১০ জুন, ২০১৭ ০৬:১৭ পিএম

চিকুনগুনিয়া: আতঙ্ক হইবার কিছু নাই

চিকুনগুনিয়া: আতঙ্ক হইবার কিছু নাই

চিকুনগুনিয়া সম্প্রতি রাজধানীবাসীর মনে নূতন আতঙ্ক সৃষ্টি করিয়াছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চিকুন-চিকুন’ শব্দের গুনগুনানি শোনা যাইতেছে অনেক বেশি। আঞ্চলিকভাবে পরিচিত ‘ল্যাংড়া জ্বর’ অর্থ চিকুনগুনিয়াতে মৃত্যুভয় না থাকিলেও শারীরিক ব্যথা-যন্ত্রণা কাহাকে বলে এবং কত প্রকার ও কী কী—তাহা আক্রান্তের পেশী ও গাঁটে গাঁটে বোঝাইয়া দেয় খুব ভালোভাবে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন ইহা লইয়া আতঙ্কিত হইবার কিছু নাই। 

জানা যায়, এডিস প্রজাতির এডিস ইজিপ্টি এবং এডিস এলবোপিকটাস মশা হইতেই চিকুনগুনিয়া রোগের সংক্রমণ ঘটে। চিকুনগুনিয়া ভাইরাসটি টোগা গোত্রের ভাইরাস। মশাবাহিত হইবার কারণে ইহাকে আরবো ভাইরাসও বলা হয়। চিকুনগুনিয়া প্রথম ধরা পড়ে ১৯৫২ সালে আফ্রিকায়, পরে বিশ্বের অন্য দেশেও ইহার বিস্তার ঘটে। বিশ্বে গত ৫০ বছরে চিকুনগুনিয়া রোগীর সংখ্যা ৩০ গুণ বৃদ্ধি পাইবার নেপথ্যে রহিয়াছে বিশ্বের উষ্ণায়ন। কারণ তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে বৃদ্ধি পাইয়াছে মশককুলের বংশবিস্তারও। গত বত্সর ভারতে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হইয়াছে ১২ লক্ষ মানুষ। এই বত্সর পাকিস্তানেও চিকুনগুনিয়া রোগের দেখা মিলিয়াছে। বাংলাদেশে প্রথম ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এই রোগের ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা যায়। ২০১১ সালে ঢাকার দোহার উপজেলায় এই রোগ দেখা গেলেও পরে বিচ্ছিন্ন দুই-একটি রোগী ছাড়া এই রোগের বিস্তার বাংলাদেশে খুব একটা লক্ষ্য করা যায় নাই। কিন্তু এইবার মৌসুমের শুরুতে অতিবর্ষণের মধ্যে চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ লক্ষ্য করা যাইতেছে।

চিকুনগুনিয়া চিকিত্সার ব্যাপারে একটি গাইডলাইন অত্যন্ত জরুরি এই কারণে যে, চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু ও ইনফ্লুয়েঞ্জা—এই তিনটি রোগের উপসর্গ প্রায় একই রকম। সুতরাং প্রাথমিকভাবে কিছু লক্ষণ দেখিয়া চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করিতেই হইবে। বিশেষজ্ঞরাও মনে করিতেছেন, চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন করিবার উপযুক্ত সময় এখন, যাহাতে একটি যথাযথ গাইডলাইন তৈরি করা সম্ভব হয়। আসলে যথাযথ গাইডলাইনের মাধ্যমে অতীতেও অনেক প্রাণঘাতী রোগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হইয়াছে। তাহাতে জনআতঙ্কও প্রশমিত হয় অতি দ্রুত। আশার কথা হইল, রোগ তত্ত্ব, নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) চিকুনগুনিয়ার বিষয়ে একটি গাইডলাইন তৈরি করিয়াছে। জানা যায়, গত মে মাসেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হইতে এই ব্যাপারে সব জেলায় সিভিল সার্জন ও উপজেলা পর্যায়ে মেডিক্যাল কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হইয়াছে। কমিউনিটি ক্লিনিকসমূহেও ইহা পাওয়া যাইবে। তাহা ছাড়া, গত বত্সর চিকুনগুনিয়া রোগ সম্পর্কে তিন হাজার ৭০০ চিকিত্সককে প্রশিক্ষণ দেওয়া হইয়াছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এই ব্যাপারে যে ত্বরিত ব্যবস্থা ও তত্পরতা দেখাইতেছে তাহা বিশেষভাবে তাত্পর্যপূর্ণ বটে।

মনে রাখিতে হইবে, আর সব ভাইরাসজনিত জ্বরের মতোই ইহার কোনো নির্দিষ্ট চিকিত্সা নাই। প্রচুর পানি, শরবত, ওরস্যালাইন ও ডাবের পানি পান করিতে হবে। জ্বরের জন্য একমাত্র ঔষধ হইল প্যারাসিটামল। যেহেতু এডিস মশাই এই রোগের বাহক, সুতরাং মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করাটাই হইল সবচাইতে বড় প্রতিরোধ। ডেঙ্গুবাহী এডিস মশা কেবল স্বচ্ছ পানিতে জন্মাইলেও চিকুনগুনিয়াবাহী এডিস মশা স্বচ্ছ ও ময়লা—উভয় প্রকার পানিতেই জন্মায়। সুতরাং মশাবাহিত এই রোগ হইতে মুক্তি পাইতে হইলে প্রত্যেকের নিজ নিজ বাড়ির আঙ্গিনাসহ সর্বত্র পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখিতে হইবে।

সূত্র: ইত্তেফাক

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত