ঢাকা মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ১২ ঘন্টা আগে
ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ

ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ

এমবিবিএস (ডিএমসি), এফসিপিএস (মেডিসিন), এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি - বারডেম), এফএসিই

মেডিসিন, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোনরোগ বিশেষজ্ঞ

সহকারী অধ্যাপক (ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি)

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল


০২ জুন, ২০১৭ ২০:৫৪

বাংলাদেশে এন্ডোক্রাইনোলজি চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত

বাংলাদেশে এন্ডোক্রাইনোলজি চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত

সাবজেক্টটা হলো এন্ডোক্রাইনোলজি, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোন নিয়ে কাজ করে। এই সাবজেক্টের মধ্যে বিভিন্ন গ্ল্যান্ড আছে যেটাকে হরমোনগ্রন্থি বলি। হরমোন গ্রন্থির মধ্যে একটা হলো পিটুইটারি গ্ল্যান্ড যেটা মাথার মধ্যে থাকে। আরেকটা হলো অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ড যেটা পেটের মধ্যে থাকে। অন্যান্য হরমোন গ্রন্থিগুলো হল থাইরয়েড, প্যারাথাইরয়েড, প্যানক্রিয়াস, ওভারি, টেস্টিস। এই গ্ল্যান্ডগুলো থেকে বিভিন্ন হরমোন তৈরি হয়ে থাকে। হরমোন রোগ বিদ্যার মধ্যে যে ব্যাপারগুলো থাকে তার মধ্যে একটি হচ্ছে টিউমার ফরমেশন।

 

স্বাভাবিকভাবে একটা মাত্রায় হরমোন তৈরি হয়, কিন্তু কখনো কখনো এই টিউমারের কারণে বা অন্য আরো কারণে বেশি মাত্রায় হরমোন তৈরি হয়। যেটা আমাদের শরীরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

 

এই এন্ডোক্রাইনোলজির মধ্যে একটা বড় ডিজিস হচ্ছে কুশিং সিন্ড্রোম। অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ডের একটা হরমোন আছে, সেটা হলো কর্টিসোল। কর্টিসোল হরমোন অতিরিক্ত তৈরি হওয়ার জন্য এই রোগটা হয়। কর্টিসোল হরমোন অতিরিক্ত তৈরি হয়ে মানব-শরীরে যেসব জটিলতা তৈরি করে, তার মধ্যে ব্লাড প্রেসার বেড়ে যাওয়া, শরীরে লবনের তারতম্য দেখা দেয়া (ইলেকট্রোলাইটিং ব্যালান্স), হার্টের রোগ দেখা দেয়া, ডায়াবেটিস হওয়া, চোখের ছানি পড়া, ব্রেইন স্ট্রোক হওয়া, হাড় নরম হয়ে যাওয়া (অস্টিওপরোসিস)অন্যতম।

 

এটা একটা ভয়াবহ রোগ, কিন্তু যদি সঠিক সময়ে ধরা পড়ে, তাহলে এটা সম্পূর্ন নিরাময়যোগ্য। এইরোগ র্নিণয় (ডায়াগনসিস) খুবই ইমপর্টেন্ট এবং ক্রিটিক্যাল।

 

ডায়াগনোসিসের কিছু লেভেল আছে।

 

প্রথম লেভেল হচ্ছে, শরীরে কর্টিসোল হরমোনটা বেশি তৈরি হচ্ছে, তা নিশ্চিতকরণ। ৩ ধরনের হরমোন পরীক্ষা করে এটা নিশ্চিত করি আমরা।

 

এগুলো হল বিডনাইট সেলাইবেরী কর্টিসোল, টোয়েন্টিফোর আওয়ারস ইউরিনারি ফ্রি কর্টিসোল, অভারনাইট ডেক্সামেথাসোন সাপ্রেশন টেস্ট। এসব বায়োকেমিক্যাল টেস্ট আমরা ল্যাবরেটরি থেকে করে থাকি । রক্ত এবং প্রস্রাব থেকে এভাবে আমরা র্নিণয় করতে পারি যে হরমোন বেশি তৈরি হচ্ছে। হরমোন বেশি তৈরি হলে আমাদের মনে তখন প্রশ্ন আসে যে, আসলে কোথা থেকে হরমোন আসছে। আমাদের শরীরের কয়েকটা অংশ আছে যেখান থেকে টিউমার তৈরি হয়ে এই বাড়তি হরমোন আসতে পারে, আবার বাইরে থেকে কেউ হরমোন খেলেও একজোজিনাস কুশিং সিন্ড্রোম হতে পারে। যেমন বাতরোগের জন্য, চর্মরোগের জন্য, শ্বাসকষ্টের জন্য, অথবা অনেকে রুচি বাড়ানোর জন্য, মোটা হওয়ার জন্য প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে এই হরমোন খেয়ে এই রোগ ডেকে আনে।

 

কিন্তু শরীরের ভেতর থেকে যখন বাড়তি হরমোন আসে, তখন তাকে এন্ডোজিনাস কুশিং সিন্ড্রোম বলে। একই সাথে প্রশ্ন আসে কোথা থেকে এই হরমোন তৈরি হচ্ছে।

 

তো হরমোন তৈরি হতে পারে- অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ড থেকে যা দুটো কিডনির ও পরে টুপির মত বসে থাকে, এই এড্রিনাল গ্ল্যান্ডে টিউমার তৈরি হয়ে অতিরিক্ত হরমোন আসতে পারে। যেটাকে আমরা বলি এড্রিনাল কুশিং। আরেকটা হলো- আমাদের ব্রেনের মধ্যে একটা গ্ল্যান্ড আছে, যেটা কেবলি পিটুইটারি গ্ল্যান্ড। এই পিটুইটারি গ্ল্যান্ড থেকে অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ডকে নিয়ন্ত্রন করে এমন একটা হরমোন তৈরি হয়, যেটাকে আমরা বলি এসিটিএইচ (এড্রিনোকর্টিকোট্রপিক হরমোন) । পিটুইটারি গ্ল্যান্ড এর মধ্যে যদি কোন টিউমার হয়, সেটা থেকে অতিরিক্ত এসিটিএইচ তৈরি হতে পারে। এই হরমোনটা অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ডকে প্রভাবিত করে অতিরিক্ত কর্টিসোল হরমোন তৈরি করে। শরীরের অন্যান্য যায়গায়, যেমন- ফুসফুস, প্যানক্রিয়াস কিংবা লিভারের মধ্যে টিউমার হয়, যেখান থেকে অতিরিক্ত এসিটি এইচ তৈরি হতে পারে। এই এসিটিএইচ হরমোন এসে আবার অ্যাড্রিনাল গ্ল্যান্ড কে স্টিমুলেট করতে পারে এবং ফাইনালি কর্টিসোল হরমোন বেড়ে যায়।

 

তো আমরা প্রায়ই দেখি, কোত্থেকে হরমোনটা আসছে, সেটা আইডেন্টিফাই করতে ব্যর্থ হতে হয়। ফলে রোগ ধরতে দেরি হয় এবং রোগির জটিলতা বেড়ে যায়, এমনকি রোগী মারাও যেতে পারে।

 

এই যে সোর্স আইডেন্টিফিকেশন, সেটা করতে স্পেশাল টেকনোলজির দরকার হয়। এই টেকনোলজিকেই বলে আইপিএসএস। অথবা বড় করে যদি বলি bilateral simultaneous inferior petrosal sinus sampling-BSIPSS

 

এই এডভান্সড টেকনোলজিটার প্রয়োগ বাংলাদেশে আমরা ফাস্ট টাইম করেছি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আমরা যদি সময়মত সঠিকভাবে আইডেন্টিফাই করতে পারি, কোথা থেকে হরমোনটা আসছে এবং শুরুতেই যদি অপারেশন করে ফেলি তাহলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠবে। এই ডায়াগনোসিসের জন্য হার্টের রোগ নির্নয়ের যে ক্যাথল্যাব তা ব্যবহার করতে হয়। আমরা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টরা যেটা করি তা হচ্ছে, একটা প্রটোকল তৈরি করি, পরীক্ষাটা কি ভাবে হবে। ব্রেনের একটা নির্দিষ্ট স্থান (ইনফেরিওর পেট্রোজাল সাইনাস) থেকে ব্লাড কালেক্ট করা হয় যে ঐখান থেকে হরমোনটা আসছে কিনা সেটা কনফার্ম করার জন্য।

 

এই কার্ডিওলজি ক্যাথল্যাবে এনজিওগ্রাম যে ভাবে করে, সেভাবে ফিউমোরাল রুটে একটা চিকন নলের মত যায়। ইনফেরিওর ভেনাকাভা হয়ে জুগুলারভেইন এর ভিতর দিয়ে ব্রেনের ভেতরে ইনফেরিওর পেট্রোজাল সাইনাস- যেটা পিটুইটারি গ্লান্ড থেকে রক্ত ড্রেইন করে । ইনফেরিওর পেট্রোজাল সাইনাস পর্যন্ত ক্যাথাটারটাকে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ওখান থেকে ব্লাড স্যাম্পল ড্র করা হয়। দুপাশ দিয়ে ইক্যাথাটার ঢুকিয়ে ব্রেনের দুপাশ থেকে ইব্লাড ড্র করা হয় এবং সাথে সাথেই পেরিফেরাল ভেইন থেকে একটা স্যাম্পল নিয়ে থাকি। এরকম ভাবে আমরা তিনটা স্যাম্পল কমপেয়ার করি এবং যে ব্লাড টেস্টটা করা হয়, সেটা কেবলি এসিটিএইচ। অনেক সময় ব্রেনের মধ্যে টিউমার মিলিমিটার আকারে খুবই ছোট থাকায় ৩০-৪০ ভাগ ক্ষেত্রে এমআরআই করে ধরা নাও পড়তে পারে। কিন্তু আইপিএসএস টেকনোলজি ব্যবহার করে আমরা সেটা ধরতে পারছি। আমরা তখন সেই রোগীকে নিউরো-সার্জনের কাছে পাঠাই। উনি অপারেশন করে রোগীকে সুস্থ করে তুলতে সক্ষম হন। ঢাকা মেডিকেলে এটা প্রথম আমরা করি ২০১১ সালে। তার পর থেকে নিয়মিতই এ পরীক্ষা করে যাচ্ছি কিন্তু সেভাবে প্রচার পায়নি। আমরা জার্নালে প্রকাশ করেছি, কিন্তু জার্নাল তো সেভাবে প্রচার পায়না। এধরনের টেস্ট করে সাধারনত ইউরোপ আমেরিকা-সিঙ্গাপুরে রোগ নির্নয় হয়ে থাকে।

 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এটার প্রয়োগ চলছে। রোগীরা সর্বাধুনিক এবং উন্নত সুবিধা পাচ্ছেন। শুরু থেকেই আমরা নিউরোলজিস্ট ও নিউরোসার্জনদের সর্বাত্মক সহযোগিতা পাচ্ছি যারা প্রেকটেক্যালি কাজটি করতে হেল্প করেন। আমরা এন্ডোক্রাইনোলজিস্টরা প্রটোকল সেট করি কখন ব্লাড টানা হবে, কিভাবে ব্লাড টানা হবে, কি টেস্ট হবে, টেস্টের রেজাল্ট ইন্টার প্রিটেশন এবং ডিসিশন মেকিং এ ভূমিকা রাখি। আমরা নিয়মিতভাবে ঢাকা মেডিকেলে এই টেস্ট করছি এবং রোগীরা উপকৃত হচ্ছেন। একই সাথে চেষ্টা করছি অন্যান্য মেডিকেল কলেজ যেখানে কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব আছে, সেগুলোকে কাজে লাগিয়ে এই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে। কার্ডিয়াক ক্যাথল্যাব- এর সাথে এজন্য মাত্র ৫/৭ হাজার টাকার প্রযুক্তি যোগ করতে হয়। নতুন ক্যাথাটার হলে অবশ্য দাম অনেকটা বেড়ে যায়।

 

টেস্টের খরচ: রোগীদের খরচও মাত্র ৫/৭ হাজার টাকা এই জীবন রক্ষাকারী প্রযুক্তির জন্য।

 

ডা. ইন্দ্রজিৎ প্রসাদ

এমবিবিএস (ডিএমসি), এফসিপিএস (মেডিসিন) এমডি (এন্ডোক্রাইনোলজি-বারডেম) এফএসিই

মেডিসিন, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোনরোগ বিশেষজ্ঞ

সহকারী অধ্যাপক (ডায়াবেটিস ও এন্ডোক্রাইনোলজি)

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত