২৬ জুলাই, ২০১৭ ০১:২৫ পিএম

বিষাদগ্রস্ত যাত্রা

বিষাদগ্রস্ত যাত্রা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ফ্যাক্টশিট দেখলে আপনি চমকে যেতে পারেন। তথ্যমতে, সারা বিশ্বের ৩০ কোটির বেশি মানুষ বিষণ্নতা আর হতাশায় ভুগছেন। যাঁরা অনেকেই জানেন না নিজের বিষণ্নতার কথা! যে কারণে প্রতিবছর গড়ে আট লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। যাঁদের গড় বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর।

বিষণ্নতাকে সামাজিকভাবে মন খারাপ কিংবা হালকা রোগ হিসেবেই ভাবা হয়। কিন্তু বিষণ্নতার মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব ব্যাপক বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানীরা। বিষণ্নতার সবচেয়ে চরম দিকটি হচ্ছে আত্মহত্যার দিকে পা বাড়ানো। বিষণ্নতা আর হতাশাকে আত্মহত্যার পেছনে বড় একটি কারণ ভাবা হয়।

৭ জুলাই নিউইয়র্ক টাইমস পত্রিকার এক প্রতিবেদন জানাচ্ছে, বর্তমানে সারা বিশ্বে আত্মহত্যার মাত্রা ২০০৭ সালের তুলনায় বেড়েছে ১৩ শতাংশ, বেড়েছে হতাশা আর বিষণ্নতার মাত্রাও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তীব্র মাত্রার বিস্তৃতি, সামাজিক বৈষম্যের প্রভাব ও ভঙ্গুর মনুষ্যত্বের কারণেই গত শতাব্দীর চেয়ে এই সময়ে আত্মহত্যার হার ৪৯ শতাংশ বেড়েছে বলে ধারণা করছেন পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। সাধারণ মানুষের মতো রুপালি পর্দার জনপ্রিয় তারকারাও বিষণ্নতায় ভোগেন।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানান, তারকারা সাধারণ মানুষের বলয়ের বাইরে থাকেন। নিজেকে তাঁরা একটি গণ্ডির মধ্যে আটকে ফেলেন। একাকিত্ব একসময় তারকাজীবনেও ভর করে। আর তখনই হতাশা-বিষণ্নতা তীব্রভাবে ঘিরে ফেলে। সে সময় তারকাদের নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা দেখা দেয়।

 অনেক ক্ষেত্রে অন্য তারকার হতাশা-বিষণ্নতা আর আত্মহত্যার খবরও কোনো কোনো তারকার মধ্যে হতাশা থেকে আত্মহত্যার প্রবণতা তৈরি করে। এমনটা মনে করেন হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

 

রবিন উইলিয়ামস

হতাশা-বিষণ্নতায় নিজের ক্ষতি করা জনপ্রিয় অভিনেতা রবিন উইলিয়ামস ২০১৪ সালে আত্মহত্যা করেন। হতাশা আর বিষণ্নতাই ছিল তাঁর আত্মহত্যার প্রধান কারণ। কানাডিয়ান মেন্টাল হেলথ অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ৯০ শতাংশ আত্মহত্যার প্রধান কারণই হতাশা ও বিষণ্নতা। যুক্তরাষ্ট্রের গায়ক ক্রিস কর্নেল ও লিংকিন পার্ক ব্যান্ডের গায়ক চেস্টার বেনিংটনের আত্মহত্যারও প্রধান কারণ ছিল হতাশা-বিষণ্নতা। সম্প্রতি বাংলাদেশের ব্যান্ডতারকা মানাম আহমেদের ছেলে মেকানিকস ব্যান্ডের গিটারিস্ট জেহিন আহমেদের আত্মহত্যার কারণ কী? তা অবশ্য জানা যায়নি।

 

ক্রিস কর্নেল

একাকিত্বের যন্ত্রণা নিজের ক্ষতিকে উসকে দেয় নিউইয়র্ক টাইমস-এর তথ্য হিসাবে, আত্মহত্যা করেছেন এমন তারকাদের ৩০ শতাংশই জীবনের শেষ সময়টা প্রচণ্ড একাকিত্বের যন্ত্রণাবোধে কাটিয়েছেন। ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানী ব্র্যাড উইলকক্স ২১ বছর গবেষণা করে জেনেছেন, যেসব তারকার সাধারণ মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ বেশি, তাঁদের মধ্যে নিজের ক্ষতি করার প্রবণতা কম।

 

চেস্টার বেনিংটন

প্রেম, দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ-বিরহে অস্থিরতা তারকাদের ব্যক্তিজীবন নিয়ে গুজব আর দাম্পত্য-পরিবার নিয়ে নানান রং-ঢং মেশানো খবর তাঁদের ওপর প্রচণ্ড মানসিক চাপ তৈরি করে। র‍্যাপ গায়ক এমিনেম প্রথম অ্যালবাম প্রকাশের পরই আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। প্রেমিকার সঙ্গে বিচ্ছেদের চাপ তিনি সহ্য করতে পারেননি। ২০১৩ সালে বলিউডের উঠতি মডেল জিয়া খান প্রেমসংক্রান্ত কলহে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। ২০০৬ সালে পপ গায়িকা ব্রিটনি স্পিয়ার্স দাম্পত্য কলহের কারণে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন।

 

জিয়া খান

জনপ্রিয়তার অতি চাপ ২০০৫ সালে জনপ্রিয় গায়ক মাইকেল জ্যাকসন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। এমনকি তাঁর মৃত্যুর কারণ হিসেবেও অনেক মনোবিজ্ঞানী আত্মহত্যাকে দায়ী করেন। একদিকে জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে আদালতে একের পর এক অভিযোগে মাইকেল সেই সময়টা বেশ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েছিলেন।

আমেরিকান সোশিওল্যাজিকাল রিভিউতে গবেষক স্টিভেন স্ট্যাক লিখেছেন, জনপ্রিয়তার চাপ সহ্য করা বেশ কঠিন। তারকাদের খ্যাতি যখন আকাশে, তখন ২১ শতাংশ তারকা জীবনবোধ হারিয়ে ফেলেন। জীবন থেকে মুক্তির জন্য তাঁরা নিজেকে সবার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার কঠিন পথ বেছে নেন। ব্যাটম্যান সিনেমায় জোকার চরিত্রের অভিনেতা হিথ লেজারের আত্মহত্যার কারণ হিসেবে জনপ্রিয়তাকে দায়ী করা হয়।

মাদকে আত্মসমর্পণ

লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব বায়োলজির অধ্যাপক অ্যালেক্স মেসৌদি সিনেমা ও গানের জগতের তারকাদের জীবনে মাদকের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। মাদকের মাধ্যমে সত্যিকারের দুনিয়া থেকে তারকারা নিজেদের বাঁচানোর চেষ্টা করেন বলে মনে করেন তিনি। তাঁর ভাষ্যে, তারকা হওয়ার বদৌলতে তাঁদের এমন ধরনের মাদক গ্রহণের সুযোগ মেলে, যার অল্প মাত্রার গ্রহণই মৃত্যু ডেকে আনে। সাধারণত ৩০ থেকে ৪২ বছরের তারকারা হতাশা কাটাতে, নিজেকে বাঁচাতে মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েন, যার পরিসমাপ্তি অনেক ক্ষেত্রেই আত্মহত্যা।

কৈশোরের স্মৃতিও উসকে দেয়

ইউরোপিয়ান সাইকিয়াট্রির এপ্রিল ২০১৭ সংখ্যায় ‘সুইসাইড ইন ডিপ্রেসড পেশেন্ট’ শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয়েছে, শৈশবে কিংবা কৈশোরে যাদের নিজের ওপর অভিমান ছিল কিংবা আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল, তাদের বয়স ৩০ হওয়ার পরে সেটি আবারও লক্ষ করা যায়। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ মেনে নিতে পারেননি বলে অভিনয়শিল্পী জনি ডেপ কৈশোরে নিজের হাত কেটে ফেলেছিলেন, যা কিনা পরবর্তীকালেও তাঁর মধ্যে দেখা যায়।

হতাশাকে পেছনে ফেলে এগিয়ে চলা

ব্রিটিশ রাজবধূ প্রিন্সেস ডায়ানা রাজপরিবারের সদস্য হওয়ার পর থেকেই বিষণ্নতায় ভুগছিলেন। রাজপরিবারের বাঁধাধরা নিয়ম আর সামাজিকতা তাঁকে একরকম একঘরে করে ফেলেছিল। একাকিত্বের যন্ত্রণায় তিনি আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন। সেই ডায়ানা পরবর্তীকালে নানা রকম সামাজিক কাজের সঙ্গে যুক্ত হন, যা তাঁর হতাশা কাটাতে সাহায্য করে।

বলিউডের তারকা প্রিয়াঙ্কা চোপড়া তো নিজেই স্বীকার করে বলেছেন, বোকার মতো আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। সে জন্য তাঁর অনুশোচনা হয়। জীবন অনেক সুন্দর মনে হয় তাঁর কাছে। এখন অনেক ভালো আছেন, ভালো কাজ করছেন।

সূত্র: প্রথম আলো

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত