২৪ জুলাই, ২০১৭ ০৬:১৪ পিএম

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করতে হবে

খাদ্য নিরাপত্তার বিষয়টি ভিন্ন আঙ্গিকে চিন্তা করতে হবে

বাংলাদেশ এত কম চাষযোগ্য জমি নিয়ে ১৭০ মিলিয়ন লোককে খাওয়াচ্ছে। এটা বিশ্বের অনেকের কাছেই একটা বিস্ময়। বিশ্বের চাল-গম বিক্রেতাদের বড় আশা ছিল বাংলাদেশের খাদ্যে টানাপড়েন লাগবে, তারা বড় রকমের বাণিজ্য করবে। কিন্তু তাদের সেই আশায় গুড়েবালি। বিস্ময়ে তারা দেখতে লাগল, বছরের পর বছর বাংলাদেশ নিজের উৎপাদিত খাদ্যশস্য থেকেই তাদের লোকজনকে খাওয়াচ্ছে। কালেভদ্রে দুই-তিন লাখ মেট্রিক টন আমদানি করে মাত্র। কিভাবে এটা সম্ভব হলো বা হচ্ছে? এটা তাদের জন্য সত্যিই একটা গবেষণার বিষয়। যে দেশের ছোট শহরের লোকসংখ্যা অন্য দেশের বড় শহরের সমান, সে দেশের গ্রামীণ হাট হয়ে উঠেছে এখন সেমি-আরবান, আউটলুকের সেই দেশ কিভাবে খাদ্য উৎপাদন বাড়াচ্ছে এবং প্রতিবছর যোগ হওয়া আরো ৪০ লাখ লোককে খাওয়াচ্ছে। তারা ভাবছে, বাংলাদেশের বর্ধিত খাদ্য উৎপাদন কি একদিন থেমে যাবে না। আর বাংলাদেশের বর্ধিত জনসংখ্যাও কি একদিন থেমে যাবে! না, তা হবে না। তাদের হিসাবে বাংলাদেশের লোকসংখ্যা আরো অনেককাল শুধু বাড়বেই। খাদ্যের চাহিদা বাড়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আর তাদের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধির কারণে। তাহলে তো বাংলাদেশে খাদ্যের চাহিদা বাড়তেই থাকবে। কিন্তু এদের জমির সরবরাহ বাড়ছে কি? বাড়ছে না, বরং হিসাব মতে ফিবছর ২-২.৫ শতাংশ করে চাষযোগ্য জমি কমছে। তাহলে কী হবে!

জনসংখ্যা বৃদ্ধি যদি আগের মতো চলতে থাকে, আর খাদ্য উৎপাদন পেছনে পড়তে থাকে, তখন তো সেখানে একটি ম্যালথাসীয় (Malthusian) অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। ফল হতে পারে খাদ্যাভাব, দুর্ভিক্ষ, অপুষ্টি ও সামাজিক সংঘাত। তাদের ভাবনা, বাংলাদেশ ওই অবস্থা থেকে কত দূরে। অথবা বাংলাদেশ ভবিষ্যতের কালো ছায়াকে কিভাবে মোকাবেলা করে। যদি বাংলাদেশ আগামী ১০ বছরের অবস্থাকে সফলভাবে মোকাবেলা করতে পারে, তাহলে সেটা হবে বিশ্বের আরেক বিস্ময়। কিন্তু তা পারবে কি? সেটি নির্ভর করছে অনেক কিছুর ওপর। তবে তাদের ভাবনা এবং এ ক্ষেত্রে আমাদেরও ভাবনা হলো, যদি বাংলাদেশের অর্থনীতির বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশের ওপর অব্যাহত থাকে, যেটা আবার নির্ভর করছে অব্যাহত বর্ধিত রপ্তানির ওপর এবং অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতের মাধ্যমে বড় রকমের বিনিয়োগের ওপর। তবে অব্যাহতভাবে রপ্তানি বৃদ্ধি অত সহজ হবে না। কারণ হলো, গ্লোবালাইজেশনের বৈশ্বিক মাত্রা থেমে গেলেও আঞ্চলিকভাবে অর্থনীতিগুলো একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হতে থাকবে। এমনকি অঞ্চল বাদ দিয়ে একটু দূরের অর্থনীতির সঙ্গেও মুক্ত বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ চুক্তি নিয়ে যুক্ত হতে থাকবে। কিন্তু বাংলাদেশের এ ক্ষেত্রে অর্জন প্রায় শূন্য। বিচ্ছিন্ন বাংলাদেশ অর্থনীতি কখনোই অব্যাহতভাবে রপ্তানি বাড়াতে পারবে না। আমাদের দুঃখ হলো, এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেষ্টাও নেই। যেসব দেশ বাংলাদেশের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে চেয়েছিল, বাংলাদেশ তাদের থেকে হাত গুটিয়ে নিয়েছে। আর যারা ইচ্ছুক নয়, তাদের সঙ্গে বাংলাদেশ বসতে যেন আগ্রহী।

বাংলাদেশের বিচ্ছিন্নতা বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধিকে থামিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই বিচ্ছিন্নতার অন্য আরেক খারাপ দিকও আছে, যা বাংলাদেশ বুঝতে ভুল করছে। সেটি হলো—ছোট এক বিচ্ছিন্ন অর্থনীতিতে সুপার রিচ বা অতি ধনীরা অর্থ রাখতে নিরাপদ বোধ করে না। তারা কথিত মূলধন বা অর্থ পাচার করে। বাংলাদেশ কি আইন করে তার সুপার রিচদের অর্থপাচার থামাতে পারবে? পারলে তো অন্য ছোট দেশগুলোও পারত। বৈশ্বিক অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যই হলো, ছোট ও অপেক্ষাকৃত অনিশ্চয়তার অর্থনীতির দেশ থেকে অর্থ স্থিতিশীল ধনী দেশগুলোতে প্রবাহিত হয়। বিশ্বে একটি ধনী অর্থনীতির দেশও পাওয়া যাবে না, যেটি অন্য ধনী অর্থনীতির দেশ থেকে বিচ্ছিন্ন। তারা নিজেদের মধ্যে চুক্তির মাধ্যমে ফ্রি-ট্রেড-ফ্রি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলেছে। এসব অঞ্চলে পণ্য বিনিয়োগ এমনকি মানুষও অবাধে প্রবাহিত হয়। ফলে ওই সব দেশের ধনী নাগরিকরা তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে অতটা চিন্তিত হয় না। অবশ্য বিশ্বের যুদ্ধবাজরা শুধু অর্থপাচার ত্বরান্বিত করার জন্য স্থানীয়ভাবে যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। যুদ্ধ বাধালে তাদের দুটি লাভ; এক. অস্ত্র বেচা যায়, দুই. অর্থপাচার হয়। কিন্তু সেই অর্থের গন্তব্য তাদের দেশেই। যাহোক, বাংলাদেশ আশা করি বুঝবে তার সীমাবদ্ধতাগুলো।

বাংলাদেশে সামাজিক সংঘাত এড়ানো দুরূহ হয়ে পড়বে, যদি খাদ্যে টানাপড়েন দেখা দেয়। ওই অবস্থায় এই দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগও কমে যাবে। তখন আমরা দারিদ্র্য নিয়ে আবার গবেষণা শুরু করে দেব। এ জন্যই বলছি, সময় থাকতে দূরদর্শী ব্যবস্থা নিন। অর্থনীতিটাকে গ্লোবাল অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করুন। লোকজনকে বুঝতে দিন তারা একা নয়, তাদের অর্থনীতি এখন সংযুক্ত। তারা এই দেশে বিনিয়োগ করে পণ্য অন্য দেশে বেচতে পারবে। তাদের কেউ ছোট্ট জায়গায় আটকে রাখতে পারবে না। দক্ষ শ্রমিক-কারিগর হয়ে তারাও এক দেশ থেকে অন্য দেশে সহজে যেতে পারবে।

