২৪ জুলাই, ২০১৭ ০৩:২১ পিএম

সঠিক চিকিৎসা না হলে চিকুনগুনিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি!

সঠিক চিকিৎসা না হলে চিকুনগুনিয়ায় দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি!

যথেষ্ট পরিমাণ বিশ্রাম, তরল জাতীয় খাবারসহ যথাযথ চিকিৎসা না নিলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তরা। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সঠিক চিকিৎসা না পেলে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের কর্মক্ষমতা হারানোর সম্ভাবনাও থেকে যায়। অন্যদিকে, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের যদি অন্য কোনো রোগ থাকে, তাহলে চিকুনগুনিয়া জ্বর হলে ওই রোগ আরো জটিল আকার ধারণ করে। এ সময় যথাযথ চিকিৎসা না হলে ওই রোগীর মৃত্যুর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না চিকিৎসকরা। তবে কেবল চিকুনগুনিয়া জ্বরে আক্রান্তরা যদি যথাযথ চিকিৎসা নেয় তাহলে ওই জ্বর তিন-চার দিনের মধ্যে ভালো হয়ে যায়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে শরীরের ব্যথাও ধীরে ধীরে উপশম হয় বলে মনে করেন তারা।

এ প্রসঙ্গে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের জ্বর সেরে গেলেও ব্যথা থাকতে পারে দীর্ঘ সময়। আক্রান্তদের অনেকেই দীর্ঘদিনের জন্য স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বেশির ভাগ রোগী দ্রুত আরোগ্য লাভ করলেও অনেকের কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস পর্যন্ত জয়েন্টের ব্যথা থাকে। এতে অবশ্য ভয়ের কিছু নেই। আরো কিছুদিন চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হয়।

ন্যাচারাল মেডিসিন বিষয়ক কনসালট্যান্ট ডা. ফয়জুল হক বলেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের তিন-চার দিনের মধ্যে জ্বর ভালো হয়ে যায়। তবে দীর্ঘমেয়াদে ব্যথা থাকে। এমনকি কর্মক্ষমতা হারানোর ঝুঁকিও থাকে।

তিনি মনে করেন, যথাযথ চিকিৎসা না নিলে জ্বর ভালো হয়ে যাওয়ার পরেও দীর্ঘমেয়াদে ব্যথা থেকে যায় এবং এক পর্যায়ে কর্মক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

তিনি বলেন, অনেক পরিমাণে বিশ্রাম, তরল খাবার এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চললে দেরি হলেও শরীরের ব্যথা ভালো হয়ে যাওয়ার কথা। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা না নিলেই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের শরীরে জটিলতা দেখা দিতে পারে।
চিকুনগুনিয়ার মৃত্যুর সম্ভাবনা কেমন জানতে চাইলে ডা. ফয়জুল হক বলেন, চিকুনগুনিয়া একটি ‘ভাইরাল ফিবার’। তাই যারা শুধু চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত, তারা এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই তা ভালো হয়ে যায়। সঠিক চিকিৎসায় শরীরের ব্যথাও কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কমে যাওয়ার কথা।

তিনি বলেন, অন্য কোনো অসুখ থাকলে চিকুনগুনিয়ায় সেই রোগকে আরো জটিল করে দিতে পারে। এ জন্য সঠিক চিকিৎসা নিতে হবে। তা না হলে সেই ক্ষেত্রে মৃত্যুর ঝুঁকি থাকতে পারে।

এ প্রসঙ্গে তিনি কয়েক দিন আগে মোহাম্মদ রাতিন নামের এক অভিনেতার মৃত্যু নিয়ে বলেন, বলা হচ্ছে এ অভিনেতা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। আসলে তা সঠিক নয়। আমি যতটুকু জানি, তার আগেই থেকে কিডনিসহ অন্যান্য জটিলতা ছিল। চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর এ অভিনেতার সে সব রোগের জটিলতা আরো বেড়ে যায়। এর ফলেই তার মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি।

তিনি বলেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলে রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমতে থাকে। এ জন্য এ সময় রোগীকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধের পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে সুপেয় পানি, ডাবের পানি, ওরস্যালাইন, ফলমূলসহ পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। রোগীর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে।

এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুর ঝুঁকি নেই- এটিই সত্য। প্রায় সব ক্ষেত্রে এই রোগ থেকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম মানব ইমিউন সিস্টেম। তবে উপসর্গগুলো দূর হওয়ার জন্য কিছুটা সময় লাগতে পারে, বিশেষ করে জয়েন্টের ব্যথা। তবে পরিসংখ্যান বলছে, বয়স্ক ও শিশুদের ঝুঁকি সামান্য রয়েছে, যাতে হাজারে একজনের মারা যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা প্রসঙ্গে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব কিডনি ও ইউরোলজি হাসপাতালের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. জামানুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, প্যারাসিটামল ছাড়া অন্য কোনো ব্যথানাশক সেবন ঠিক হবে না। এ ছাড়া প্যারাসিটামলও পরিমিত মাত্রায় সেবন করা জরুরি। ব্যথানাশক কিডনির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের (নিপসম) অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহম্মেদ বলেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের মধ্যে কিছু কিছু অস্বাভাবিক উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। এগুলো নিয়ে গবেষণা হওয়া জরুরি। তাতে চিকিৎসার নতুন কোনো পথ তৈরি হতে পারে। নয়তো রোগীদের জটিলতা বাড়বে।

ডা. বেনজীর আহম্মেদ বলেন, জ্বরের পরে ব্যথা থাকবে জানলেও এর মাত্রা কেমন হবে তা নিয়ে মানুষ সংশয়ে আছে। ফলে অনেকেই অতিমাত্রায় ব্যথানাশক সেবন করে কিডনি-লিভারের ক্ষতি করে ফেলছে কি না সেটাও দেখা দরকার। এছাড়া বারবার ব্যথা ওঠানামা করা নিয়েও মানুষ শঙ্কিত।

এ প্রসঙ্গে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. সেব্রিনা মীরজাদী ফ্লোরা বলেন, চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত হওয়ার পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে গবেষণা শুরু করেছি। অনেক রোগীকেই আমাদের নিজস্ব ফলোআপে রেখেছি। কার কী রকম উপসর্গ হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, অনেকের মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি জ্বর সেরে গিয়েও আবার ফিরে আসে, ব্যথা কমে আবার বেড়ে যাওয়ার ঘটনাও আছে। এ ছাড়া অন্য আর কী কী উপসর্গ আছে সেগুলো নিয়ে আমরা কাজ করছি।
 

আগের নিউজ
পরের নিউজ
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি
জাতীয় ওষুধনীতি-২০১৬’ এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন

নিবন্ধনহীন ওষুধ লিখলে চিকিৎসকের শাস্তি