ঢাকা      রবিবার ২২, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ৭, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



নাঈম ইবনে আসাদ

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ


অণুগল্প

পাত্র ডাক্তার

মেয়ের বাবা আর দেরি করতে চাইলেন না । ছেলে এইবার এমবিবিএস শেষ করে ইন্টার্ন করছে । ভদ্র ছেলে পুরো গ্রামের গর্ব । এরকম ছেলে পাওয়া এখন দায়, চাইলেই তো আর পাওয়া যায় না । তাই মেয়ের বাবা এমন পাত্র হাতছাড়া করতে রাজি নয় । দুইদিন পর ছেলে যখন ইন্টার্ন শেষ করবে তখন তার চাকরি নিয়ে কোন চিন্তা নেই । এমন ছেলের কাছে মেয়ে বিয়ে দিয়ে অন্তত চিন্তামুক্ত থাকতে পারবেন বলেই মনে করেন মেয়ের বাবা । 
এদিকে ছেলের বাবা চাচ্ছেন আরও কিছু দিন সময় যাক । কিন্তু মেয়ের বাবা আর ঘটকের তীব্র উৎসাহের কাছে ছেলের বাবা একেবারে নিরুপায় ।

অবশেষে দু’পক্ষকে সম্মত করতে পেরে ঘটক কিছুটা ভার মুক্ত । এতদিনে যা জুতা ক্ষয় হয়েছে তার কিছুটা হিল্লে হল । অবশেষে ছেলের বাবাও মেয়ে দেখার সম্মতি জানালেন ।

ক্রিং ক্রিং ক্রিং ------
দীর্ঘক্ষণ মোবাইল বেজে যাচ্ছে । এতক্ষণে সম্ভেদ ফিরে পেল কায়েস । টানা চৌদ্দ ঘন্টা ডিউটি করে ক্লান্তিতে কখন যে বিছানায় টলে পড়ছে তা বুঝতেই পারেনি কায়েস । 
মোবাইলের দিকে তাকিয়ে দেখে দশটা মিস কল । 
আবার, 
ক্রিং ক্রিং ক্রিং --------
গ্রাম থেকে বাবার ফোন, 
রিসিভ করেই বড় করে সালাম দিল তার আব্বাজানকে।
কথাটা শোনার জন্য কায়েস প্রস্তুত ছিল না ।

বাড়িতে থেকে বাবা ফোন করে মেয়ে দেখার তারিখ বলে ছুটি নিতে বললেন ।
কায়েস একেবারে স্ট্যাচু হয়ে আছে, এই মুহুর্তে ছুটি পাওয়াটাও দায় ।
কিন্তু বাবা মেয়ে পক্ষকে কথা দিয়ে দিলেন । এখন আর কিছু করার নেই । 
আগামী আঠারো নভেম্বর বৃহস্পতিবার মেয়ে দেখার দিন ধার্য করা হয়েছে ।
এদিকে মেয়ের বাবা দিনটির জন্য একেবারে উৎসুক হয়ে আছেন । তার বন্ধু বান্ধব আত্নীয় স্বজন কাউকে বাকি রাখেননি, সবাইকে জানিয়ে দিলেন মেয়ের বিয়ের কথা ।

সব ঠিক ভাবেই হয়েছিল তবে মোহরানা নিয়ে মেয়ের বাবার ঘোর আপত্তি । কিভাবে তার বন্ধু বান্ধব আত্নীয় স্বজনকে মুখ দেখাবেন তা ভেবে কূল পাচ্ছেন ।
তার বন্ধুর মেয়ের বিয়েতে তার মেয়ে জামাই মেয়েকে ত্রিশ লক্ষ টাকা মোহরানা দিয়েছিল । 
অথচ ছেলে ডাক্তার হওয়া সত্বেও তার মেয়েকে পাঁচের বেশি দিতে রাজি নয়।
তিনি এই কয়দিনে ঢেরা পিটিয়ে সবখান জানান দিলেন ছেলে ডাক্তার নিশ্চয় অনেক কিছু কিন্তু যা দিলেন তাতে তিনি নিজের সম্মান নিয়েই বিপদে পড়ে গেলেন ।

ইন্টার্নের এই স্বল্প বেতনে যাই হোক বিয়ের দেন দরবার করা সম্ভব নয় ।
পার্ট টাইম প্রাইভেট হসপিটালে ডিউটি, বন্ধুদের থেকে ঋণ আর কিছু জমানো টাকা নিয়ে যা অ্যামাউন্ট হয়েছে তা দিয়ে বড়জোড় স্বর্ণ কেনা যাবে তার বেশি নয় । 
বাবার পেনশনের টাকাটা না থাকলে হয়তো এই যাত্রায় বিয়ে করাটাই ভণ্ডুল হয়ে যেত । 
কায়েস এই যাত্রায় এবার আসল সত্যটা উপলব্ধি করলো । 
ডিসেম্বর শেষ সপ্তাহে বিয়ের দিন ধার্য হয়েছে অথচ এরই মধ্যে বিসিএস পরীক্ষার সময় সূচী ঠিক হয়ে গেছে। 
BCPS এর অধীনে এফসিপিএস দেওয়া প্রায় অসম্ভব বৈকি । বিয়ের দেন দরবার করে দশ হাজার টাকা দিয়ে রেজিস্ট্রেশন করাটাও প্রায় অসম্ভব ।
এতদিনে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কায়েস একেবারে ক্লান্ত । মনে হচ্ছে আজ রাতেই চুল সব ঝরে যাবে ।

ছেলে পক্ষের কর্মস্থিরতা দেখে মেয়ের বাবা শংকিত ।
আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি অথচ কেনাকাটা সব যে বাকি । 
এইবার কায়েসের ঘুম ভাঙ্গলো ।
সময় যে আর বেশি নেই । 
ছেলে পক্ষের পাঠানো জিনিসপত্রে মেয়ে পক্ষ সন্তুষ্ট নয়।
সবাই তো রীতিমত অবাক ।
ডাক্তার ছেলে এত টাকা পয়সা অথচ জিনিসগুলো কিনতে কি রুচিতে বাঁধেনি? ----- রাগান্বিত কণ্ঠ বললো মেয়ের বড়বোন । 
এইবার মেয়ের মায়ের সোজাসাপ্টা কথা সামনে এমন জিনিস দিলে কিছু পাঠানোর প্রয়োজন নেই, আমাদের মেয়েকে আমরাই দিব ।

সুন্দর গেট সাজিয়ে মেয়ে পক্ষের লোকজন দাঁড়িয়ে আছে ছেলেকে অভ্যর্থনা জানাতে ।
গেটের ঠিক সামনে লাল ফিতা দিয়ে ব্লক সৃষ্টি করে ছেলে পক্ষকে থামিয়ে দিল ছোটরা । গেটে সুন্দর করে সাজানো প্লেটে কিছু টাকা উপঢৌকন না দিলে এই যাত্রায় ছেলে পক্ষকে গেট পার হতে দেয়া হবে না ।
পাত্র তার পকেটে হাত দিয়ে পাঁচশো টাকার নোট ধরিয়ে দিল ।
এই টাকা পেয়ে মেয়ে পক্ষের সবাই হো হো করে হেসে উঠলো ।
পেছন থেকে এক বৃদ্ধলোক বলেই বসলো, ছেলে তো দেখছি একেবারে কিপটে ।
নানান জনের নানান কথায় কায়েস একেবারে বিধ্বস্ত ।
অগত্যা পাঁচ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে অবশেষে হাঁফছেড়ে বাঁচলো ।

বিয়ের মাত্র তিনদিন পার হল । এরই মধ্যে কায়েস ঢাকা যাওয়া নিয়ে ব্যতি ব্যস্ত হয়ে পড়লো । 
সাবিহা অনেক চেষ্টা করে থামাতে না পেরে তার আব্বুকে বললো -- আপনার জামাই আজই ঢাকা ফিরছে ।
আফতাব সাহেব তাড়াতাড়ি দৌড়ে এসে বললেন, সেকি বাবা হানিমুন না করেই ফিরে যাবে ।
বাবা, ছুটি শেষ যে ইনশাআল্লাহ সুযোগ পেলে কোনদিন যাব-- কায়েসের সরল উত্তর ।
এবার সাবিহা খুব কষ্ট পেল । সাবিহা কায়েসকে টেনে নিয়ে গিয়ে বললো তোমরা মধু চন্দ্রিমা কী বুঝ না?
কায়েস এবার বললো, সবই জানি কিন্তু আমাদের কাছে রুগীর সেবা দেয়াই হল মধু চন্দ্রিমা ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


পাঠক কর্নার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সন্তানের থ্যালাসেমিয়ার জন্য পিতা-মাতার অজ্ঞতাই দায়ী!

সিএমসি, ভেলোরে আমি যে রুমে বসে রোগী দেখছি সেখানে ইন্ডিয়ার অন্যান্য রাজ্যের…

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

আধুনিক মায়েরা সিজার ছাড়া বাচ্চা প্রসবের চিন্তাই করেন না

সমাজে কিছু মানসিকভাবে অসুস্থ ডাক্তার বিদ্বেষী মানুষ আছে। অসুখ হলে ইনিয়ে বিনিয়ে…

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

আনিসের প্রত্যাবর্তন 

রাস্তায় একজনের মুখে সরাসরি সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে দিলো আনিস। আচমকা এ আচরণে…

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ: গল্পে গল্পে শিখি

স্রষ্টার সৃষ্টি বড় অদ্ভুত, মেডিকেল সায়েন্স পড়লে এটা ভাল বুঝা যায়। মাছের…

বদ লোকের গল্প!

বদ লোকের গল্প!

উপজেলায় নতুন তখন। সবাইকে ঠিকঠাক চিনিও না। হঠাৎ একদিন আমার রুমে পেট…



জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

স্বাস্থ্যমন্ত্রী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস