শনিবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৭ - ৮, আশ্বিন, ১৪২৪ - হিজরী



ডা. নাসিমন নাহার

চিকিৎসক ও লেখক


ডেডিকেটেড টু অল বাংলাদেশী ডাক্তার-- দ্য রিয়েল হিরো

লাখো সদস্যের লেখালেখির একটা বিখ্যাত ফেসবুক গ্রুপে "বাংলাদেশের চিকিৎসা পরিষেবা স্পেশ্যালী সিজারিয়ান সেকশন এবং ডাক্তারদের ভূমিকা" প্রসঙ্গে একটা ভুল, মনগড়া, যুগ যুগ ধরে ধারনা করে মুখস্থ করা তথ্য সমৃদ্ধ পোস্টকে কাউন্টার করে লিখছি এই পোস্টটি।

পোস্টটা ঐ গ্রুপেই দিয়েছিলাম। তিন ঘন্টা পার হবার পরেও যখন এপ্রুভ না হয়ে ঝুলছে তখন মনে হচ্ছে ঐ গ্রুপে দেশীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং ডাক্তারদের বিরুদ্ধে লেখা ভিত্তিহীন আজগুবি বিভ্রান্ত মূলক পোস্ট যতটা আদরণীয়; ডাক্তারদের পক্ষে লেখা যৌক্তিক পোস্ট ততটা নয়। এডমিন প্যানেলের অনেকেই এবং গ্রুপের অনেক সদস্য এড আছেন আমার সাথে। আশা করি আপনাদের ভুল ধারনা ভাঙ্গতে এবং মতামত জানতে পারব।


প্রথমে একটা ব্যাপার সবাইকে মাথায় রাখতে হবে আশ্চর্যজনকভাবে আমাদের দেশে সব্বাই মোটামুটি ডাক্তার !! ফার্মেসীর দোকানদার আংকেল থেকে শুরু করে নার্স, প্যারামেডিকস, টেকনোলজিষ্ট পর্যন্ত।এ থেকে কি বোঝা যায় ? বোঝা যায় যে, বাংলাদেশের জনগণের কমন সেন্স হচ্ছে সেই লেভেলের যারা MBBS কে বলে সিম্পল mbbs (!) কিন্তু ওষুধের দোকানদারকে ভাবে ডাক্তার!

MBBS লেভেলে আমরাদেরকে এগারোটা সাবজেক্ট পড়তে হয়। ৬০% করে নম্বর পেয়ে প্রতিটি সাবজেক্টে আলাদা আলাদা করে লিখিত মৌখিক ব্যবহারিক পরীক্ষাতে পাশ করতে হয়। সরকারি বেসরকারি সকল মেডিকেলের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয় নির্দিষ্ট ভার্সিটির অধীনে, লিখিত পরীক্ষার প্রশ্ন হয় বোর্ড পরীক্ষা স্টাইলে সব মেডিকেলের জন্য। আর ভাইবা ব্যবহারিক পরীক্ষা অন্য মেডিকেল কলেজের শিক্ষকদের কাছে দিতে হয় আমাদেরকে।

এতখানি বিস্তারিত বলার প্রয়োজন এখন দরকার। কারণ --- আমরা চাই দেশের জনগণ আর যেন মুখস্থ নয় বরং সত্য জেনে আমাদেরকে গালি দিক। এই পরীক্ষা পদ্ধতি আর কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা পদ্ধতি এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে চার মাসের সেমিষ্টারে এক একটা সাবজেক্ট শেষ। আর আমাদের দেড় থেকে দুই বছর আইটেম এসিসমেন্ট কার্ড ফাইনাল প্রফেশনাল এক্সামের ভেতর দিয়ে যেতে হয় এক একটা সাবজেক্ট পাশ করার জন্য। একটা আইটেম পেন্ডিং রেখে ক্লিয়ারেন্স আপনাকে দেয়া হবে না। এ তো গেল আন্ডারগ্রাড এর কথা। বুঝতেই পারছেন পোস্টগ্রাডে তাহলে কি তুফানটা চলে। ইনশাআল্লাহ লিখব সেটাও কোনদিন।

এখন আসুন ঐ পোস্টে। ঐ পোস্ট এবং ওখানে করা জনগন এবং এডমিনদের মন্তব্যের প্রতিউত্তর দেবার চেষ্টা করছি। যদিও আমার সম্মানিত অনেক সিনিয়ররা ঐ পোস্টেই বলেছেন কথাগুলো।

#আপনারা_বলেছেন---

'""৭০%/ ৯০% ( এই ৯০% বলেছেন একজন এডমিন) মাতৃ সিজার অপারেশন হয় বাংলাদেশে।""'

----- সম্পূর্ণ ভুল তথ্য। 
বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর ৩৬ ভাগ হাসপাতাল ডেলিভারী করেন। অর্থাৎ ৭৪ ভাগই বাসায় ডেলিভারী করে। যারা শতভাগ নরমাল ডেলিভারী করেন। এই ৩৬ ভাগের মধ্যে ২৩ ভাগের সিজার হয়। সিজারের হার সরকারীতে কম, বেসরকারীতে বেশি ।

এবার বলার চেষ্টা করছি বাংলদেশে সিজারের মূল কারণগুলো----

০১। শারীরিকভাবে আনফিট মা, দেহের গড়নের কারনে পেলভিস ছোট থাকায় ও ফলোআপে দুর্বলতার কারণে তাঁদের এ আনফিটনেস বেড়ে যায়। এছাড়াও ইদানিং অধিক বয়সে মা হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে, যা নরমাল ডেলিভারীর জন্য কিছুটা হুমকি স্বরূপ।

০২। ব্যথার ভয়--- মেয়ের মা এ ব্যাপারে বড় ভূমিকা রাখে।’ আপা সিজার করে দেন, আমার মেয়ে এতো ব্যথা সইতে পারবে না!'--অহরহ শুনতে হয় আমাদেরকে।

০৩। এপিডুরাল এ্যানেসথেসিয়ার ঘাটতি বা এ বিষয়ে দক্ষ এ্যানেসথেসিওলজির অভাব। ফলে ব্যথামুক্ত নরমাল ডেলিভারী কঠিন হয়ে যায়!

০৪। ক্লিনিক গুলোর অধিক মুনাফা লাভের প্রতিযোগিতা, কিছু চিকিৎসকের অর্থের প্রতি অধিক আগ্রহ এবং সময়ের অভাব।

০৫। ঝুকিপূর্ণ মায়ের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া।

#আপনারা_বলেছেন---

'*Bd তে সম্ভবত ৩৮ সপ্তাহের বেশী wait করে না।'

-------এটাও অনেকাংশে ভুল। কারণ, ৩৮ এর বেশি অপেক্ষা করার ঘটনা অহরহ আছে। আপনাদের নিমন্ত্রণ রইলো দেশের যেকোন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের লেবার রুমে। প্রয়োজনে কতৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে আপনাদেরকে পেপারস দেখানো হবে রোগীসহ।

#আপনারা_বলেছেন---

'পেটে পানি না থাকলে বা শুকিয়ে গেলে bd dr.রা ত আর এক মুহূর্ত দেরী করে না। কিন্তু এখানে দেখলাম, পেটে পানি না থাকলেও কৃত্রিম ভাবে পানির ব্যবস্থা করেও অনেক সময় নরমাল ডেলিভারী করানোর চেষ্টা করা হয়। সেভাবেও ব্যর্থ হলে শেষ পর্যায়ে বাধ্য হয়ে সিজার করায়।'

------এই তথ্য আমাদের জন্য বিনোদনমূলক, কারণ, এমন কোন সেচ ব্যবস্থা নেই যা দিয়ে পেটে পানি (প্রকৃত অর্থে এ্যামনিওটিক ফ্লুইড) বাড়ানো যায়!

#আপনারা_বলেছেন--

'বাচ্চা নরমাল হওয়ার জন্য তারা রোগীকে প্রচুর হাঁটতে বলে। আর নানা ধরনের ব্যায়াম শিখিয়ে দেয়।'

-------আমাদের এখানেও হাঁটতে বলে এবং ব্যায়াম শিখিয়ে দেয়! সম্ভবত রোগীরা এই কথাগুলো ভুলে যান নানা ব্যস্ততার কারনে আর ডাক্তারের ভুল ধরে সময় নষ্ট করার পেছনে।

#আপনারা_বলেছেন---

'এখানে রোগীনীকে কসমেটিক আর সিলাই দুটোই করে। ফলে রোগীর আর তেমন কোনো risk থাকে না।'

---এই মন্তব্য পড়ে হাসতে হাসতে চোখে জল চলে এসেছে। কারণ, কসমেটিক মানে সেলাই বিহীন নয়। কসমেটিকে সেলাই লুকানো থাকে। বাহির থেকে দেখা যায় না। এইজন্য ঐ পোস্টে আমি মন্তব্য করেছিলাম খানিকটা লেখাপড়া করে ডাক্তারদের পেছনে লাগতে হবে। নতুবা শুধুই বিনোদনের খোরাক হবেন।

#আপনারা_বলেছেন---

'আপারেশনের পরও তারা রোগীকে প্রচুর হাঁটতে বলে।
এটা রোগীর পেটের জন্য অনেক ভালো হয় ।
অথচ bd তে অপারেশনের পরই রোগীর পেটে বড় একটা বেল্ট পরিয়ে রাখে আর সেলাই কাঁচা থাকা অবস্হায় বেশী হাঁটতে নিষেধ করে। ফলে অনেক রোগী সিলাইয়ে ভীষণ ব্যথা পায়। আর শরীরে বাড়তি মেদ জমে।'

-----কেউ কেউ বেল্ট পরতে বলে । এই বেল্ট শুধুমাত্র হাঁটার সুবিধার জন্যই বলে। এতে রোগীর হাঁটার কনফিডেন্স বাড়ে। মেদ বাড়ার কারণ বেল্ট নয়, বরং রোগীরা সিজারের পর ভয়ে মুভমেন্ট কমিয়ে দেয়, খাবার গ্রহণ বাড়িয়ে দেয়। যা ওজন বৃদ্ধির কারণ।

#আপনারা_বলেছেন---

'এখানে অপারেশনের পরও তেমন কোনো এন্টিবায়টিক দেওয়া হয় না খেতে। দিলেও অল্প । শুধু ভিটামিন দেয় কিছু। এমনিতেও বিদেশের dr.রা অতি দদরকারের বাইরে তেমন কোনো ওষুধ দেয় না।'

----ভাইয়ারা আপ্পিরা, আমাদের এখানে যে পরিমান পরিবেশ দূষণ আর হাসপাতালের ক্রস ইনফেকশন (ক্রশ ইনফেকশন দেখতে গুগল সার্চ করুন)--- তাতে এ্যান্টিবায়েটিক দিলেও কাজ হয় না। পারলে আমাদের পরিবেশ সুন্দর করার জন্য কিছু পরামর্শ দেন জণগনকে।

#আপনারা_বলেছেন---

'ব্যাপারগুলো আমাদের দেশের ঠিক বিপরীত। আর আমাদের দেশের অধিকাংশ মেয়েরাও এখন নরমাল delivery এর চেয়ে সিজার অপারেশন করাটাকেই বেশী credit ও fashion মনে করে। নরমাল deliveryএর একদিনের প্রসব ব্যথার কষ্ট তারা সহ্য করতে নারাজ। অনেকে আবার ভীষণ ভয়ও পায়।

----এটা ঠিকই বলেছেন। 
আগের যুগে ত আমাদের নানী দাদিদের সবার নরমাল প্রসব হতো। নানী দাদীরা নামের আগে মোছাম্মৎ লিখত। এখন কি লেখে ? না। এটাই যুগের হাওয়া। আগের নানী দাদীরা গন্ডায় গন্ডায় বাচ্চা নিতেন। আপনি কিন্তু সেটা চাইবেন না। আগে বেশিরভাগ নানী দাদীই সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যেতেন। এখন কিন্তু দিন বদলেছে।

#আপনারা_বলেছেন---

' আর সিজারে dr.রা প্রাইভেটে অনেক মোটা অংকের টাকা নেয়। কিন্তু বিদেশেতো চিকিত্সা free. এমনকি সিজারেও টাকা লাগে না।'

--------- এটাও ভুল বললেন। কারণ সেখানে কোন কিছুই ফ্রি না। সবকিছুই ইন্সুরেন্স নির্ভর। 
 

আসলে কি জানেন, সিজারের সংখ্যা কমাতে হলে প্রেগনেন্ট হওয়ার আগেই মা বাবার কাউন্সেলিং, শারীরিক সুস্থতা, নরমাল ডেলিভারীর আধুনিক ল্যাব ও চিকিৎসক সম্মানী বৃদ্ধি, রোগী-রোগীর লোক-চিকিৎসকের মানসিকতায় পরিবর্তন জরুরী। সবার আগে দরকার সর্বক্ষেত্রে হেলথ ইনসুরেন্স! আর দরকার আপনাদের মত বিদেশপ্রেমিক লোকের সংখা আরেকটু কমিয়ে আনা!

সবশেষে দুটো কথা দিয়ে শেষ করছি MDG / SDG কিন্তু বাংলাদেশের কসাই চিকিৎসকদের জন্যই অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। আমাদের মাননীয় প্রধান মন্ত্রী স্বাস্থ্যখাতে পুরষ্কারও পেয়েছেন এই কসাইদের জন্যই। এমনকি আপনাদের পছন্দের চিকিৎসা বানিজ্য রাষ্ট্র ভারতের থেকে WHO র‌্যাংকিং- এ বাংলাদেশের চিকিৎসার মান উপরে। এই বাংলাদেশের ডাক্তাররাই কিন্তু সসম্মানে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন অস্ট্রেলীয়া, কানাডা সহ মিডেল ইষ্টের দেশগুলোতে।

হেলথ সিস্টেমের একটা পার্ট হচ্ছেন চিকিৎসকরা।অবশ্যই বাংলাদেশের আর সব সেক্টরের মতো চিকিৎসা সেক্টরেও দুর্নীতির বাতাস লেগেছে, অস্বীকার করার উপায় নেই।কিন্তু সেখানে কতখানি চিকিৎসক আর কতখানি সিস্টেম জটিলতা দায়ী তা রীতিমতো গবেষণার বিষয় বৈকি।

প্লিজ নিজ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং চিকিৎসকদের নিয়ে ভুল তথ্যে বিভ্রান্তি ছড়াবেন না।দেশটা আপনার, আমার----আমাদের সবার; স্বার্থন্বেষী দালালদের নয়।

জানি না কিছু বোঝাতে পারলাম কিনা।

আমি Gynecologist নই পাবলিক হেলথ নিয়ে কাজ করছি। এখনও সামান্য জুনিয়র ডাক্তার।

কাজের সুবাদে জেনেছি যে অপরিসীম সীমাবদ্ধতা, চিন্তার অতীত প্রতিকূলতার মধ্যে আমাদের সার্জনরা কাজ করেন তাদেরকে কুর্নিশ না করে উপায় নেই--- দ্য রিয়েল হিরো।

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ




জুতা নিয়ে যত কথা

জুতা নিয়ে যত কথা

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ২০:০২



ন্যাসভ্যাক নামা

ন্যাসভ্যাক নামা

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১০:৫৮









হঠাৎ করে শিশু কেন মোটা হচ্ছে?

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৬:৪২






শিশুর নিউমোনিয়া, যা জানা প্রয়োজন

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৯:০৫



















মেডিকেলীয় অফলাইন

১৯ অগাস্ট, ২০১৭ ১৫:১২



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর