ডা. মিথিলা ফেরদৌস

ডা. মিথিলা ফেরদৌস

বিসিএস স্বাস্থ্য

সাবেক শিক্ষার্থী, রংপুর মেডিকেল কলেজ। 


০৫ জুন, ২০১৭ ০৯:০৫ পিএম

ডাক্তারদের সন্মান ডাক্তারদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে

ডাক্তারদের সন্মান ডাক্তারদেরকেই নিশ্চিত করতে হবে

থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় আম্মাকে একবার এক অর্থোপেডিক্সের স্যারের কাছে নিয়ে গেলাম, আমি সাধারণত পরিচয় দিতে চাই না। কিন্তু স্যার নিজেই বললেন,

---তুমি আমাদের স্টুডেন্ট না?

তখন উত্তর দিলাম। সন্ধানী করার সুবাদে অনেকেই চিনতেন। এরপর উনি আম্মাকে একটা এক্সরে করতে দিলেন কোন চিকিৎসা দিলেন না। কিন্তু ভিজিটের পুরা টাকাই নিলেন। আম্মার সমস্যা কোন গুরুতর কিছু ছিলো না। যাই হোক টাকার জন্যে না। কিছু টা মন খারাপ হয়েছিল, একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে একটু স্নেহ তো আশা করতেই পারি, আর মায়ের কাছে নিজে যে কিছু অর্জন করেছি তা দেখাতে কার না ইচ্ছা করে? তাছাড়া তখন এথিক্স গুলাও কিছু পড়া ছিলো। এই স্যার পরে আমার জীবনের ভয়ংকর দুইটা দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী ছিলেন, তা আর উল্লেখ করতে চাইনা।

ডাক্তার হবার পর একজন নামকরা শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে লম্বা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে, তারপর বাবুকে স্যারকে দেখাইছিলাম, তিনিও আমার স্যার আমাকে চিনতেন। তারপরও ভিজিট নিয়েছিলেন। কিন্তু রংপুরের আরও দুইজন বিখ্যাত স্যার বাবুকে নিয়মিত দেখতেন, অনেক সময় আমি নিজেও যাইনি তবুও ভিজিট তো নেন নাই, আবার বাবুকে খুব আদর করতেন, তারা হলেন, নুরুল আবছার স্যার আর বিকাশ মজুমদার স্যার। স্যার, সারাজীবন আমি আপনাদের ঋণ কখনই শোধ করতে পারবো না।

রংপুরে আর কোন স্যার, ম্যাডাম কখনও কোনদিনও টাকা নেন নাই এমনকি আম্মার অপারেসানে বা আমার সিজারেও না।

ঢাকায় আমার শ্বাশুরির দুই বার অপারেশন হয় একবার চোখের ক্যাটারেক্ট, আরেকবার হিস্টারেক্টমি, দুইবারেই সার্জন পুরা টাকাই নিয়েছিলেন। যদিও আমার জামাইরা দুই ভাই ডাক্তার।

সার্জারি এর এক ভাইয়া মারা গিয়েছিলেন মাল্টিপল মায়োলোমায়, তার বউ ও ডাক্তার। একদিন আপু আমার কাছে খুব কেঁদে গল্প করেছিলেন, নাম করা একজন প্রফেসার কে দেখাতে রাত দুইটা পর্যন্ত সিরিয়ালে বসে থাকতে হয়েছিলো অসুস্থ স্বামী নিয়ে। অনেক অনুরোধ শর্তেও স্যার আগে দেখেননি।

এক আপুর কাছে গল্প শুনেছি ঢাকার একজন নাম করা গাইনিকোলজিস্টের উনি ডাইরেক্ট ইন্টার্ন ছিলেন, ওই ম্যাডাম উনার সিজার করতে মাত্র দুই হাজার টাকা কমাইছিলেন। কি মহানুভবতা!

যে কোন হাসপাতালে যান, ডাক্তার পরিচয়ে দিয়ে দেখেন, আপনার স্বজাতি জুনিয়র অথবা সিনিয়র কিছু আছে তাদের ব্যবহার দেখলে খুব অবাক হবেন। এরা কখনই ভাবেনা এদেরও কখনও কারো দরকার হতেই পারে। বিশেষ করে ইদানিং জুনিয়রদের ব্যাবহার দেখলে বেশি খারাপ লাগে।

কিন্তু আপনি যদি ডাক্তার ছাড়া অন্য পরিচয় দেন মনে করেন, ডিজি অফিসের কেরানী, গণভবনের কেরানী, ওয়ার্ড কমিশনার, সাংবাদিক, পুলিশ তাহলে দেখবেন তারা কি করে? এদের মান সন্মান বোধ দেখেলে নিজেরও লজ্জা লাগে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোন এক মেডিকেল কলেজে এক ডাক্তার দম্পতি গিয়েছিলেন ইঞ্জুরি নিয়ে। তখন নাকি সেখানকার মেডিকেল অফিসার বা ইন্টার্ন অন্য রুগী নিয়ে খুব ব্যাস্ত ছিলেন। ওই ডাক্তার নিজেই তার বউ এর ইঞ্জুরীতে স্টিচ দিতে চেয়েছিলেন, সেটাও কেউ এরেঞ্জ করে দেয়নি। খুব দুখজনক ঘটনা। এইটা ডাক্তার না হয়ে উপরোক্ত যাদের বর্ণনা দিয়েছি তারা হলে কি করতো তারা? স্যার স্যার করে সব ফালায় করে দিতে বাধ্য হতো।
আমি প্রতিদিন গড়ে ৮/১০জন ডাক্তার বা ডাক্তারের আত্মীয়স্বজন দেখি। খুব যত্ন নিয়েই দেখার চেষ্টা করি। চেষ্টা করি হাসপাতালের পরিক্ষায় ডায়াগনোসিস কনফার্ম করতে। একান্ত যদি হাসপাতালে না হয়, যদি বাইরে পরীক্ষা করাতে হয়, যতদূর সম্ভব ডিস্কাউন্ট লিখে দেই। আমার পক্ষ থেকে চুড়ান্ত আন্তরিকতা দিবার চেষ্টা করি। কেনো জানেন?

এই ডাক্তাররা প্রতি পদে পদে হেনস্তার স্বীকার হয়। ডিজি অফিসে ফাইল যারা নিয়ে যায়, তাদের সাথে কথা বলতে ১০০ টাকা হাতে ধরায় দিতে হয়, কাজের জন্যে আলাদা হিসাব। আর কেরানীদের কথা কি বলবো। নাম বলবো না। আপনারা সবাই চিনেন। বদলী বাণিজ্যে এদের রমরমা অবস্থা। এরা ডাক্তাদের মানুষ মনে করেনা। ডাক্তারাও পারলে এদের স্যার ম্যাডাম ডাকে। আমি নিশ্চিত এরা যেকোন ডাক্তারকে দেখাতে সিরিয়াল বা ভিজিট লাগেনা। এই হইলাম আমরা। কতটা নির্লজ্জ ভাবতে পারেন?

মিনিস্ট্রি এর রেট তো আরও চড়া।এ প্রসঙ্গে আরেকটা জায়গার কথা না বললেই না, সেই টা হলো, বিসিপিএস এর কেরানী। ওহ! মাগো কি আর বলবো, আমাদের টাকায় তাদের ফুটানী। এত দুঃখেরর কথা লিখতে গেলে মহা কাব্য হয়ে যাবে।

যাই হোক ডাক্তার পরিচয়ে যান আপনার ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে কি করে দেখেন? মোট কথা ডাক্তার পরিচয় দিলে সবাই আপনার কাছে ফ্রী কিভাবে চিকিৎসা নেয়া যায় তার ধান্দা করবে। আরে আপনি তো নিজের প্রোফেশনের লোকদের কাছেই সুবিধা পান না। অন্যদের আর কি দোষ দিবেন?

আমাদের প্রোফেশনের লোকদের জন্মগত মেরুদন্ডেই সমস্যা। নিজেদের মধ্যে একতা বোধ তো নাই সন্মানবোধও নাই। যা সব প্রফেশনেই কম বেশি আছে।

এইজন্যেই সবাই আমাদের নিয়ে মজা পায়, স্বাভাবিক। আপনারা তো নিজেরাই নিজেদের সন্মান দেন না অন্যরা কেনো দিবে?

আমি জানি, এই লেখাতে কিছুই হবেনা, স্বভাব কি পালটানো যায়? তবুও অনুরোধ করবো জুনিয়রদের। হ্যাঁ ডিগ্রী হইছে তাই বলে সিনিয়রদের অসন্মান করার ডিগ্রীও কি ফ্রি দিয়ে দেয় নাকি? সবাই অবশ্য এমন না। এখানে পারিবারিক শিক্ষার একটা ব্যাপার থাকেই।

আর সিনিয়রদের কাছে অনুরোধ করবো, স্যার আপনারা ভিজিট নেন অসুবিধা নাই। কিন্তু কিছু জায়গায় সিস্টেম পাল্টান। অন্তত ডিজি অফিস, বিসিপিএস, ছোটবড় সব হাসপাতালে চিকিৎসকদের সন্মান নিশ্চিত করুন। না হলে নিজেদের পতন এভাবে নিজেদের দিনের পর দিন দেখে যেতে হবে।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না