বাংলাদেশ নিজস্ব উৎপাদন থেকে তার বর্ধিত জনসংখ্যাকে খাওয়াতে পারবে—এটা মনে হয় না। লোকসংখ্যা বৃদ্ধির লাগাম টেনে ধরা একটি নীতি হতে পারে। অন্যদিকে যেহেতু কৃষিজমি কমে যাচ্ছে, সেহেতু ইচ্ছা করলেও বাংলাদেশ আগের মতো বর্ধিত খাদ্য উৎপাদন করতে পারবে না। কৃষি বিপ্লব, গ্রিন বিপ্লব—এসব বোধ হয় আগেই হয়ে গেছে। এখন উৎপাদনে বৈচিত্র্য আনা যেতে পারে, যেটা বাংলাদেশের কৃষকরা এরই মধ্যে নিয়ে এসেছে। কিন্তু জমির স্বল্পতার কারণে সেই বৈচিত্র্যেরও সীমা আছে। আমাদের বাড়িঘরের পরিধি এবং সংখ্যা তো বাড়ছেই। সম্ভব হবে কি লোকজনকে বলা, তোমরা কৃষিজমির ওপর নতুন বাড়ি নির্মাণ কোরো না। বাড়ির সবাই মিলে একটি কয়েক তলার দালান নির্মাণ কোরো এবং সবাই ফ্ল্যাট কিনে বা নির্মাণে অর্থ দিয়ে ওই এক বিল্ডিংয়ে থাকো। সে চিন্তা এখনো কেউ করছে না। জানি না, বাংলাদেশ বাড়িঘরের হরাইজন্টাল বা দিগন্ত প্রসারের হাত থেকে আদৌ রক্ষা পায় কি না।

একটা পর্যায়ে কি বাংলাদেশ নিজ অদূরদর্শিতার কাছে বন্দি হয়ে যাবে। কৃষিতে আধুনিক উপকরণ ব্যবহারেরও একটা সীমা আছে। জমিরও উৎপাদনশীলতার একটা সীমা আছে। অতি ব্যবহার থেকে জমির ওই সীমা তাড়াতাড়ি চলে আসতে পারে। তখন কী হবে! তাই বলব কৃষি নিয়ে সব দিক চিন্তা করতে। আমাদের দুর্ভোগের সুযোগ নিয়ে জেনিটিক্যালি মডিফায়েড অরগানের (GMO) ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশকে নিশানা বানাতে পারে। তাদের প্রেসক্রিপশন হলো GMO গ্রহণ করে আপাতত বাঁচো, ভবিষ্যতে কী হয় পরে দেখা যাবে। কিন্তু GMO ফুড শুধু স্বাস্থ্যের পক্ষেই ক্ষতিকর নয়, এটির আবাদ জমিরও স্থায়ী ক্ষতি করে। GMO ফুড উৎপাদনকারী জমিতে পরে আর স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় অন্য খাদ্যশস্য উৎপাদন হবে না। আমরা GMO গ্রহণ করতে পারি আশু সমস্যা থেকে বাঁচার জন্য; কিন্তু আমরা কি চাইব আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, যারা GMO ফুড খাবে, তারা ফার্মের প্রাণীর মতো বড় হবে। বাংলাদেশের জন্য ভালো বিকল্প হলো, অব্যাহত বর্ধিত রপ্তানির বৈদেশিক মুদ্রা থেকে ঘাটতিজনিত খাদ্যশস্য গ্রহণ করা। জানি, বিদেশের বাজারও ওঠানামা করে। তবে বাংলাদেশের সামনে বিকল্প সামান্যই। অন্তত আমদানির অপশনটা খোলা রাখতে হবে। অর্থনীতি এগোলে, রপ্তানি বাড়লে বিদেশ থেকে প্রতিযোগিতা মূল্যে খাদ্য কিনতে অসুবিধা হবে না। বাংলাদেশের গড়ে ঘাটতি কত হতে পারে?  পাঁচ থেকে ১০ লাখ মেট্রিক টন। এই আমদানি কোনো বিষয়ই নয়, যদি কোষাগারে বৈদেশিক মুদ্রা থাকে। বাংলাদেশ গ্লোবাল অর্থনীতির অংশ হলে বিদেশ থেকে খাদ্য কেনা কোনো নতুন বিষয় হবে না। যা ভাবার বিষয় সেটি হলো—ভবিষ্যতে সব খাদ্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরেই উৎপাদন করা যাবে, সেটি না-ও হতে পারে।

লেখক : আবু আহমেদ

অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: কালের কণ্ঠ

দাবি পেশাজীবী সংগঠনের, রিট পিটিশন দায়ের

‘বেসরকারি মেডিকেলের ৮২ ভাগের বোনাস ও ৬১ ভাগের বেতন হয়নি’

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত