শনিবার ২৩, সেপ্টেম্বর ২০১৭ - ৮, আশ্বিন, ১৪২৪ - হিজরী



ডা. ফাতেমা তুজ জোহরা

শিক্ষার্থী, বিএসএমএমইউ


যারা নিউক্লিয়ার মেডিসিন নিয়ে স্বপ্ন দেখছেন

পোস্ট গ্রাড কোর্সে ঢুকার পর আমি সর্বপ্রথম যে জিনিসটা উপলব্ধি করলাম সেটা হল দৈন্য। এই দৈন্য আমার চিন্তার, এই দৈন্য আমার কল্পনার। 

MBBS শেষ করে আলট্রাসনোগ্রাফির উপর ১বছরের কোর্স শেষ করলাম। প্রথম ধাক্কাটা আসলে তখনই খেয়েছিলাম।

আমি সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি, আলট্রাসনোগ্রাফি এমন একটা সাবজেক্ট যেটাতে আমি প্রোব রোগির শরীরে ধরব আর মনিটরে সব অর্গানের ছবি ফকফকা হয়ে উঠবে। আর হাই রেজুলেশেনার মেশিন হলে তো কথাই নাই। DSLR ক্যামেরার মত সবকিছু কেবল হাতের ছোয়াতেই ধবধবা লাগবে।

অত:পর যেদিন প্রথম আল্ট্রাসনোগ্রাফির প্রোব হাতে নিলাম, সেদিন টের পেলাম কত ধানে কত চাল। কিছুতেই কোন ইমেজ আমি আনতে পারলাম না। ধাক্কাটা তখনি শুরু হল।

আলট্রাসনোগ্রফির সাদা-কালো ছবির মাঝে শরীরের সব অর্গান সুন্দরভাবে ইমেজিং করাটা যে বিশাল এক স্কিল এবং টেকনিকের ব্যাপার সেটার ব্যাপারে আমার ধারণাই ছিলনা। তারপর ছিল রোগ ডায়াগনোসিস করা। একজন ভাল সনোলোজিস্ট হতে হলে সর্বপ্রথম যেটাতে পারদর্শী হতে হবে সেটা হল ভাল ক্লিনিশিয়ান হওয়া। দেখার মত চোখ গড়তে না পারলে চারপাশে হাজার মনি মুক্তা থাকলেও কোন কিছুই দেখা সম্ভব হবেনা।

তারপর একবছর কোর্স শেষে আমি উপলব্ধি করলাম, শুধুমাত্র আল্ট্রাসনোগ্রামের জন্য এই এক বছর আসলে যথেষ্ট না। অথচ আমার ধারণা ছিল ৩/৬ মাসই এই কোর্সের জন্য যথেষ্ট। এই এক বছর আমি যেটা চিনতে পেরেছি সেটা হল প্যাশন। একজন স্যার, যার প্যাশন আমাকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে অনেক কিছু। ডিগ্রি নেবার জন্য জ্ঞান অর্জন করা না, যার কাছে শিখেছি কীভাবে অর্জিত জ্ঞানকে লালন করতে হয়, কিভাবে ধারন করতে হয়।

অত:পর যখন নিউক্লিয়ার মেডিসিনে ঢুকার সুযোগ হল, তখন খেলাম ভয়াবহ ধাক্কা। আর নিজের সীমাবদ্ধতা আরো সূক্ষ্মভাবে বুঝতে পারলাম। আর যে দৈন্যতা এতদিন সুপ্তভাবে নিজের মধ্যে লুকায়িত ছিল সেটা নিজের কাছে ইমেজিং করতে পারলাম।

রেডিওলোজীর সাথে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের তফাৎ হল শুধুমাত্র একটা ক্ষেত্রে। কিন্তু সেই ক্ষেত্রটাই মলিকুলার ইমেজিং জগতে এক অবিসংবাদিত ব্যাপার। রেডিওলোজিতে বাইরে থেকে তেজস্ক্রিয় রশ্মি শরীরে প্রবেশ করিয়ে বিভিন্ন অর্গানের ইমেজিং করা হয়। এক্স রে কিংবা সিটি স্ক্যানে এভাবেই ছবি নেওয়া হয়।  আর নিউক্লিয়ার মেডিসিনে সরাসরি তেজস্ক্রিয় পদার্থ শরীরে ইনজেক্ট করা হয়।

কেবলমাত্র এই তফাতটাই মলিকুলার ইমেজিংকে সম্ভাব্য করে তুলেছে।

আচ্ছা, কারো যদি ক্যান্সার হয় আর সেই ক্যান্সার যদি সারা শরীরে ছড়িয়ে যায় তাহলে সেই ছড়িয়ে যাওয়া ক্যান্সারকে কিভাবে স্ক্যানিং করা সম্ভব? কিংবা ধরেন শরীরে কোথাও ক্যান্সার লুকায়িত অবস্থায় আছে যা কোন ইনভেষ্টিগেশানে ধরা পড়ছেনা, সেটাই বা কিভাবে স্ক্যানিং করব?

এই প্রশ্নই হয়তা কিছু ব্যাক্তির রাতের ঘুম হারাম করে দিয়েছিল। যাদের অক্লান্ত চিন্তা আর কল্পনার ফসল হল আজকের নিউক্লিয়ার মেডিসিন। শরীরে অর্গানিক কোন খারাপ পরিবর্তন হবার পূর্বে সর্বপ্রথম বায়োকেমিক্যাল, ফিজিওলোজিক্যাল, ফাংশনাল পরিবর্তনের পর আমাদের বাহ্যিক উপসর্গগুলা ধরা পড়ে। এই যে শারীরিক উপসর্গ দেখার আগেই যদি পরিবর্তনগুলাকে ইমেজিং করা যায় তাহলে সতর্কতা অর্জন আরো সহজ হয়ে যায়।

এই কনসেপ্টের উপর বেইজ করে নিউক্লিয়ার মেডিসিন কাজ করে। কিন্তু এই সামান্য কথার অসামান্য রূপ অনেক।

নিউক্লিয়ার মেডিসিনে তেজষ্ক্রিয়তা নিয়ে সরাসরি কাজ করা হয়। আর আলট্রাসনোগ্রাফিতে কাজ করা হয় শব্দতরংগের গতি প্রকৃতি নিয়ে। যদিও দুটাই রেডিয়েশান কিন্তু আল্ট্রাসনোগ্রাফি তুলনামূলক অনেক বেশি নিরাপদ।

যারা এই অনিরাপদ তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে মলিকুলার লেভেলে ইমেজিং এর কথা চিন্তা করতে পারল তাদের কাছে নিজের চিন্তা ভাবনার দৈন্যতা ফুটে উঠল। 

হুম, নিউক্লিয়ার মেডিসিন আমাদের শরীরের খুব সূক্ষাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনকে ইমেজিং করতে পারে। সেই পরিবর্তনের উপর বেইজ করে ফিউচার চিকিৎসা পদ্ধতিও নিউক্লিয়ার মেডিসিন গাইড করতে পারে।

এটাই শেষ না। শেষেরও শুরু আছে। নিউক্লিয়ার মেডিসিন মলিকুলার লেভেলে ইমেজিং করেই ক্ষান্ত হচ্ছেনা। মেডিকেল চিকিৎসার ফিনিশিং টাচ হল এই নিউক্লিয়ার মেডিসিন। 

থাইরয়েড ক্যান্সার কিংবা গলগন্ড কিংবা হাইপারথাইরয়ডিজম । মেডিসিন, সার্জারির পর ফিনিশিং টাচ দিতে হয় রেডিও আয়োডিন এব্লেশান থেরাপির মাধ্যমে। নিউক্লিয়ার মেডিসিন খুব সন্দর প্লানিং এর মাধ্যমে রোগী বান্ধব পরিবেশে, কম হয়রানিতে এই সেবা বহুবছর ধরেই দিয়ে আসছে।

শুধু এই থেরাপি দিয়েই নিউক্লিয়ার মেডিসিনের কাজ শেষ না। এরপর ক্রমাগত রোগীদের স্ক্যানিং ফলো আপ করে যাচ্ছে যেন ভবিষ্যৎ খারাপ কিছু হবার আগেই ট্রিটমেন্ট করা সম্ভব হয়। এভাবে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের এক অসামান্য সেবাদানের মাধ্যমে মাইলফলক তৈরি করছে।

যারা নিউক্লিয়ার মেডিসিন নিয়ে এরকম স্বপ্ন দেখেছিলেন তাদের স্বপ্নকেও হয়ত ছাড়িয়ে যাবে সামনে যা আসছে। উন্নত বিশ্বে এখন নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেবল স্ক্যানিং নয় বরং কিভাবে চিকিৎসা ব্যবস্থায় আরো অবদান রাখা যায় সেটা নিয়ে গবেষণা করছে। সেই গবেষণা বাস্তবেও প্রতিফলিত হচ্ছে। বাংলাদেশও সেই বাস্তব প্রতিফলন উপভোগ করতে পারবে অচিরেই ইনশা-আল্লাহ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ





নিউক্লিয়ার মেডিসিন ফ্যাক্ট

নিউক্লিয়ার মেডিসিন ফ্যাক্ট

২৭ জুলাই, ২০১৭ ০৫:৫৮


শর্টকাটে বিসিএস...

শর্টকাটে বিসিএস...

২২ জুলাই, ২০১৭ ১২:১৩









হঠাৎ করে শিশু কেন মোটা হচ্ছে?

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ১৬:৪২






শিশুর নিউমোনিয়া, যা জানা প্রয়োজন

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ০৯:০৫



















মেডিকেলীয় অফলাইন

১৯ অগাস্ট, ২০১৭ ১৫:১২



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর