মনে হচ্ছে একটু আগেই ইলিশ মাছের ঝোল দিয়ে ভাত খেয়ে এসেছেন। মৃত ব্যক্তির খাওয়া দাওয়া করার কথা না।

-কি সমস্যা বলেন।

-সমস্যা তো নাই। আমি একজন মৃত মানুষ। মৃত মানুষের কোন সমস্যা থাকে না।

-তাহলে এসেছেন কেন?

-আমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলাম। সমস্যা উনার।

-আপনার স্ত্রী জানেন আপনি মৃত?

-জানবে না কেন? জানে। কিন্তু বিশ্বাস করে না। অনেক বুঝিয়েছিলাম। মেয়েছেলেকে কিছু বোঝানো খুব শক্ত।

আবুল কাশেম বিরক্ত হয়ে পানের পিক ফেললেন। সেই পিক পড়ল টেবিল ক্লথে গিয়ে। ধবধবে টেবিল ক্লথ মুহূর্তে রক্তাক্ত হয়ে গেল। মরহুম আবুল কাশেম মুগ্ধ হয়ে তার সদ্য সৃষ্ট শিল্পকর্ম দেখছেন।

-আপনার স্ত্রী, উনি কি জীবিত না মৃত?

-উনি জীবিতও না মৃতও না, অর্ধমৃত। আমাদের দেশে বিধবা মহিলাদের পুরোপুরি জীবিত বলা যায় না।

-ভালোই তো বলেছেন।

-জ্বি আমি ভালোই বলি।

হাসি মুখে বললেন কাশেম সাহেব। কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে পানের পিক দিয়ে একের পর এক মনোমুগ্ধকর শিল্পকর্ম সৃষ্টি করে চলেছেন।

-কবে থেকে এই অবস্থা আপনার?

-এই তো মাস ছয়েক হবে।

-কিভাবে মৃত্যু হলো আপনার?

-রাত্রে ঘুমিয়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমি মৃত। ডেড ম্যান।

-তারপর?

-তারপর আমার স্ত্রীকে গিয়ে বললাম, বউ আমি মরে গেছি। আমারে কবর দাও। সে বিশ্বাস করতো না। খালি কান্নাকাটি করতো।

-এরপর?

-এরপর আর কি করবো। মরে যখন গেছি কবরে তো যাওয়াই লাগবে। নিজের কবর নিজেই খুড়লাম।

-বলেন কি? তারপর?

-তারপর সবাই ধরে বেধে হাসপাতালে ভর্তি করে দিলো। ওখানে ছিলাম মাস খানেক।খুব কস্ট হয়েছিলো স্যার। একটা মৃত মানুষকে কবর না দিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করে রাখা। আমার স্ত্রী নিজেই অসুস্থ ছিলেন। তিনি একবারও আমাকে দেখতে আসতে পারেননি। আমাকে দেখাশোনা করার কেউ ছিলো না।..স্যার।

-বলুন।

-বৌটারে ফেলে কবরে যাইতে ইচ্ছা করে না। থাকতে ইচ্ছা করে। খুব থাকতে ইচ্ছা করে।

-আপনার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন বললেন। উনি কোথায়?

-উনি তো বাথরুমে গিয়েছিলেন একটু। এই সময় আপনার এসিস্ট্যান্ট তার নাম ধরে ডাকলো। তার সিরিয়াল সাত নাম্বারে ছিলো।

-আপনার স্ত্রীর নাম কি?

-সুফিয়া।

-কাশেম সাহেব।

-জ্বি বলেন।

-আপনি যে ভয়াবহ অসুস্থ আপনি কি বুঝতে পারছেন?

-আমি অসুস্থ না স্যার। আমার স্ত্রী অসুস্থ। আমি যে মারা গেছি বিশ্বাস করতে চায় না। ওর চিকিৎসা দরকার। অনেক বুঝিয়েছিলাম। লাভ হয় নাই।

-কাশেম সাহেব। আপনি অত্যন্ত বিরল একটা মানসিক রোগে আক্রান্ত। এই রোগের নাম কোটার্ড সিন্ড্রোম। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজেকে মৃত মনে করে। অনেকে মনে করে তাদের শরীরের ভিতরে অংগ প্রত্যঙ্গ কিছুই নাই।অনেকে মনে করেন তাদের শরীরে রক্ত নাই।মানসিক রোগের চিকিৎসা আছে কাশেম সাহেব। আপনি ভালো হয়ে যাবেন।

-আর কিছু বলবেন?

কাশেম সাহেবের হাসিখুশি ভাবটা হঠাৎ দূর হয়ে গেছে। শীতল দৃস্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। সেই দৃস্টির দিকে তাকিয়ে আমার শরীরটা হঠাৎ শির শির করে উঠলো।

-বলবো, কাশেম সাহেব। আরেকটা কথা বলবো।

-বলুন।

-আপনি সম্ভবত আমাকে একটা মিথ্যা কথা বলেছেন।

-কি কথা?

-আপনি বলেছেন আপনি আপনার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছেন। এই কথাটা সম্ভবত সত্য নয়। আসলে আপনি একাই এসেছেন। আমার ধারণা আপনার স্ত্রী বেচে নেই।

-মানে?

-আপনি বলেছেন আপনি মৃত আর আপনার স্ত্রী সেটা বিশ্বাস করতে পারছেন না। আমার মনে হয় ঠিক উল্টোটাই ঘটেছে। আসলে আপনার স্ত্রীই মৃত। আপনার অবচেতন মন সেই শোক নিতে পারে নি। অবচেতন মন তখন একটা গল্প বানালো। সেই গল্পে আপনি মৃত। আপনার স্ত্রী জীবিত।

কাশেম সাহেব আমার দিকে চোখে চোখে তাকিয়ে আছেন।সেই চোখে বিষাক্ত দৃস্টি।

-কাশেম সাহেব।

-বলুন।

-আপনি এই রুমে কতক্ষন আছেন বলুন তো?

-পাঁচ মিনিট?

-উহুঁ। ১৫ মিনিট। আপনার স্ত্রী মনোরোগ চিকিৎসকের কাছে এসে এতক্ষন ওয়াশরুমে আছেন অথচ আপনি একটুও খোঁজ নিচ্ছেন না বা দুশ্চিন্তা করছেন না বিষয়টা অস্বাভাবিক। আপনি বলেছেন আপনার স্ত্রী হাসপাতালে একদিনও আপনার দেখাশোনা করতে পারেন নি। স্বামী একমাস হাসপাতালে থাকবে স্ত্রী একবারও তাকে দেখতে আসবেন না, এই বিষয়টাও সন্দেহজনক। এছাড়া আপনার স্ত্রীর ব্যাপারে কথা বলার সময় প্রতিবারই আপনি অতীতকাল ব্যবহার করেছেন, যা সাধারণত মৃত ব্যক্তিদের ব্যপারে করা হয়। আমি দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়েছি মাত্র।

-আমি যদি আমার স্ত্রীকে নিয়ে আসতে পারি?

-তাহলে আমি ভুল প্রমাণিত হবো।

কাশেম সাহেব ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন। আমি তাঁকে যেতে দিলাম। তাঁর ভুল ধারণাটা ভেংগে দেওয়া দরকার।

একটু পরেই এক হাসিখুশি মহিলা দরজা নক করে ভিতরে ঢুকলো।

-আসতে পারি?

-আসুন। কি নাম আপনার?

-সুফিয়া বেগম।

আমি কিঞ্চিত লজ্জা পেলাম। খুব আত্ববিশ্বাসের সাথে ভুল ডায়াগনোসিস করেছি। সাধারণত এমন ভুল হয় না আমার।

-আসুন, বসুন। কাশেম সাহেব কোথায়?

-কাশেম সাহেব?

-জ্বি।

-কোন কাশেম সাহেব?

-আবুল কাশেম। আপনার স্বামী।

-উনি তো মারা গেছেন মাস ছয়েক আগে।

-কি বলছেন!

-জ্বি। আপনি উনাকে চিনতেন?

-কি যা তা বলছেন? এইমাত্রই উনি আপনাকে খুঁজতে..

শেষ না করেই কথাটা বেমালুম গিলে ফেললাম। এই কথা কাউকে বলা যাবে না। কোনদিন না।

সুফিয়া বেগম অদ্ভুত দৃস্টিতে তাকিয়ে আছেন। 
আমি এসিস্ট্যান্ট কে ডেকে সিরিয়ালের খাতাটা চেক করলাম। দেখলাম সাত নম্বরে বড় বড় করে লেখা সুফিয়া বেগম।

-আমি একটু ওয়াশরুমে গিয়েছিলাম তাই দেরী হলো। দুঃখিত।

-ইটস ওকে।

-আমার স্বামী, আপনি উনাকে চিনতেন?
সুফিয়া বেগম নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন।

আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
-চিনতাম না।এই নামে কাউকে আমি কখনো চিনতাম না।

পরিশিষ্ট :

প্রেসক্রিপশন লিখে রোগী বিদায় করলাম। তেমন কোন ঔষধ লিখিনি।একটা ছায়া যেন চকিতে দরজার সামনে থেকে সরে গেলো। হয়তো চোখের ভুল। হয়তো বা না। কি এসে যায়? একজন নি:সঙ্গ মানুষ নাহয় জীবনের ওপার থেকে একটু সঙ্গ পেলো। একটি ছায়া নাহয় একটি কায়াকে ভালোবাসলো। রহস্যঘেরা এই পৃথিবীতে ছায়া এবং কায়ার অসীম ভালোবাসায় বাধা হয়ে দাড়ানোর ইচ্ছা এই ক্ষুদ্র চিকিৎসকের নেই।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে