ঢাকা বুধবার, ১৬ অক্টোবর ২০১৯, ১ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫ ঘন্টা আগে
০৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২৩:০২

সরকারী চাকরীতে বদলীই আর নিবর্তনই কি সততার পুরষ্কার?

সরকারী চাকরীতে বদলীই আর নিবর্তনই কি সততার পুরষ্কার?

৩৫ তম বিসিএস এ মাত্র সাড়ে তিন মাস আগে কয়রা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ সহকারী সার্জন হিসেবে যোগদান করেন ডা. আব্দুর রব (Abdur Rob) তিনি এ এলাকারই ছেলে। শৈশবের অনেক স্মৃতি বিজড়িত এ হাসপাতাল। তিনি আগে থেকেই জানতেন নানা অব্যবস্থাপনা আর অনিয়মের ঘোরপ্যাঁচে হাসপাতালটির স্থবির হয়ে থাকার কথা। তাই কর্মস্থলে যোগদান করেই সিদ্ধান্ত নেন এ অচলাবস্থার পরিবর্তন আনবেন তিনি। এই অল্প কদিনে অনেক কিছু বদলেও ফেলেন। নানা অনিয়ম আর অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে বিরাগভাজন হয়ে পড়েন হাসপাতালের শীর্ষপদ থেকে শুরু করে কর্মচারীদের অনেকের কাছেই। যাদের ষড়যন্ত্রে সম্প্রতি জারি হয়েছে তার বদলীর আদেশ। এ আদেশ দুর্নীতিবাজ কিছু লোকের আনন্দের কারণ হলেও পুরো এলাকাতেই নেমেছে শোকের ছায়া।

বহু বছর ধরে জমে থাকা ময়লা আবর্জনার ফলে যে হাসপাতালের প্রাঙ্গণে গন্ধে টেকা যেতো না, চিকিৎসা সেবা নিতে হতো নাকে রুমাল চেপে; হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা নোংরা ওয়ার্ডে থাকতে গিয়ে হাসফাস করতো; যেখানে হাসপাতালের নোংরা টয়লেট যাওয়ার চিন্তা করাই অসম্ভব ছিলো সেখানে ডা. আব্দুর রব এসে যেন যাদুর পরশ ছড়িয়ে দিলেন। হাতে নিলেন হাসপাতাল পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করণ কর্মসূচী। প্রতিষ্ঠানের ক্লিনার- ওয়ার্ড বয়রা মোটেও ভালোভাবে নিলো না এ মহতী উদ্যোগ। তারা তার নির্দেশ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করলো। তিনি যখন একাই হাসপাতাল প্রাঙ্গণ পরিষ্কার করতে শুরু করলেন কর্মচারীরা লজ্জ্বায় হাত লাগালো কাজে। এর বাইরেও নিজের খরচে বাইরের লোক দিয়েও কাজ করালেন। ওয়ার্ডে জুতা প্রবেশ নিষেধ করা হলো। দিন দুই বেলা মোছা ও তিনবেলা ঝাড়ু দেয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ঝকঝক করতে লাগলো এতোদিনের নোংরা হাসপাতাল। হাসপাতালের টয়লেট গুলো তিনি ভালো করে পরিষ্কার করালেন। নিজ খরচে আলাদা স্যান্ডেল এর ব্যবস্থা করলেন। এলাকাবাসী এ অভূতপূর্ব পরিবর্তন অবাক বিষ্ময়ে লক্ষ্য করলো। এ যেন এক জাদুকরের স্পর্শ! হাসপাতালে নামলো রোগীর ঢল। দুর্গম কয়রা উপজেলায় ডা. আব্দুর রব হয়ে উঠলেন আশা ভরসার স্থল; ক্রমশ তার জনপ্রিয়তার পারদ উপরে উঠতে লাগলো।

শুধু পরিচ্ছন্নতা ফিরিয়ে আনাই তার একমাত্র অর্জন নয়। হাসপাতালের যথাযথ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে তিনি শুরু করলেন সতর্ক তদারকী। সরকারী ঔষধ চুরির মচ্ছব ঠেকিয়ে গরীব রোগীদের কাছে পৌছে দিতেও তিনি নিলেন বেশ কিছু কার্যকর উদ্যোগ। অসহায় রোগীরা যার ফলাফল পেলেন হাতে হাতে। রাশ টেনে ধরলেন ক্লিনিকের দালাল বাণিজ্যের। সরকারি হাসপাতালের রোগী বাইরে ভাগিয়ে নেবার পথে তিনি হয়ে দাড়ালেন বড় বাঁধা।

প্রতিটি নরমাল ডেলিভারির জন্য এই সরকারি হাসপাতালের প্রাঙ্গণেই রোগীদের কাছ থেকে আদায় করা হতো কমপক্ষে তিন হাজার টাকা করে। জনশ্রুতি আছে, এই অবৈধ অর্থের ভাগ হাসপাতালের প্রধান কর্তার কাছেও পৌঁছে। তাই এই অনিয়মের বিরুদ্ধে কেউ কিছু করতে পারে না। ডা. আব্দুর রব শক্ত হাতে এই অনিয়মও রুখে দিলেন।

এতো এতো প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে দাড়ানোর অবশ্যম্ভাবী ফল হিসেবেই মাত্র সাড়ে তিন মাসেই হাসপাতালের ভেতরে বাইরে বিভিন্ন স্তরে তার অনেক শত্রু তৈরী হয়ে গেলো। তাদেরই ষড়যন্ত্রে ডা. আব্দুর রবের বদলীর আদেশ জারি হয় গত ৩১ আগস্ট।

এলাকাবাসী কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেনা এই অন্যায় আদেশ। তারা এ বদলী ঠেকাতে মানববন্ধন, গণ সাক্ষর গ্রহণ প্রভৃতি কর্মসূচীর মাধ্যমে প্রতিবাদ করছে। তারা চান ডা. আব্দুর রব যেই আশার আলো জ্বালিয়েছেন এ প্রত্যন্ত এলাকার এই খেটে খাওয়া মানুষের বুকে; যে স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন সামর্থ্যহীন পীড়িত মানুষের চোখে সে স্বপ্নের সহসাই যাতে ভঙ্গ না হয়; আবার যাতে ময়লার ভাগাড়ে পরিণত না হয় এলাকার একমাত্র সরকারী হাসপাতাল প্রাঙ্গণটি। আরও অনেকদিন যাতে তিনি এ এলাকার মানুষদের সেবা দিতে পারেন এ প্রত্যাশাই কয়রাবাসীর। এলাকাবাসীর এ দাবী কি আদৌ অযৌক্তিক? দেখা যাক কে জেতে? সততা দেশ প্রেমে উজ্জীবিত সেই সাহসী তরুণ নাকি দুর্নীতি আর নোংরামির পাঁকে ডুবে থাকা কিছু নর্দমার কীট।

শেষ করছি এ ঘটনার প্রেক্ষিতে দেয়া ডা. আব্দুর রব এর দেয়া আবেগঘন ফেসবুক স্ট্যাটাস এর কিছু অংশ দিয়ে,

"আজ আমার বদলির অর্ডার এসেছে। আমার অজান্তে আমি দুর্নীতির প্রায় সকল সেক্টরে হাত দিয়ে ফেলেছি।... আমি জয়েন করলে বানের জলের মত রুগী আসা শুরু করেছিল হাসপাতালে। সাড়ে তিন মাস না যেতেই বদলির অর্ডার আসল। স্রোতের সাথে মিশে গেলেই হত, আমারো ভাগ থাকত একটা কিন্তু পারিনি। ২০০৭ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর আমি যখন উপকুলের এই ক্ষুদ্র জেলে পল্লী থেকে ডাক্তারি পড়ার জন্য বেডিং পত্র নিয়ে ভ্যানে উঠব বলে বের হয়েছিলাম, পিছনে তাকিয়ে দেখি কয়েকশত নারী পুরুষ আমাকে বিদায় দেয়ার জন্য দাড়িয়ে আছে। এদের কাছে আমার ঋন ছিল। পোস্টিং নিয়ে এখানে আসলে আমার চেয়েও খুশি হয়েছিল এই লোকগুলো। আমি পরাজিত। দেশ প্রেম, সততা, এগুলো নিয়ে অফিসার হতে নেই। আমি এতোটাই বোকা যে সামান্য এই জিনিসটুকুও জানতাম না।"

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত