ঢাকা শনিবার, ১৯ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ

সরকারের সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির চিফ কো-অর্ডিনেটর


০৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১২:৫০

জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের কথা বলছি

জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের কথা বলছি

সকল সৃজনশীলতায় এমন একটা ভাবদর্শন থাকে, যা অয়োময় প্রত্যয় ও প্রতীতির নেপথ্য নায়ক হিসেবে অনির্বচনীয় ভূমিকা পালন করে। সেই বলিষ্ঠ বোধ ও বিশ্বাস, সেই অনুভব-অনুপ্রেরণা, সেই সুকৃতির সুষমা ব্যক্তিকে প্রতিষ্ঠানে পরিণত করে আর ব্যষ্টি হয় সমষ্টির শক্তি। যে মহৎ কর্মোদ্যোগ দেশ ও জাতির সীমানা পেরিয়ে মানবসমাজ ও সভ্যতার জন্য অনুপম আস্থা ও সেবার আদর্শ হিসেবে প্রতিভাত হয়, তা আবার নিজেই একটা ভাবাদর্শ নির্মাণ করে থাকে। জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম (জন্ম ৩১ ডিসেম্বর ১৯১১— মৃত্যু ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯) এমন এক ভাবাদর্শের সাধক ও উদগাতা, যা বিশ-একুশ শতকের বাংলাদেশে এবং এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানবভাগ্যে আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচ্য।

মানবতাবোধ দ্বারা তাড়িত গতিশীল জীবনের অধিকারী জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ছিলেন বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থে এমন একজন প্রতিভাধর ব্যক্তি, যার মধ্যে নিহিত ছিল বহুমুখী মানবীয় গুণের সমাহার। তিনি আজীবন নিজেকে জড়িত রেখেছিলেন মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দেশের ব্যক্তি এবং সমাজ থেকে আরম্ভ করে জাতীয় পর্যায়ে তার এমন একটি মর্যাদাশীল আসন তৈরি হয়েছে, যা অর্জন অন্য কোনো চিকিৎসা সমাজবিদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তিনি চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে চিকিৎসাসেবাকেই জীবনের প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়ে নিজেকে একজন জাত শিক্ষক, চিকিৎসা সমাজবিদ, সহানুভূতিপ্রবণ প্রাজ্ঞ চিকিত্সক, অপ্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠক এবং সুদক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে দেশ ও জাতির সেবায় উত্সর্গ করেছিলেন। বহুমুখী চিন্তাশীল ও বিরল মেধাশক্তির অধিকারী ডা. মো. ইব্রাহিম স্বীয় চিকিত্সক পেশার গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে তার বহুমুখী কর্মোদ্যম ও স্পৃহাকে সমাজসেবার বৃহৎ পরিসরে পরিব্যাপ্ত করে তার সক্ষমতাকে আরো ব্যাপক এবং সফলভাবে বিকশিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তার প্রধানতম সাফল্য বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চিকিৎসা পেশাকে চিকিৎসা সমাজসেবায় রূপান্তরিত করা। 

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম কঠোর পরিশ্রমী, নিয়মানুবর্তী, উচ্চাকাঙ্ক্ষী, সৎ ও কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন। শিক্ষাজীবনে তার মেধা ও সাধনার মেলবন্ধনের ফলে অবজ্ঞাত ও অনগ্রসর সমাজ ও পরিবেশ থেকে তিনি উঠে এসে পৌঁছে ছিলেন সাফল্যের শিখরে। ১৯৩৮ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হতে এমবিবিএস পাস করে চাকরিতে যোগ দিয়ে মাস তিনেকের মতো চক্ষু বিভাগে কাজ করার পরই কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রফেসর অব মেডিসিনের হাউজ ফিজিশিয়ানের পদটি পেয়ে যান তিনি। এ পদটির জন্য গৃহীত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অধ্যাপক মনি দে তার প্রিয় ছাত্র ডা. ইব্রাহিমকেই নির্বাচন করেছিলেন। পূর্বে যে স্বল্পসংখ্যক মুসলমান ডাক্তার ছিল, তাদের কেউই এ পদটি পাননি। ডা. ইব্রাহিমই এ পদে প্রথম মুসলমান ডাক্তার ছিলেন। আর এ পদটি উচ্চাকাঙ্ক্ষী ডা. ইব্রাহিমের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এ সময়ে (১৯৩৮-৪৫) এবং পরবর্তী দুই বছর (১৯৪৫-৪৭) কলকাতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান হিসেবে তিনি দেশব্যাপী নন্দিত প্রখ্যাত বিপ্লবী নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, অনন্ত সিং, ডিএন ধীরেন্দ্র মুখার্জী  এবং সর্বভারতীয় মুসলিম নেতাদের মধ্যে কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮), শের-ই-বাংলা এ.কে. ফজলুল হক (১৮৭৩-১৯৬২), হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী (১৮৯৩-১৯৬৩) প্রমুখ ব্যক্তির চিকিৎসাসূত্রে সান্নিধ্যে আসেন। ১৯৪৯ সালে যুক্তরাজ্য থেকে রেকর্ড পরিমাণ স্বল্পসময়ে এমআরসিপি, ১৯৫০ সালে আমেরিকান কলেজ অব চেস্ট ফিজিশিয়ানসের এফসিসিপি, ১৯৬২ সালে পাকিস্তান কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের এফসিপিএস, ১৯৬৭ সাালে রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের এফআরসিপি, ১৯৭৮ সালে রয়েল কলেজ অব ফিজিশিয়ানস (গ্লাসগো)-এর এফআরসিপি  ডিগ্রি অর্জন তার মেধা ও মুনশিয়ানার স্বীকৃতি। তিনি একাধারে দায়িত্বপালন করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের এডিশনাল ফিজিশিয়ানসের এবং অধ্যাপনা করেন কলেজের ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও মেডিসিন বিভাগে (১৯৫০-১৯৬২), স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিনের অধ্যাপক ও পরে অধ্যক্ষ (১৯৬২-৬৪), করাচির জিন্নাহ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিকেল সেন্টারের মেডিসিনের অধ্যাপক ও পরিচালকের (১৯৬৪-৭১) পদে।  

১৯৭৫-৭৭ সাল পর্যন্ত ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ, শ্রম ও জনশক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনিই প্রথম তদানীন্তন সরকারের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনা প্রণয়নে প্রধান ভূমিকা পালন করেন এবং জাতীয় জনসংখ্যা কাউন্সিলকে পরিবার পরিকল্পনা নীতিমালা ও জাতীয় কার্যক্রম পরিচালনার নিয়ন্ত্রকের কার্যকর ভূমিকায় দাঁড় করান। তিনি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণকে দেশের ১ নং সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে বহুকৌণিক পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে সরকারের পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে মৌলিক পরিবর্তন আনয়নে প্রয়াস পান। তিনি কেবল ডাক্তার বা পরিবার কল্যাণ কর্মীদেরই জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে নিয়োজিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করতেন না, বরং সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, সংস্থা, এমনকি আপামর জনগণকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেন। পরিবার পরিকল্পনাকে এ সম্পৃক্তকরণ কার্যক্রমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাদেশের মতো দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত দেশের সার্বিক উন্নয়নের গুরুত্ব তিনি উপলব্ধি করেন। এ মৌলিক পদ্ধতি প্রবর্তনের ফলস্বরূপ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ মন্ত্রণালয় ছাড়াও পরিবার পরিকল্পনা, সমাজকল্যাণ, মহিলা-বিষয়ক, শিক্ষা, শ্রম, ধর্ম-বিষয়ক, যুব উন্নয়ন, তথ্য ও বেতার প্রভৃতি মন্ত্রণালয় ও বিভাগসহ বিভিন্ন এনজিওকে এ পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তার নীতিমালার মূলভিত্তি ছিল উদ্বুদ্ধকরণ এবং শিক্ষা কার্যক্রম ছিল সরাসরি লক্ষ্যবস্তুভিত্তিক। তার সময়ই প্রথম সর্বাধিক পরিমাণ কর্মীকে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়। কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে জেলা, মহকুমা, থানা, ইউনিয়ন এবং থানা হয়ে গ্রামপর্যায়ে এ কার্যক্রম পরিব্যাপ্ত হয়। বাংলাদেশের আর্থসামাজিক পরিবেশের উন্নয়ন ভাবনায় ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিমের এ গভীর অন্তর্দৃষ্টি বিশ্লেষণে বলা যায় তিনি যদি উন্নত বিশ্বে জন্মাতেন, তিনি বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন ও স্বীকৃতি লাভ করতেন।

একই সঙ্গে স্বপ্ন দেখা ও সর্বাঙ্গ সুন্দরভাবে সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করার মোহনীয় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন মোহাম্মদ ইব্রাহিম। মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত এ মহানুভব মানুষটি মানবতার মহান উচ্চ আদর্শের প্রতি ছিলেন আজীবন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও নিবেদিতচিত্ত। বাস্তবতায় দেখা যায়, অনেক সময় এ জাতীয় মানুষের মধ্যে বাস্তব বুদ্ধির কিছুটা ঘাটতি থাকে, যার ফলে তাদের আদর্শবাদ জাগতিক উপযোগিতার ক্ষেত্রে আপাত সাংঘর্ষিকতায় তারা হয়তো কাঙ্ক্ষিত কোনো অবদান প্রত্যক্ষভাবে রাখতে পারেন না। বিস্ময়ের ব্যাপার, ডা. ইব্রাহিম ছিলেন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। তিনি সেবার যে উচ্চ আদর্শ তার সহকর্মীদের মধ্যে প্রতিনিয়ত সঞ্চারিত করতে সচেষ্ট ছিলেন, তা ছিল বাস্তবতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত। শুধু উপদেশ, আদেশ, নির্দেশ নয়— আপন দৃষ্টান্ত দিয়ে তিনি তার স্বপ্ন, কল্পনা ও আদর্শকে বাস্তব রূপ দিতেন। কর্তব্য পালনে, শৃঙ্খলা রক্ষায়, ঠিক সময়ে ঠিক কাজটি করায়, সময় মেনে চলায়, স্নেহ-মমতা ও সহানুভূতিতে তার মতো বড়মাপের মানুষ যেকোনো দেশে যেকোনো সমাজে বিরল। বস্তুত অদম্য প্রাণশক্তি, ইস্পাতকঠিন সংকল্প এবং সাংগঠনিক বিচক্ষণতার সঙ্গে শ্রম ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যোগ্যতার মহামিলন ঘটেছিল একসঙ্গে এ বহুমুখী প্রতিভাশালী ব্যক্তিত্বের বলয়ে। কোনো সভায় তাকে কোনো দিন দেরি করে আসতে দেখা যায়নি। প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রের প্রবাসে দুর্ঘটনাজনিত অকাল বিয়োগের খবর পাওয়ার পরদিনও কাঁটায় কাঁটায় ৭টায় এসে সমিতি ও হাসপাতালের কাজে নিয়োজিত হয়েছেন, এমনকি এয়ারপোর্টে তার মরদেহ গ্রহণের আগের মুহূর্তেও সিভিল অফিসারদের একাডেমিতে সিডিউল অনুযায়ী বক্তৃতা দিয়েছেন। কর্তব্য যে ধর্ম, তা অধ্যাপক ইব্রাহিম তার নিজের জীবনে প্রতিফলিত করেছিলেন। তিনি ধর্মপরায়ণ ছিলেন, কিন্তু ধর্মীয় ব্যাপারে তার কোনো গোঁড়ামি ছিল না। তার সফলতার ক্ষেত্রে অন্য গুণাবলির সঙ্গে সঠিক নেতৃত্বই মূল ভূমিকা পালন করেছে। তার সকল উদ্দেশ্যের মধ্যে সততা ছিল, ছিল অন্তর ভরা মমতা। তাই তার একক প্রয়াস বহুল সাধনার ধন হয়ে উঠেছিল।

যে দেশ ও সমাজে সীমাহীন সার্বিক (অর্থনৈতিক, চিন্তা চেতনার, সহনশীলতার, সাধনার) দারিদ্র্য। এ কারণে বড় কিছু করা যায় না, মহৎ কিছু গড়ে ওঠে না এবং যেখানে চিন্তার দৈন্য, উদ্যম-উদ্যোগের অভাব এবং ত্যাগ শিকারের অনীহা অন্যতম প্রতিবন্ধকতা— সে দেশে জাতীয় অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম প্রমাণ করে দিয়েছেন উদ্দেশ্য যদি মহৎ হয়, লক্ষ্য যদি স্থির থাকে, প্রচেষ্টা যদি আন্তরিক হয়, তবে স্বল্পোন্নত দেশেও বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি তথা বারডেমের মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা যায়। ১৯৫৬ সালে তার প্রতিষ্ঠিত ডায়াবেটিস চিকিৎসাকেন্দ্রের প্রথম বছরে মাত্র ৩৯ জন রোগীর চিকিৎসা করা সম্ভব হয়েছিল। সেখানে এখন শুধু বারডেমই  চিকিৎসাধীন নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা পাঁচ লাখের কাছাকাছি। শুধু ঢাকা শহর এবং এর উপকণ্ঠে নয়, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির ডায়াবেটিস চিকিৎসাকেন্দ্র আজ দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ছে। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের সততা থাকলে অঙ্কুর কি করে মহা মহীরুহের রূপ লাভ করতে পারে, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির অন্যতম প্রতিষ্ঠান শাহবাগের বারডেম এটির প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বারডেম বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক এর একটি সহযোগী কেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন বাংলাদেশের ডায়াবেটিক চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাকে বিশ্বব্যাপী ডায়াবেটিক চিকিৎসার মডেল বা অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে গণ্য করে। আর ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসার সঙ্গে আমেরিকার জসলিন, ইংল্যান্ডের লরেন্স ও বাংলাদেশের ইব্রাহিমের নাম জড়িয়ে রয়েছে।

রোগীর পরীক্ষা ও রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ডাক্তার ইব্রাহিম ছিলেন নৈপুণ্য ও সূক্ষ্মতার প্রতি অচঞ্চল। এর মধ্যেই তিনি তার শিক্ষার্থী সহকর্মীদের  শিখিয়ে ও বুঝিয়ে দিতেন রোগীর রোগ পরীক্ষণ ও নির্ণয় বিষয়টি কত নিখুঁত ও সূক্ষ্ম হওয়া উচিত এবং তিনি কীভাবে তা চান। তিনি ছিলেন প্রকৃতই একজন হাতে-কলমে শিক্ষাদাতা এবং একাধারে তার চিকিৎসা দর্শনের মর্মসাধক। ‘আমি নিজে একটা কথা আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করি এবং আমার সহকর্মীদের এ কথাটা আমি সব সময় বলি যে, আমরা জনগণের খাদেম, এ মনোভাব নিয়ে সেবা করব; তাদের প্রভু— এ মানসিকতা নিয়ে নয়। কারণ নিজেকে খাদেম মনে করলেই সেবাটা আন্তরিক হয়, মনের মধ্যে বিনয় আসে আর মানুষের প্রতি একটা মানবিক সহমর্মিতা জেগে ওঠে। আর একটা কথা আমাদের ভুললে চলবে না তা হলো, আমাদের এ জনগণ হলো স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের জনগণ। এরা ১৯৪৭ সালের আগের ব্রিটিশদের গোলাম জনগণ নয়। এরা ১৯৭১ সালের আগের জনগণ নয়। যখন এ দেশকে বলা হতো কলোনি। এরা স্বাধীন-সার্বভৗৈম একটি দেশের জনগণ।’

ডা. ইব্রাহিম চিকিৎসার ক্ষেত্রে ‘ইমপ্যাথি’ শব্দটির ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করতেন। ইংরেজি ‘ইমপ্যাথি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো স্বীয় সত্তা অন্যের সত্তায় বিলীন করে দিয়ে অন্যের শোক, দুঃখ ও ব্যথার অভিজ্ঞতা কল্পনায় নিজে অনুভব করার শক্তি। আর ‘সিমপ্যাথি’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো অন্যের শোক-দুঃখের সঙ্গে সমবেদনা বা সমব্যথিত হওয়া। অন্যের শোক, দুঃখ এবং অন্যান্য অভিজ্ঞতা মনে না করলে যেমন দুঃখী বা আর্তপীড়িতের গভীরে যাওয়া যাবে না, ঠিক তেমনি তিনি তার প্রতিষ্ঠানের সহকর্মী সব ডাক্তার, সেবাকর্মী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তিনি সব সময়ে বলতেন ‘ইমপ্যাথি’ শব্দটির অন্তর্নিহিত ভাবকে নিজের মনে প্রতিফলিত করে সেবাদানে মনোনিবেশ করতে। এরূপ মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে যখন কোনো সেবাদানকারী কোনো আর্তপীড়িতের সেবায় নিজেকে প্রয়োগ করবে, সে সেবাদানকারীই আর্তপীড়িতের সত্তার সঙ্গে বিলীন হতে পারবে আর সেবাদান তখনই পূর্ণাঙ্গ হবে। এভাবেই কোনো সেবাদানকারী সেবাগ্রহণকারীর গভীরে প্রবেশ করতে পারবে, আর যখন সেবাদানকারী মনে করবে আমি যদি এ আর্তপীড়িত লোকটির মতো হতাম, যে আমার নিকট তার আর্তপীড়ার উপশম চাইতে আসছে এবং আর্তপীড়িতটি যদি আমার জায়গায় হতো, যার নিকট হতে আমি পীড়িত হয়ে সেবাগ্রহণ করতে এসেছি। এ মানবীয় গুণ আয়ত্ত করার জন্য সবাইকে সব সময় অনুপ্রাণিত করার জন্য তিনি বলতেন: ‘আপনাদের সেবা করতে আমাদের সুযোগ দেয়ার জন্য আমরা আপনাদের কাছে কৃতজ্ঞ।’

জাতীয় অধ্যাপক ইব্রাহিম চিকিৎসা মানবসম্পদ তৈরির স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য বারডেম একাডেমি এবং নার্সিং ইনস্টিটিউট, আরভিটিসি ও বারটান গড়ে তোলেন। এরই সূত্র ধরে বা ভিত্তিতে পরবর্তীকালে সমিতির ইব্রাহিম মেডিকেল কলেজ, নর্থবেঙ্গল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি মেডিকেল কলেজ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ্ সায়েন্সেস (বিইউএইচএস), বারডেম নার্সিং কলেজসহ বহু প্রতিষ্ঠানে গবেষণা ও চিকিৎসা ডিগ্রি প্রদানের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। কেননা তিনি মনে করতেন, মানবিক গুণ এবং সামাজিক দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন দক্ষ চিকিত্সক, নার্স ও টেকনিশিয়ান না থাকলে বা গড়ে না উঠলে কার্যকর ডায়াবেটিস চিকিৎসা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ডায়াবেটিস চিকিৎসা কার্যক্রম এর শুরু থেকেই পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্যশিক্ষা কার্যক্রম প্রবর্তন করেন। তিনি মনে করতেন, ডায়াবেটিক রোগীকে তার লাইফস্টাইল নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে অর্ধেক চিকিৎসা শেষ। উপযুক্ত পরামর্শ পেলে খাদ্যমান বজায় রাখা এবং শৃঙ্খলা সহজসাধ্য হয়। ওষুধপত্র দেয়ার সঙ্গে রোগীকে খাদ্যের তালিকা— কোন খাদ্যে কি পরিমাণ শর্করা ও ক্যালরি বা প্রোটিন আছে, তার একটা সচিত্র স্পষ্ট ধারণা দেয়া হয়। গাইড বইয়ে প্রতিটি রোগীর কি ধরনের খাবার কি পরিমাণ খেতে হবে, তার নির্দেশনা চার্ট দেয়া আছে। সমিতির প্রতিটি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হেলথ এডুকেটরের পদ রয়েছে এবং রোগীকে কাউন্সিলিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে।

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ডায়াবেটিক রোগীর পুনর্বাসনের বিষয়ে তার চিন্তাভাবনাকে জাগ্রত রেখেছিলেন। তিনি জুরাইনে নিজের পারিবারিক সম্পত্তি সমিতিকে দান করে তথায় ডায়াবেটিক রোগীদের পুনর্বাসন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেন। ডায়াবেটিক রোগীরা যাতে সংসারে ও সমাজে বোঝা হয়ে না দাঁড়ায়, কর্মজীবনে অকেজো না হয়ে পড়ে— সেজন্য এখানে তাদের বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। শিশু-কিশোরদের মধ্যে যারা টাইপ-১ ডায়াবেটিক রোগী, তাদের সংসার ও সমাজের যাতে বোঝা হয়ে না দাঁড়াতে হয়, সেজন্য সমিতির সিডিআইসি প্রকল্পের আওতায় বর্তমানে ২০/২১ বছর বয়স অবধি তাদের বিনামূল্যে ইনসুলিন সরবরাহসহ তাদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশের জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি রয়েছে।

নীতি ও নৈতিকতার প্রশ্নে আপসহীন প্রফেসর ইব্রাহিম মনে করতেন, ডাক্তারের প্রতি রোগীর আস্থা একটি বড় অনুষঙ্গ। ডাক্তার ইব্রাহিম John Ruskin (8 February 1819-20 January 1900)-এর অর্থনৈতিক দর্শন-বিষয়ক প্রবন্ধাবলি Unto This Last (1860) বইটির ছাঁচে তার সেবাদর্শন স্থির করেছিলেন এবং সেভাবেই সমগ্র কর্মজীবন গড়ে নিয়েছিলেন, যে বইয়ে রাসিকন দেখিয়েছেন— ‘অর্থ ও বিত্ত মানুষের সত্যিকারের মূল্যায়ন করে না, মানুষের মূল্যায়ন হয় অন্য মানুষের তার ওপর আস্থার ভিত্তিতে।’

১৯৫৬ মাত্র ২৩ জন রোগী নিয়ে সেগুনবাগিচার টিনশেডে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম যখন ডায়াবেটিস চিকিৎসা শুরু করেন, তখন থেকেই রোগীর ওপর পরিচালিত পরীক্ষা-নিরীক্ষায় লব্ধ প্রাইমারি ডাটা সোর্সকে গবেষণার উত্কৃষ্ট উপাদান বিবেচনার গুরুত্ব উপলব্ধি করেন। সে সময় পরীক্ষার জন্য রোগীর সন্ধানে নামতে হতো তাকে। রাস্তায় চলার পথে কোনো রোগাক্রান্ত অসহায় অসুস্থ মানুষ ভিখারী বেশে বসে থাকলে তাকে নিজের গাড়িতে তুলে নিয়ে যেতেন, তাকে খাইয়ে-দাইয়ে ভালো পোশাক-আশাক পরিয়ে উত্ফুল্ল করে তারপর তার থেকে রক্ত নিয়ে পরীক্ষা করতেন। সেই পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে তার গবেষণা এগিয়ে চলত। বিলেতের বিখ্যাত বিদ্যায়তনে অধ্যয়ন ও বড় বড় হাসপাতালে চাকরিসূত্রে অর্জিত অভিজ্ঞানের আলোকে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন বিশ্লেষণ এবং উপসংহারে পর্যবেক্ষণ প্রক্ষেপণের মেথডোলজি তিনি অনুসরণ করতেন। তার প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধগুলোয় বাস্তব অনুসন্ধান উৎসারিত পরিসংখ্যান তথ্য-উপাত্তের বিশ্লেষণের উপান্তে এসে একটি পরিশীলন পর্যায়ে পৌঁঁছাত। আধুনিক গবেষণা রীতিতে ডাটা বিশ্লেষণ এবং একটা রেশনাল কনক্লুশানে উপনীত হতেন এবং তারই ভিত্তিতে টেকসই ও লাগসই চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার পথে যেতেন।

সৌজন্যে : bonikbarta.net

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত