রিদওয়ান জুবায়ের রিয়াদ

রিদওয়ান জুবায়ের রিয়াদ

জেনারেল সেক্রেটারি, সন্ধানী কেন্দ্রীয় পরিষদ

এবং

শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


১৩ জুন, ২০১৭ ০৮:২৯ এএম

সন্ধানীর ৪০ বছর: মানবসেবার অতন্দ্র কান্ডারী

সন্ধানীর ৪০ বছর: মানবসেবার অতন্দ্র কান্ডারী

প্রতিষ্ঠা প্রেক্ষাপটঃ এক সহপাঠীর সকালের নাস্তার বন্দোবস্ত করার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছয় জন ছাত্রের হাত ধরে ১৯৭৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী নামহীন ভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে জন্ম হয়েছিল ‘সন্ধানী’। প্রতিষ্ঠাতারা তাঁদের স্বপ্নের সংগঠনের জন্য ১৯৭৭ সালের ১৯ মার্চ বিকেল ৫টায় মোশাররফ হোসেন মুক্ত (সাধারণ সম্পাদক) প্রস্তাবিত ‘সন্ধানী’ নামটি মনোনীত করেন। পরবর্তীতে মোঃ ইদ্রিস আলী মঞ্জু (অর্থ সম্পাদক) ও মোস্তফা সেলিমুল হাসনাইন (পাঠাগার সম্পাদক) তৈরি করেন সন্ধানীর প্রথম সংবিধান ‘সন্ধানী নিয়াবলী’। প্রতিষ্ঠাতা বাকি সদস্যরা ছিলেন মোস্তাফিজুর রহমান স্বপন (সভাপতি), খুরশিদ আহমেদ আপু (সাহিত্য, পত্রিকা ও প্রকাশনা সম্পাদক) এবং মোঃ আব্দুল কাইউম।

সংবিধানে উদ্দেশ্য হিসেবে লেখা ছিল, “যাবতীয় অন্যায় অনাচার থেকে মুক্ত রেখে নিজেদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা এবং মানবতার কল্যাণের জন্য সাধ্যানুযায়ী সার্বিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।” ১৯৭৯ সালের ১৮ অক্টোবর ২য় স্বতন্ত্র ইউনিট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে সন্ধানী ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ইউনিট। ১৯৮২ সালের মধ্যে দেশের পুরনো মেডিকেল কলেজ ও ঢাকা ডেন্টাল কলেজে এবং ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত নতুন ৫টি মেডিকেল কলেজে স্থাপিত হয় সন্ধানী ইউনিট। সহযোগী সংগঠন হিসেবে ১৯৮২ সালের ২ জুলাই ‘সন্ধানী ডোনার ক্লাব’ এবং ১৯৮৪ সালের ২৫ নভেম্বর ‘সন্ধানী জাতীয় চক্ষুদান সমিতি’ ও ‘সন্ধানী আন্তর্জাতিক চক্ষু ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠিত হয়।

বর্তমান ইউনিট ও ডোনার ক্লাবঃ বর্তমানে সারা দেশের ১৭টি সরকারি মেডিকেল কলেজে এবং ৪টি বেসরকারি মেডিকেল কলেজ সন্ধানীর ইউনিট রয়েছে। রয়েছে ফরিদপুর, বরিশাল, পাবনা, সুনামগঞ্জ, নোয়াখালী, খুলনা, গাইবান্ধা, ঝালকাঠি এবং কুড়িগ্রামে সন্ধানী ডোনার ক্লাব।

ইউনিট গুলো হল : ১। সন্ধানী আব্দুল মালেক মেডিকেল কলেজ ইউনিট ২। সন্ধানী, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ ইউনিট ৩। সন্ধানী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ইউনিট। ৪। সন্ধানী, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ ইউনিট ৫। সন্ধানী, কক্সবাজার মেডিকেল কলেজ ইউনিট ৬। সন্ধানী, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ইউনিট । ৭। সন্ধানী, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ইউনিট ৮। সন্ধানী, ইস্ট ওয়েস্ট মেডিকেল ও আপডেট ডেন্টাল কলেজ ইউনিট ৯। সন্ধানী, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ইউনিটের ১০। সন্ধানী, গণস্বাস্থ্য সমাজ ভিত্তিক মেডিকেল কলেজ ইউনিট ১১। সন্ধানী, যশোর মেডিকেল কলেজ ইউনিট ১২। সন্ধানী, জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজ ইউনিট ১৩। সন্ধানী, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ইউনিট ১৪। সন্ধানী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ ইউনিটে ১৫। সন্ধানী, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ ইউনিট ১৬। সন্ধানী, রংপুর মেডিকেল কলেজ ইউনিট ১৭। সন্ধানী, সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজ ইউনিট ১৮। সন্ধানী, শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল ইউনিট ১৯। সন্ধানী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ইউনিট। ২০। সন্ধানী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ইউনিট। ২১। সন্ধানী, শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ ইউনিট।

রক্তদান কর্মসূচিঃ ১৯৭৭-১৯৭৮ মৌসুমে ২০৭ ব্যাগ রক্ত সংগ্রহের মাধ্যমে সূচনা করে সন্ধানীর ২১ টি ইউনিট, ৯টি ডোনার ক্লাব থেকে বর্তমানে প্রতি বছর প্রায় চল্লিশ হাজারের অধিক ব্যাগ রক্ত পৌঁছে যাচ্ছে হাসপাতালে রক্তের জন্য দিগ্বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছুটোছুটি করা মানুষগুলোর কাছে। পুরোটাই স্বেচ্ছাসেবী রক্তদাতাদের থেকে সংগ্রহের জন্য দিনরাত সংগ্রাম করে যাচ্ছে প্রতিজন সন্ধানীয়ান। প্রতিটি সরকারি ছুটির দিনে যখন বাকি সবাই ঘুরাঘুরিতে ব্যস্ত সময় ব্যয় করে, তখন সন্ধানীয়ানরা হয়তো কোনো ঐতিহাসিক স্থানের সামনে অথবা কোনো স্কুল-কলেজে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচির আয়োজন করেছে। শুধুমাত্র এক জন বেশি মানুষকে বাঁচানোর আশায় উৎসবের আনন্দ উপেক্ষা করে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে রক্তদানের উপকারিতা, সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ক্যাম্পের আয়োজন করে যাচ্ছে সন্ধানী।

ড্রাগ ব্যাংকঃ হাসপাতাল ও হাসপাতালের বাহিরে গরীব ও অসহায় রোগীদের সাহায্যে সন্ধানী ইউনিট সমূহ বিনামূল্যে ওষুধ বিতরণ করে থাকে। প্রতিবছর মেডিকেল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনুদান থেকে প্রায় কয়েক হাজার রোগী পেয়ে থাকে এই সহায়তা।

টিকাদান কর্মসূচিঃ ঘাতক ব্যাধি হেপাটাইটিস বি,টায়ফয়েড এবং জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে সন্ধানী ইউনিট সমূহ নিয়মিত মাসিক কার্যক্রম পরিচালনা করে। টিকাদানে উদ্বুদ্ধকরণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি মূলক দিনব্যাপী বা সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচী আয়োজন করা হয়।

অন্যান্য সেবামূলক কার্যক্রমঃ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ঐতিহাসিক স্থান সমূহে রক্তের গ্রুপ নির্ণয়, হেলথ ক্যাম্প, আই ক্যাম্প, যেকোনো দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণ, গরীব মেধাবী শিক্ষার্থীদের সাহায্য করা, শীতবস্ত্র বিতরণ, ঈদজামা ও ঈদ সামগ্রী বিতরণ, বিনামূল্যে পুস্তক প্রদান, বিভিন্ন জাতীয় দিবসে সেমিনার বা সিম্পোজিয়াম, শিক্ষা বিষয়ক আলোচনা সভা, বৃক্ষরোপণ কর্মসূচী, ধুমপানবিরোধী কর্মসূচী, নবীনবরণ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহ বিভিন্ন কর্মসূচী আয়োজন করে আসছে সন্ধানী।

অর্জন: মেডিকেলের কঠিন পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার্থীরা তাঁদের এই অক্লান্ত শ্রমের স্বীকৃতিও পেয়েছে। ২০০৪ সালে দেশের সর্বোচ্চ সম্মান ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’, ২০১০ সালে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ অ্যামেরিকা’ পুরস্কারের পাশাপাশি ঝুড়িতে আছে ‘কমনওয়েলথ ইয়ুথ সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড’সহ আরও অনেক স্বীকৃতি।

প্রতিবন্ধকতা: সন্ধানী ৪০ বছর যাবত হাসপাতালে রক্ত সরবরাহ করলেও এখন পর্যন্ত সন্ধানীর কোন নিজস্ব ব্লাড ব্যাংক নেই। যার ফলশ্রুতিতে এখনও সন্ধানী ব্লাড ট্রান্সফিউশন করতে পারে না। সন্ধানীর কার্যক্রমে সবার নৈতিক সর্মথন থাকলেও পৃষ্ঠপোষকের অনেক অভাব রয়েছে। ছাত্র-ছাত্রী দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।

পরিসংখ্যান : ২০১৬-১৭ সেশনে সংগৃহিত রক্তের পরিমাণ ৪৩৬৫৬ ব্যাগ। ২০১৫-১৬ সেশনে সংগৃহিত রক্ত ৪১৮৭০ ব্যাগ, ২০১৪-১৫ সেশনে সংগৃহিত রক্ত ৪০৬৭৯ ব্যাগ এবং ২০১৩-১৪ সেশনে সংগৃহিত রক্ত ছিলো ৩৮৩২০ ব্যাগ। 

২০১৬-১৭ সেশনে ১৩ লাখ ৭ হাজার ৮শ’ টাকার ওষুধ সরবরাহ করে সন্ধ্যানী। ২০১৫-১৬ সেশনে ওষুধ সরবরাহ করে ১২ লাখ ৫৯ হাজার টাকার। ২০১৪-১৫ সেশনে ১১ লাখ ৩০ হাজার ৭শ’ টাকার ওষুধ সরবরাহ করে। ২০১৩-১৪ সেশনে সরবরাহ করে ১১ লাখ ৯৬ হাজার ৫শ’ টাকা সমমূল্যের ওষুধ।  

এভাবেই প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে আন্তরিক ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা এবং দক্ষ পরিচালনায় দেশ বিদেশে মানবসেবা দিয়ে আসছে সন্ধানী। 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত