ডা. নাসিমন নাহার

ডা. নাসিমন নাহার

চিকিৎসক ও লেখক


১৭ জুন, ২০১৭ ০২:৪৭ পিএম

আগামীকাল হয়তো পত্রিকার শিরোনাম হয়ে যেতাম

আগামীকাল হয়তো পত্রিকার শিরোনাম হয়ে যেতাম

আগামীকাল হয়তো পত্রিকার শিরোনাম হয়ে যেতাম আমি--- 'কর্তব্যরত অবস্থায় রোগীর লোক কতৃক নারী চিকিৎসক প্রহৃত/আহত/নিহত।'

একটুর জন্য ঘটনার মোড় ঘুরে গেছে। রোগী নিজেই সেইফ করেছে আমাকে এবং রোগীর স্বামী হাত ধরে মাফ চেয়েছে।

ঘটনা হল---- সকালে আউট ডোরে ডিউটি করছিলাম একটা প্রাইভেট ক্লিনিকে।একজন মহিলা রোগী এল।সাথে এক দঙ্গল আত্মীয় স্বজনের দল। আমি বরাবরই রোগী দেখার সময়ে এক দুজনের বেশি এটেনডেন্স এলাউ করি না।
কারন জানি এরাই মূল ঝামেলা পাকায় এবং চিকিৎসাতে ব্যাঘাত ঘটায়।তো রোগীর সাথে একজন মহিলা এবং একজন পুরুষ এটেনডেন্স ঢুকল চেম্বারে।রোগী খুব restless ছিল।

ঠিকমতো কথা বলতে পারছিল না। কিন্তু হিস্ট্রি জানাটা জরুরী। তাই প্রথমে সাথের মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে ওনার? কখন থেকে এমন করছে? তার উত্তর--"আমি জানি না।আফনে দেখেতে পারতেছেন না। আফনের কাছে আনছি কি জন্য আমি যদি সব বইলা দেই।" খুব উচ্চ স্বরে এটা ছিল তার রিপ্লাই।

মহিলা হচ্ছে রোগীর মা।

এরপর আমি সাথের পুরুষ কে জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছে। কারন হিস্ট্রি না শুনে, না লিখে রোগী হ্যান্ডেল করতে চাচ্ছি না। আজকাল এমনিতেই রোগী দেখতে আসলেই আতঙ্ক বোধ করি। তাই চেষ্টা করি প্রসিডিউর মেইনটেইন করতে। অফিসিয়ালি ঠিকঠাক থাকতে। জান বাঁচানো ফরজ---- প্রতিদিন হাসপাতালে আসার আগে এই কথাটা বলতে বলতে আসি আজকাল।

এদিকে বিপি মেপে দেখলাম হাই (160/110)। রোগীর হাজবেন্ড যখন হিস্ট্রি বলতে শুরু করল ঠিক তখন রোগীর মা রীতিমত চিল্লাপাল্লা করে নিজেও হিস্ট্রি দিতে শুরু করল। আমি ওনার দিকে তাকিয়ে শান্তভাবে কিন্তু কঠিন স্বরে বললাম--- দুজন কথা বললে আমি কার কথা শুনব ? আপনি তো বললেন জানেন না। তাহলে এখন কথা কেন বলছেন ?

মহিলা তখন গজ গজ করতে করতে বের হয়ে গেল রুম থেকে। এরপর আমি হিস্ট্রি নিয়ে রোগীকে physical examination করে কিছু ইনভেস্টিগেশন লিখে সিষ্টারকে বললাম RBS আর ECG টা এখুনি করানোর ব্যবস্থা করতে।
রোগী ততক্ষণে বলছে--- ম্যাডাম আপনার কথা শুনে ভাল লাগতেছে আমার। আমি বললাম-- পরীক্ষার রিপোর্ট দেখি তারপর ঔষধ লিখে দিব। পুরো ভালো হয়ে যাবেন ইনশাআল্লাহ।

এই সময়ে রোগীর মা আবার চেম্বারে ঢুকলেন সাথে ক্লিনিকের ম্যানেজার। ম্যানেজারসহ ক্লিনিকের সব ষ্টাফরা জানে---- ডা.মিম্ মি দালাল/এমআর ইত্যাদি গুণে চলে না। রোগীর জন্য যা সঠিক মনে হয় নিজেই সেই সিদ্ধান্ত নেয়। তাই ওরা কখনোই আমাকে অযথা ঘাটায় না, খানিকটা ভয়ও পায় মনে হয়। ম্যানেজার বলল--ম্যাডাম উনি রোগীর মা। থাকুক ভেতরে।সিস্টার বলল-- ম্যাডাম তো ওনাকে থাকতে না বলে নাই। ব্যাস সাথে সাথে সিনেম্যাটিক স্টাইলে ঐ মহিলা সামনে রাখা টুল পা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলে চিল্লানি দিয়ে উঠলো---আমারে চিনেন? কি করতে পারি আমি জানেন? এই এলাকা আমার।লোকজন নিয়ে হাসপাতাল ভাইঙ্গা দিমু।হেন করমু ত্যান করমু। এ জাতীয় আরো অকথ্য কথাবার্তা। হৈ চৈ শুনে অন্য স্টার্ফরাও ছুটে এসেছে চেম্বারের সামনে।

আমি মোটামুটি কঠিন নার্ভের মেয়ে। যেকোন ঘটনায় পরিস্থিতি যত খারাপ হতে থাকে আমি ততই cool হতে থাকি-----বহুবার প্রমানিত।

তাই কনফিডেন্ট ছিলাম--- পরিস্থিতি আন্ডার কন্ট্রোলে নিয়ে আসতে পারব। আর মাইর যদি খাই আমিও মাইর দিব, একটা হলেও দিবই ! 

কাঠকাঠ গলায় বললাম --- যা করতে পারেন করেন।এইসব ভয় দেখাতে আসবেন না। একটা ফোন কলই যথেষ্ট আপনাকে জায়গামতো পাঠাতে।বুঝতে পেরেছেন?

আমার রোগী তখন নিজে তার মা কে বলছে -- আরে তুমি থাম মা। কি সব কইতেছে। ম্যাডাম আপনি কিছু মনে নিয়েন না। আমার মায়ের মাথায় সমস্যা। আমি বললাম--- আপনি পরীক্ষাগুলো করান। আপনার চিকিৎসার কোন হেরফের হবে না।

মহিলাকে সবাই টেনে রুমের বাইরে নিয়ে গেল।

রোগীর হাজবেন্ড এসে আমার হাত জড়িয়ে ধরে বলল--- সরি ম্যাডাম কিছু মনে করবেন না।

উনি সাইকো। সবার সাথে এমন করে।

কিছুক্ষণ পর ক্লিনিকের মালিক এলেন। ওনার ছেলে ডাক্তার। মূলত তার অনুরোধে আমি এই ক্লিনিকে চেম্বার করি মাঝে মাঝে। তো আংকেলও খুব সরি বললেন। জানালেন মহিলার ভাই এসেছে। সে স্থানীয় মেম্বার। খুব দুঃখ প্রকাশ করেছেন। সরি বলতে চান আমাকে। আর রোগী নিজেই বারবার সবাইকে বলেছে- ডাক্তার তো কোন ভুল করেনি। তার মা অযথাই ঝামেলা করেছে।

এই হলো আজ সকালের ঘটনা।

ভাগ্য, আব্বু আম্মুর দোয়া, আহ্ নাফের উছিলা আর সাহসের জন্য সম্ভবত বেঁচে গেলাম।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত