২৯ জুলাই, ২০১৭ ১১:৩৯ পিএম

চিকুনগুনিয়া! আহ একি যন্ত্রণা!!

চিকুনগুনিয়া! আহ একি যন্ত্রণা!!

হঠাৎ করে হাঁটুতে ব্যথা, কনুইয়ে ব্যথা, হাতের কব্জিতে ব্যথা, এটা কোনো সাধারণ ব্যথা নয়। অসহ্য ব্যথা। হাঁটতে পারি না। বসে থাকতে পারি না, শুয়ে থাকতে পারি না। এরই মাঝে জ্বর আসে। প্রচণ্ড রকমের জ্বর। জ্বরের তাপমাত্রা একশ চার ডিগ্রি। শারীরিক অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। বাসাতে থাকাটা আর সম্ভব হচ্ছে না। তখন বউ-ছেলেকে বলি, আমাকে একটা হাসপাতালে নিয়ে যাও। ছেলে একটা সিএনজি ডেকে আনে। দুইজনে ধরাধরি করে আমাকে সিএনজিতে তোলে। তারপর আর কিছুই বলতে পারব না। যখন জ্ঞান ফিরে, তখন পরের দিন সকাল। আনুমানিক দশটা বাজে। আমি হাসপাতালের বেডে শুয়ে আছি। যা আমার সবচেয়ে অপছন্দের জায়গা। হাতে সেলাইন চলছে। আত্মীয়-স্বজন অনেকেই দাঁড়িয়ে আছে।

সন্ধ্যার দিকে ডাক্তার এলে তাকে আমি বিনীত স্বরে বললাম, স্যার হাসপাতালে থাকতে আমার একটুও ভালো লাগছে না। আমাকে রিলিজের ব্যবস্থা করে দিন।

ডাক্তার সাহেব বেশ রশিক মানুষ, তিনি মুখে একটু হাসি টেনে বললেন, আপনি এখুনি চলে যেতে পারেন। হাসপাতালে দিনের পর দিন পড়ে থাকার রোগ আপনার হয়নি। বাসায় থাকবেন, তিন বেলা তিনটা প্যারাসিটামল খাবেন, আর রীতিমতো ব্যায়াম করবেন।

হাসপাতাল থেকে বাসায় গেলাম। টানা বারোটা দিন বাসায় কাটালাম। তখন কী পরিমাণ যন্ত্রণা সইতে হয়েছে, তা লিখে কাউকে জানাতে পারব না।

যেটুকু জানি, এটি এখন আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে নেই। ঢাকা শহরের যে কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা সবাই বলেছে, এটা মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। ঠিক কতজন মানুষ আক্রান্ত হলে একটা রোগকে মহামারি বলা যায়, তা আমি জানি না; কিন্তু এটা যে ব্যাপক আকারে ঢাকা শহরে ছড়িয়ে পড়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। অনেক পরিবারে দেখা যাচ্ছে, তিনজন সদস্যের দুইজনই এই রোগে আক্রান্ত।

এই রোগটিতে দেখতে দেখতে তাপমাত্রা বেড়ে যায়। সেইসঙ্গে সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ খেয়ে, শরীরের ব্যথা ও জ্বর কমানোর চেষ্টা করা হয়। এবং সর্বোচ্চ পরিমাণ ওষুধ খেয়েও যখন জ্বর কমানো যায় না, তখন জীবনের ওপর বিতৃষ্ণা ভাব চলে আসে। কারণ মানুষের ধৈর্যেরও একটা সীমা আছে। ভোগান্তিরও একটা শেষ আছে। অনেক ভোগান্তির পর জ্বর যখন কমে আসতে দেখা যায়, তখন মুখে রুচি বলতে কিছু থাকে না। খেতে হবে, সেই কারণে জোর করে কিছু খেলে, তাতে কোনো লাভ হয় না। হড়হড় করে বমি হয়ে যায়।

চিকুনগুনিয়া রোগটি ছড়ায় এডিস মশা। এরা একটু পানি ও এক সপ্তাহ সময় পেলেই বংশ বৃদ্ধি করে ফেলে। আমাদের ঢাকা শহরে পানির কোনো অভাব নেই। সেই পানিকে এখানে সেখানে জমতে দিলেই সমস্যা। আমরা চোখ মেলে এখানে সেখানে তাকালেই দেখব প্লাস্টিকের বোতল, ভাঙা জিনিসপত্র, পুরোনো টায়ার, ফুলের টব, মাটিতে গর্ত। কাজেই মশাগুলো মহানন্দে বংশ বৃদ্ধি করে এবং সেই মশার সংখ্যার সঙ্গে সঙ্গে চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ে ও কমে। সুতরাং আমাদের প্রথমে মশার বংশ বৃদ্ধি, এই পথটুকু বন্ধ করতে হবে। সবাই যদি নিজের বাসার চারপাশে মশার বংশ বৃদ্ধির পথটুকু বন্ধ করতে পারি তাহলে অনেক ভালো একটি কাজ হবে। এ ব্যাপারে সবাইকে সচেতন হতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে যে, সচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

প্রথম যখন পত্রপত্রিকায় চিকুনগুনিয়া শব্দটি দেখেছে, কেউ কেউ তামাশা করেছে, কেউ কোনো গুরুত্বই দিচ্ছে না, কেউ হেসে উড়িয়ে দিচ্ছে; কিন্তু এখনতো পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি হচ্ছে। এমনকি এটি এখন টেলিভিশনের টকশোর একটি জনপ্রিয় বিষয়।

যারা স্বদম্ভে বলেছিল, ঢাকা শহরের বাইরে চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত রোগী একজনও নেই। তাদের কথা আজ ভিত্তিহীন হয়ে গেল। ঢাকার বাইরে আরো সাত জেলায় চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে মানুষ। এই তথ্য পাওয়া গেছে স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। জেলাগুলো হলো- নরসিংদী, গোপালগঞ্জ, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নেত্রকোনা ও জয়পুরহাট। এরই মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী পাওয়া গেছে নরসিংদীতে।

তবে যারা এ রোগে ভুগেছে, তারা এর যন্ত্রণাটুকু একেবারে আক্ষরিকভাবে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে। নিশ্চয় নিয়ম আছে। আমি আশা করে আছি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সিটি করপোরেশন মিলে এই যন্ত্রণার মূল উত্পাটন করবে।

লেখক : ফজলে আহমেদ

গবেষক

সূত্র: ইত্তেফাক

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত