ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


০২ অগাস্ট, ২০১৭ ০১:৩৮ পিএম

প্রেশার মাপা শিখে ডাক্তার হওয়া এবং পরবর্তীতে ডাক্তারদের 'বস' হওয়া!

প্রেশার মাপা শিখে ডাক্তার হওয়া এবং পরবর্তীতে ডাক্তারদের 'বস' হওয়া!

পঞ্চম বা এসএসসি পাস কাউকে কি আপনি বিএ পাস বলবেন? যদি বলেন , সেটা কি অন্যায় নয়?

কেউ যখন পুরো আল কুরআন মুখস্ত করেন, তখন তাকে বলা হয় হাফেযে কুরআন। উল্টা দিক থেকে বললে বলা যায়, হাফেযে কুরআন শুধু সেই ব্যক্তিকে বলা হয় যিনি পুরো কুরআন মুখস্ত করেছেন। যিনি শুধু বানান করে করে কুরআন পড়তে পারেন , তাকে যদি আপনি হাফেযে কুরআন বলেন, তাহলে সেটা কি অন্যায় নয়? সেটা কি হাফেযদেরকে অবমাননা করা নয়?
তেমনি দাওরায়ে হাদিছ পাস করলে তাকে মাওলানা বা শায়েখ বলা হয়। অন্যভাবে বলতে গেলে , মাওলানা শব্দটা শুধু তাদের জন্যই প্রযোজ্য যারা দাওরায়ে হাদিছ পাস করেছেন। যিনি মাদরাসাতে অষ্টম শ্রেনী বা দশম শ্রেনী পাস করেছেন , তাকে মাওলানা বললে মাওলানাদেরকে অপমান করা হয় এবং এভাবে জমিনে ফিৎনা ফ্যাসাদ ছড়ানো হয়।

যে কেউ যদি নিজেকে মাওলানা বা হাফেয বলে দাবি করে , তাহলে এই শব্দগুলোর আর আলাদা পরিচয় থাকে না।

যারা আইন বিষয়ে লেখাপড়া করে এলএলবি পাস করেন এবং ইন্টার্নী শেষ করেন , তখন তাদেরকে বলা হয় এডভোকেট। অন্য ভাষায় বলা যায়, এডভোকেট শব্দটা শুধু তাদের জন্যই প্রযোজ্য যারা আইন বিষয়ে লেখাপড়া করে এলএলবি পাস করেন এবং ইন্টার্নী শেষ করেন। সেক্ষেত্রে এসএসসি বা এইচএসসি পাস কেউ নিজেকে এডভোকেট দাবি করলে, এডভোকেটদেরকে অপমান করা হয় এবং ফিৎনা ফ্যাসাদ ছড়ায়।
আদালতের পেশকার বা নাজিরকে কেউ বিচারক বলে না। পেশকার বা নাজির কখনো সমাজে নিজেকে বিচারক বলে দাবি করে না। 
মোবাইল শো রুমের বিক্রেতা কখনো নিজেকে ইঞ্জিনিয়ার বলে দাবি করে না।

তেমনি ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রেতাও ডাক্তার নয়। ফার্মেসিব্যবসায়ি যদি নিজেকে ডাক্তার বলে দাবি করেন, তাহলে সেটাও হয় ফিৎনা ফ্যাসাদ। সেটা হয় অরাজকতা। ডাক্তার শব্দটা শুধু তাদের জন্যই প্রযোজ্য , যারা এইচএসসি পাস করার পর ৫ বছর মেডিক্যালে বা 
ডেন্টাল কলেজে লেখাপড়া করে পাস করেন এবং এক বছর ইন্টার্নী সমাপ্ত করেন। সেক্ষেত্রে ফার্মেসিব্যবসায়ি নিজেকে ডাক্তার বলে দাবি করলে সেটা হয় ফ্যাসিবাদি কর্মকান্ড।
প্রেশার মাপতে শিখলেই বা অন্য কোনো উপায়ে বা বিকল্প কোনো পথে ডাক্তার হওয়া যায় না।

যে শ্রমিক একদিন পরিশ্রম করেছে তার বেতন আর যে শ্রমিক এক হাজার দিন পরিশ্রম করেছে তার বেতন এক নয়। তেমনি ফার্মেসিব্যবসায়ি আর ডাক্তার এক নয়।

দেখা যায় ফেসবুকে ফার্মেসিব্যবসায়িদের প্রায় সবাই নামের আগে ডাক্তার লিখে রেখেছে। আর ডাক্তারদের প্রায় সবাই এটা লেখা থেকে বিরত থেকেছেন। এক্ষেত্রে কেউ কেউ ঠাট্টা করে বলেন, ডাক্তারেরা বিনা ভিজিট ফিতে ডাক্তারি করা থেকে বাঁচার জন্য নামের আগে ডাক্তার লেখা থেকে বিরত থাকেন। বাস্তবতা হচ্ছে বিনা ভিজিট ফিতে যত রোগীকে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছি , তারা প্রায় সবাই আমাকে অপমানিত করেছে। কথা ও কাজের মাধ্যমে আমাকে ছোট এবং গুরুত্বহীন ডাক্তার হিসেবে তুলে ধরেছে। এতে করে আমি ব্যক্তিগতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি।

আমি ফেসবুকে নামের আগে ডাক্তার লেখি না , কেননা এটা লেখলে আমি ফেসবুকে ফার্মেসিব্যবসায়ির সমান হয়ে যাই। যা মেনে নেয়া যায় না। তাছাড়া ফেসবুকে আমার বন্ধুমহল ভালো করেই জানে আমার পেশাগত পরিচয় কী। সে কারনে ইনবক্সে অনেকেই অনেক সময় স্বাস্থ্য বিষয়ক অনেক কিছু জানতে চান, কেউ কেউ সংক্ষেপে বা প্রাথমিকভাবে চিকিৎসা নিতে চান। ব্যস্ততার ফাঁকে যতদূর সম্ভব উত্তর দিতে চেষ্টা করি।

যার তাকওয়া আছে , তাকে বলা হয় মুত্তাকী। মুত্তাকীর থাকে বিবেক এবং প্রয়োজনীয় যথাযথ সর্বনিম্ন জ্ঞান। তিনি সহজেই বুঝতে পারেন কোনটা ন্যায় আর কোনটা অন্যায়। একজন মুত্তাকী কখনোই ফার্মেসিব্যবসায়ি হয়ে নিজেকে ডাক্তার বলে প্রচার করতে পারেন না। কারন তিনি জানেন, একজন ফার্মেসিব্যবসায়িকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে এনে একজন এমবিবিএস ডাক্তারের চেয়ারে বসিয়ে দিলে কি অবস্থা হবে! তাছাড়া তিনি জানেন আল কুরআনের আয়াত, "বলুন, যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে? বুদ্ধিমান লোকেরাই নসিহত গ্রহণ করে থাকে" (৩৯-জুমার; ৯)।

তাছাড়া ফার্মেসিব্যবসায়ি থেকে পরবর্তিতে ডাক্তারদের 'বস' হওয়াটাও একজন মুমিন, মুসলিমের জন্য অকল্পনীয়। কারন ব্যবসার জগৎ আর জ্ঞানের জগৎ সম্পূর্ন ভিন্ন জিনিস।

কেউ যদি সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে চান , তাহলে তার দ্বারা প্রেশার মাপা শিখে ডাক্তার হওয়া এবং এভাবে কোনো এক সময় ডাক্তারদের 'বস' হওয়ার চিন্তা অকল্পনীয়।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত