ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৮ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫ ঘন্টা আগে
ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী

ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী

ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিক্যাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল, মহাখালী, ঢাকা

[email protected]


২৩ জুলাই, ২০১৭ ১২:২৫

চিকিৎসায় স্বদেশ-বিদেশ

চিকিৎসায় স্বদেশ-বিদেশ

কিছুদিন আগে ‘এশিয়ান হেলথ লিডারস সামিট’ শীর্ষক এক সম্মেলনে যোগ দিতে সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলাম। বিদেশে গেলে সুযোগ পেলেই সেখানকার নামীদামি হাসপাতালগুলো ঘুরে দেখার চেষ্টা করি। ঘুরে দেখার কারণ অন্য কিছু নয়; এ দেশ থেকে মানুষ কেন বিদেশে যায়? কী আছে ওখানে? সিঙ্গাপুর সফরের সময় মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতাল ও গ্লেনইগলস হাসপাতাল সফরের সুযোগ নিয়েছিলাম। গ্লেনইগলস হাসপাতালের লবিতে হঠাৎ একজন ভদ্রলোক এগিয়ে এলেন আমার দিকে! ওই ভদ্রলোক জানালেন, তাঁর বাবা আমার হাসপাতালের একজন নিয়মিত রোগী। তাঁর মূত্রথলিতে টিউমার হয়েছে। ভদ্রলোক তাঁর বাবার অসুখের চিকিৎসার দ্বিতীয় মতামত নিতে সিঙ্গাপুরে এসেছেন। উল্লেখ্য, সিঙ্গাপুর পৃথিবীর অন্যতম ব্যয়বহুল একটি শহর, যেখানে চিকিৎসার ব্যয়ও অনেক বেশি।

গল্পটা বলছি অন্য কারণে। ভদ্রলোক আমাকে অনুরোধ করলেন, তাঁর বাবাকে নিয়ে যখন চিকিৎসকের চেম্বারে যাবেন, আমি যেন সঙ্গে থাকি। সময় কম থাকা সত্ত্বেও তাঁর অনুরোধে সঙ্গে থাকলাম! এখানে আমারও কৌতূহল কাজ করছে। সিঙ্গাপুরের ইউরোলজিস্ট কী চিকিৎসা দেবেন, যা বাংলাদেশের ইউরোলজিস্ট জানেন না? কিংবা তাঁর রোগীদের তিনি কীভাবে কাউন্সেলিং করেন। যা হোক, ইউরোলজিস্ট রোগীর ইতিহাস নিলেন, চিকিৎসক হিসেবে আমার সঙ্গে সৌজন্য প্রদর্শন করলেন এবং চিকিৎসার পুরো বিষয়টি বুঝিয়ে বললেন, খরচ সম্বন্ধেও ধারণা দিলেন। একসময় ভদ্রলোক বাংলাদেশের (অর্থাৎ আমাদের হাসপাতালের) প্রেসক্রিপশন ও রিপোর্ট চিকিৎসককে দেখালেন। বিস্ময়কর সত্য হচ্ছে, সিঙ্গাপুরের ইউরোলজিস্ট বললেন, ‘আপনি এতক্ষণ এসব কাগজপত্র দেখাননি কেন? আপনার দেশের ইউরোলজিস্ট যে চিকিৎসা দিয়েছেন, আমিও একই পরামর্শ দিয়েছি। অর্থাৎ, মেশিন দিয়ে মূত্রথলির টিউমারটা টুকরো টুকরো করে কেটে এনে মাংসগুলোতে বায়োপসি করতে হবে এবং রিপোর্ট অনুযায়ী পরবর্তী চিকিৎসা নির্ধারিত হবে। অপারেশনটির নাম TURBT, যা বাংলাদেশে হরহামেশাই হচ্ছে।

প্রিয় পাঠক, গল্পটি এখনো শেষ হয়নি, এবার ফি দেওয়ার পালা। রোগীর ছেলে অত্যন্ত খুশি—সিঙ্গাপুরের চিকিৎসক তাঁকে এত সময় দিয়েছেন। চিকিৎসক সাহেবের ফি প্রথম আধা ঘণ্টায় ১৫০ সিঙ্গাপুরি ডলার, অর্থাৎ ৯ হাজার টাকা। কিন্তু যেহেতু ১২ মিনিট বেশি কথা বলেছেন, অর্থাৎ ৪২ মিনিট সময় দিয়েছেন, তাই অতিরিক্ত ৭৫ সিঙ্গাপুরি ডলার যোগ হবে। অর্থাৎ মোট ফি ২২৫ ডলার, যার বাংলাদেশি মান প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা।

সিঙ্গাপুরের ইউরোলজিস্ট তাঁর বাবাকে আমাদের হাসপাতালেই এই অপারেশনের পরামর্শ দিলেন এবং আশ্বস্ত করলেন, বাংলাদেশের ইউরোলজিস্টের চিকিৎসা এবং তাঁর চিকিৎসা সম্পূর্ণ এক রকম। বাংলাদেশি চিকিৎসক হিসেবে তখন গর্ববোধ করলাম! কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, কেন সিঙ্গাপুরের চিকিৎসক একজন রোগীকে এত সময় দিলেন? কেন এত টাকা দেওয়ার পরও রোগীর কোনো ক্ষোভ নেই, যেখানে বাংলাদেশের একজন চিকিৎসককে ৫০০ কিংবা ১০০০ টাকা ভিজিট দিতে অনেকে নেতিবাচক কথা বলেন!

এর অনেক কারণের মধ্যে প্রধান কারণগুলো আমার কাছে মনে হচ্ছে, সিঙ্গাপুরে রেফারেল সিস্টেমের কারণে ওই ইউরোলজিস্ট সেদিন মাত্র সাতজন রোগী দেখেছেন, যেখানে আমাদের দেশে একজন চিকিৎসক অনেক বেশি রোগী দেখেন! এর কারণ প্রথমত জনসংখ্যা, দ্বিতীয়ত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অপ্রতুলতা। সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে প্রত্যেক রোগীর কাছে দেখলাম ইনস্যুরেন্স কার্ড। তাই বিল নিয়ে কারও কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কিন্তু বাংলাদেশে হেলথ ইনস্যুরেন্স না থাকার কারণে পকেট থেকে বিল দিতে হয়, আর এ কারণে ঘটে বিপত্তি।

ঘটনাটি  আমি তুলে ধরলাম একটি উদাহরণ হিসেবে। এমনিভাবে প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার চিকিৎসা ব্যয় বিদেশে চলে যাচ্ছে। এভাবেই কি চলতে থাকবে?

আশার কথা বলছি, গত এক দশকে এ দেশে চিকিৎসা খাতে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে। উন্নত বিশ্বের প্রায় সব চিকিৎসা এ দেশে বিদ্যমান। কিন্তু তারপরও প্রতিবছর বহু মানুষ চিকিৎসা নিতে বিদেশে যায়। তাহলে উপায় কী? এভাবেই কি চলতে থাকবে?

দেশের মানুষ যাতে দেশেই চিকিৎসা নেয়, আমাদের সেই উদ্যোগ নিতে হবে। চিকিৎসক হিসেবে আমাদের কিছু দায় রয়েছে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার প্রতিবাদে চেম্বার বা হাসপাতাল বন্ধ রাখা থেকে আমাদের বিরত থাকতে হবে। কারণ তাতে আসলে বিপদে পড়ে সাধারণ রোগীরা। একই সঙ্গে আমাদের, অর্থাৎ চিকিৎসকদের কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। পুলিশের কর্তব্যকাজে বাধা দিলে যদি মামলা হতে পারে, তাহলে হাসপাতালে বা চেম্বারে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর উচ্ছৃঙ্খল আচরণ দমনের জন্য আইনের প্রয়োগ যথাযথভাবে নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসক, নার্স ও সেবাকর্মী হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আরও অধিক মনোযোগী হওয়া এবং পেশাদারিত্ব বাড়ানো। যেসব চিকিৎসক চেম্বারে অমনোযোগী, তাঁদের রোগীদের স্বার্থে নিয়মিত চেম্বারে সময় দিতে হবে। বিকেল পাঁচটায় চেম্বার টাইম দিয়ে রাত আটটায় আসার সংস্কৃতি থেকে সরে আসতে হবে।

আমরা যদি পেশার প্রতি আরও বেশি মনোযোগী হই, পেশাদারির সঙ্গে দায়িত্ব পালন করি এবং যদি রেফারেল সিস্টেম চালু করা যায়, তবেই চিকিৎসক-রোগী সম্পর্কের টানাপোড়েনের অবসান ঘটবে। এ দেশ থেকে একজন রোগীকে আর ‘চিকিৎসক সময় দেন না কিংবা চিকিৎসকের ব্যবহার খারাপ’ অজুহাতে বিদেশে যেতে হবে না।

ডা. আশীষ কুমার চক্রবর্তী: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

[email protected]

 

সৌজন্যে : প্রথম আলো

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত