আজমল গনি আরজু

আজমল গনি আরজু

অধ্যক্ষ, কুষ্টিয়া সিটি কলেজ, কুষ্টিয়া। 


৩০ জুলাই, ২০১৭ ১১:৫৭ এএম

অধ্যাপক ডা. মনসুর হাবীব : স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে চিনলাম যাকে

অধ্যাপক ডা. মনসুর হাবীব : স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে চিনলাম যাকে

আজ আপনাদের একটি গল্প শুনাবো। প্রতিদিনের পরিচিত হতাশার গল্পের ভিড়ে আপনাদের কাছে হয়তো একটু অন্যরকম মনে হতে পারে। এ গল্পের নায়ক একজন ডাক্তার, ডা: মনসুর হাবীব, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, নিউরো মেডিসিন বিভাগ, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। রোগী দেখেন ল্যাব এইডে।

গিন্নীর অসুস্থতার কারনে তার কাছে যাওয়া। মাঝে হঠাৎ করেই গিন্নী কোন আগাম বার্তা না দিয়েই পরপর ২দিন সেন্সলেস হয়ে পড়ে। তাৎক্ষনিক ভাবেই স্থানীয় ডাক্তারদের দিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা শুরু করি। তাঁরা কিছুই ধরতে পারলেন না। অনেকেই এম.আর. আই বা সিটি স্ক্যানের পরামর্শ দিলেন। ভাগ্নে ডা. মোসাদ্দেক রেজা রিপন পরামর্শ দিলো ঢাকাতে গিয়ে ডা. মনসুর হাবিবকে দেখাতে।

ল্যাব এইডে গিয়ে দেখি ১ সপ্তাহের আগে সিরিয়াল পাওয়া সম্ভব নয়। নিজের পরিচয় কাজে লাগিয়ে বহু কষ্টে পরদিন রাত ৯.০০ টায় সিরিয়াল পেলাম। এম.আর.আই, সিটি স্ক্যানসহ বড়মাপের পরীক্ষা নিরীক্ষা করার প্রস্তুতি নিয়েই ডাক্তারের চেম্বারে ধুকলাম। কিন্তু ডাক্তারের চেম্বারে ঢুকে অবাক হয়ে দেখলাম তাকে সহযোগীতা করার মতো কোন সহকারী নেই। যেখানে একটু নাম ডাক হয়ে যাওয়া অনেক সহকারী/ সহযোগী অধ্যাপকদের চেম্বারে প্রেশার মাপা থেকে থার্মোমিটার দেয়া, প্রেশক্রিপশন লেখার কাজে একগাদা জুনিয়র ডাক্তার বসে থাকেন,, আর রোগীদের নানা প্রশ্নের জবাব দেন। সিনিয়র শুধু জুনিয়রকে চিকিৎসা নির্দেশ ছাড়া কিছুই বলেন না। এমন কি রোগীদের কোন প্রশ্নের ও জবাব দিতে বিরক্ত বোধ করেন। সেখানে এমন মাপের একজন ডাক্তারকে একা পাবো চিন্তায় করতে পারি নাই।

যাহোক চেম্বারে ঢুকতেই তিনি মিষ্টি হাসী দিয়ে রোগের বিষয় জানতে চাইলেন। আমি সব কিছু খুলে বলে বললাম, স্যার খুব টেনশনে আছি। তিনি আবার সেই ভূবন ভুলানো হাসি দিয়ে রসিকতার সুরে বললেন, স্ত্রীর সেন্সলেস হওয়ায় স্বামী যদি টেনশনে না পরেন তাহলে বুঝতে হবে এর পিছে অন্য বিষয় আছে। ওনার বলার ভংগিতে আমরা দুজনেই হাসতে শুরু করি এবং মনে হলো সঠিক জায়গায় এসেছি। এরপর তিনি নিজ হাতে প্রেশার মেপে বললেন, আসলে এটি একটি নার্ভের অসুখ এবং এই রোগে হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে যেয়ে হাত পা ভাংগা ছাড়া কোন বড় ধরনের ঝুঁকি নেই।

তিনি বললেন, আমাকে দিয়ে ওনার চিকিৎসা করালে দুটো শর্ত মানতে হবে 

(১) টানা ৬ মাস ঔষধ খেতে হবে। ১দিনও বাদ দেয়া যাবে না

(২) ঠিক ১মাস পর আবার দেখাতে হবে। দেখাতে ২/১ দিন দেরী হলেও ঔষধ বন্ধ করা যাবে না।

উনার শর্তে রাজী হলে তিনি মাত্র ৪টি ঔষধ লিখে বললেন, আর কোন প্রশ্ন থাকলে করতে পারেন। আমি বললাম এম.আর. আই বা কোন ধরনের পরীক্ষা লাগবে কি? উনি বললেন, এ জাতীয় রোগে কোন টেস্টেই পজিটিভ কিছু আসবে না, কাজেই কোন টেস্ট করে পয়সা খরচ ছাড়া কোন লাভ নেই। আমি শুনে হতভম্ব, কারণ আমাদের দেশে একটি দামী প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে বসা একজন ডাক্তারের কাছ থেকে এরূপ জবাব আমার ধারনার বাইরে। এবার তাঁকে কতো ফি দিবো জানতে চাইলে তিনি বললেন বাইরে সহকারীকে দিতে। সহকারী জানালেন ফি ১০০০/টাকা। আমি আবারো অবাক হলাম কারণ কয়েকদিন আগে আমার শ্বশুর সাহেবকে কুষ্টিয়া মেডিকেলের একজন নিউরোর সহকারী অধ্যাপক দিয়ে চিকিৎসা করে ফি দিয়েছি ৮০০/ টাকা।

আমার শুধু একটা কথায় মনে হয়েছে, মনসুর হাবিবের মতো আরো কিছু ডাক্তার যদি এদেশে তৈরী হতো, তাহলে এদেশের বহু অসহায় রোগী সঠিক চিকিৎসা টুকু পেতো। আর আমাদের মতো দরিদ্র দেশের একটা বড় অংকের টাকা চিকিৎসার জন্য অন্তত পার্শ্ববর্তী দেশে খরচ হতো না। ধন্যবাদ শ্রদ্ধেয় মনসুর হাবিব স্যার, আপনি দীর্ঘজীবী হোন। I salute you.

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত