ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১ ঘন্টা আগে
ডা. ফাহিম উদ্দিন

ডা. ফাহিম উদ্দিন

ইন্টার্ন চিকিৎসক

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।


২৩ অগাস্ট, ২০১৭ ০৯:৫১

বাংলাদেশী চিকিৎসকের হেপাটাইটিস-বি’র নতুন ওষুধ আবিষ্কার

বাংলাদেশী চিকিৎসকের হেপাটাইটিস-বি’র নতুন ওষুধ আবিষ্কার

হেপাটাইটিস-বি চিকিৎসায় এ যাবত কাল দুই ধরনের ড্রাগ ব্যবহৃত হয়ে আসছিল: 

১. এন্টিভাইরাল ড্রাগ, যেটা সরাসরি ভাইরাস কে মেরে ফেলে। এটার সমস্যা হল দীর্ঘদিন সেবন করতে হয়, প্রায় ৮/৯ বছর। আর দীর্ঘদিন সেবনে অনেক ক্ষেত্রে রেজিস্ট্যান্স ডেভেলপ করে।
২. ইন্টারফেরন ইনজেকশন, যা নন-স্পেসিফিক ভাবে শরিরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। ৪৮ সপ্তাহের ডোজ, কিন্তু দাম অনেক বেশি প্রায় ৬ লক্ষ টাকা। 

আর অন্যদািকে "ন্যাসভ্যাক" স্পেসিফিক ভাবে শুধুমাত্র হেপাটাইটিস বি ভাইরাসের বিরুদ্ধে শরিরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, যার দামও তুলনামূলক ভাবে অনেক কম হবে এবং ইন্টাফেরনের চেয়েও বেশি ইফেক্টিভ।
এটা মূলত ইমিউন থেরাপি যা আমাদের শরিরের "ডেনড্রাইটিক সেল" স্টিমুলেট করার মধ্য দিয়ে শরিরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে। এই ড্রাগ ভাইরাস কে মারবে না কিন্তু ভাইরাস কে ইনএক্টিভ করে রাখবে। এমনকি ড্রাগ বন্ধ করা অবস্থায়ও। 

প্রাথমিক পর্যায়ে "ন্যাসভ্যাক" ছিল একটা কনসেপ্ট। এই কনসেপ্ট টা নিয়ে ২৯ বছর ধরে গবেষণা করে যাচ্ছেন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জাপানী চিকিৎসা বিজ্ঞানী প্রফেসর ডা. ফজলে আকবর স্যার, যিনি কিনা রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করে জাপানে পাড়ি জমান এবং সেখানেই থেকে যান, তবে মাতৃভূমির টানে মাঝে মাঝে দেশে আসেন। উনার মাথায় প্রথম চিন্তা আসে যে, আমাদের পরিবেশে অনেক জীবাণু আসে। আর এসব জীবাণুর সংস্পর্শে গেলেও সবার কিন্তু রোগ হচ্ছে না। যাদের রোগ হচ্ছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তুলনামূলক ভাবে কম। সুতরাং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যদি বাড়ানো যায় তবে তাদেরকে ভালো রাখা সম্ভব। এই কনসেপ্ট থেকেই মূলত ন্যাসভ্যাক এর অগ্রযাত্রা।

উনার একটা ল্যাব আছে জাপানে। উনার ল্যাবে উনি এই ন্যাসভ্যাক এর ট্রায়াল দেয়ার জন্য একটি এনিম্যাল মডেল (মাউস) ও তৈরি (ক্লোন) করেন, যার উপর প্রথম ট্রায়াল দেয়া হয়। আর এই ঔষধ আবিষ্কার করে কেনিয়ার একটি সরকারী সংস্থার (বায়োটেকনোলজি এন্ড জেনেটিক ইন্জিনিয়ারিং) সহায়তায়। কিন্তু তখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল দেয়া হয়নি এবং ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল গুলোতেও সেভাবে তথ্য-উপাত্ত উত্থাপন করা হয়নি। এরই মধ্যে BSMMU এর হেপাটলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নিল) স্যারের "হেপাটাইটিস বি" এর উপর লিখা একটা পেপার হংকং এ হেপাটলজির একটা মিটিং এ প্রেজেন্টসনের জন্য এক্সেপ্ট হয়। সেখানে গিয়ে কেনিয়ার একজন লোকের সাথে পরিচয় হয় যে কিনা প্রফেসর ডা. ফজলে আকবর স্যারকে চেনেন এবং ন্যাসভ্যাক এর সাথে জড়িত। পরবর্তিতে তার মাধ্যমেই প্রফেসর ডা. ফজলে আকবর স্যারের সাথে ডা. মাহতাব স্যারের পরিচয়।

পরবর্তিতে প্রফেসর ডা. ফজলে আকবর স্যার বাংলাদেশে এসে যখন হেপাটাইটিস বি এর উপর ডা. মাহতাব স্যারের সংগ্রিহীত তথ্য-উপাত্ত গুলো দেখলেন, তখন তিনি এর খুব প্রশংসা করলেন এবং দুজনের এই তথ্য-উপাত্তের উপর ভিত্তি 
করে হেপাটলজির কিছু জার্নাল আর পাবলিকেশনে উনাদের কনসেপ্ট ও রিসার্চ ওয়ার্ক টা তুলে ধরলেন।যেগুলো ইন্টারন্যাশনাল রিকগনিশনের জন্য খুব দরকার ছিল।এরপর কেনিয়ার ঐ সরকারী সংস্থার সহযোগীতায় জাপান এবং বাংলাদেশে ইথিকাল পারমিশন নিয়েই সফল ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল চালানো হয়।

অলরেডি কেনিয়া সহ তিনটা রাষ্ট্রে এই ড্রাগ রেজিস্টার্ড হয়ে গেছে, সে দেশের ডাক্তাররা এখন এই ড্রাগ প্রেসক্রাইব করতে পারবেন। আগামী বছরের মধ্য হয়ত চীন এবং রাশিয়া তে রেজিস্টার্ড হয়ে যাবে। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে একটা নিয়ম হল, উন্নত বিশ্বে (আমেরিকা, অস্ট্রেলীয়া, কানাড, ইংল্যন্ড ইত্যাদি) অনুমোদিত হয়ে আসলে অনুমোদন পাওয়া যাবে, তাই একটু ওয়েট করা লাগতে পারে। তবে কর্তৃপক্ষ কে কনভিন্স করা সম্ভব হলে হয়ত দু-এক বছরের মাঝে বাংলাদেশের মার্কেটে এভেইলেভল হবে, অলরেডি বিকন ফার্মা এই ড্রাগ তৈরির জন্য অনুমিত চেয়ে আবেদন করে রেখেছে। তখন এটা বাংলাদেশের জন্য অনেক বড় অর্জন। কারন এখন পর্যন্ত উপাদেশের আর কোনো রাষ্ট্র নিজেদের দেশে ক্লিনিকাল ট্রায়াল চালানো কোনো ড্রাগ ব্যবহার করতে পারেনি! 

বি:দ্র: প্রফেসর ডা. ফজলে আকবর স্যারের সমসাময়িক সময়ে স্টেইনম্যান নামের একজন আমেরিকান বিজ্ঞানীও "ডেনড্রাইটিক সেল" নিয়ে কাজ করেন এবং সম্ভবত ২০১২ সালে চিকিৎসা বিজ্ঞানে মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। নোবেল পুরষ্কারের ইতিহাসে তিনিই প্রথম যিনি মরণোত্তর নোবেল পেয়েছেন। কারন নোবেল পুরষ্কারের নাম ঘোষণার মাত্র একদিন আগে উনি মৃত্যুবরণ করেন। উনি মারা যান অগ্নাশয়ের ক্যান্সারে। উনার ক্যান্সার ধরা পড়ার পর বলা হয়, আর মাত্র চার মাস বাঁচবেন উনি। পরে নিজের আবিষ্কৃত "ডেনড্রাইটিক সেল" থিওরী নিজের উপর প্রয়োগ করে আরো চার বছর বেঁচে ছিলেন তিনি। পরবর্তিতে নোবেল কমিটি জানায়, উনার মৃত্যুর সংবাদটা আগে জানতে পারলে তাকে উনারা নোবেল দিতেন না (মরণোত্তর দেয়ার কোনো নিয়ম নেই)। 

তবে প্রফেসর ডা. ফজলে আকবর স্যার যদি বাংলাদেশী না হয়ে আমেরিকান/ইংল্যান্ডের হতেন, তবে হয়ত সেরকম সাপোর্টের কারনে নোবেল পুরষ্কার টা উনার ভাগ্যেই জুটতো! বর্তমানে এই "ডেনড্রাইটিক সেল" এর থিওরী কাজে লাগিয়ে লিভার সিরোসিস এবং কিছু ক্যান্সারের ঔষধ আবিষ্কারের চেষ্টা চলছে। অচিরেই হয়ত চিকিৎসা শাস্ত্রে আরো নতুন কিছু আসতে যাচ্ছে বাংলাদেশী এই চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের হাত ধরেই।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত