ডা. শামসুল আলম

ডা. শামসুল আলম

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী চিকিৎসক,

সাবেক শিক্ষার্থী, ওসমানী মেডিকেল কলেজ, সিলেট। 


২৯ মে, ২০১৭ ০৯:১৯ পিএম

"কষ্টের ডায়েরী"

কষ্টের ডায়েরী

মানুষগুলো বছরের পর বছর সব সিনেমায় একই ডায়লগ শুনেছে,

ডাক্তার : এই মুহূর্তে এক লক্ষ টাকা না হলে আপনার মাকে বাঁচানো যাবে না।
নায়ক : দয়া করুন ডাক্তার সাহেব, এতো টাকা আমি এখন কোথায় পাবো ?
ডাক্তার : আমি কি করে বলবো, টাকা না হলে আপনার মাকে বাঁচানো যাবে না। 

এরপর দেখা যায় নায়ক, মা ..আ ...আ ....বলে একটা চিৎকার দিয়ে রক্ত বেঁচতে চলে যায়।

(সব সময় কেন এক লাখ টাকাই লাগে, আর নায়ক রক্ত বিক্রি করে কি করে এক লাখ টাকা জমায় এই প্রশ্ন আর কেউ করে না কিন্তু এভাবেই মানুষ সারা জীবন দেখেছে সামান্য কিছু টাকার জন্য ডাক্তাররা কত নায়কের মাকে মেরে ফেলছে)

আজ যদি হুমায়ুন আহমেদ স্যার জীবিত থাকতেন তাহলে বলতাম, "স্যার, প্লিজ! আপনি আমাদের জন্য একটা সিনেমা তৈরি করে দিন"

আপনাকে একটি সত্য গল্প দিচ্ছি ,একটি নবীন ডক্টর যুগল আর তাদের মেয়ে টুনটুনির গল্প, আপনি একটা সিনেমা করে দিবেন, মানুষগুলো একটু দেখুক কিছু জীবনের গল্প।

রায়হান আর শিউলি ইন্টার্নি শেষ করেছে দেড় বছর হলো, গত এক বছর ধরে দুজনেই অনারারি করছে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হসপিটালে (যারা ডাক্তার নন তাদেরকে বলছি, সরকারি হাসপাতালের অনারারি ডাক্তারগণ কোনো বেতন পান না, তারা ফ্রি সেবা দিয়ে থাকেন, বিনিময়ে বছর শেষে শুধু একটা ট্রেনিং সার্টিফিকেট দেয়া হয় )

রায়হানের কথা-

শিউলির জন্য আমার প্রায়ই মন খারাপ হয়, মেয়েটিকে বলতে গেলে কিছুই দেয়া হয়নি, সেই ইন্টার্নির শুরুতেই বিয়ে করতে হলো, ব্যাংক আর বন্ধু দের লোন মিলিয়ে কোনোরকম মেনেজ করেছি, মূল গয়নার সেটটা আবার শিউলির এক বান্ধবীর কাছ থেকে হাওলাত করা, ফিরিয়ে দেয়ার সময় বলেছিলাম কিছু টাকা হলে এইরকম একটা সেট ওকে কিনে দিবো, কিন্তু সেই দিন আর আসেনি, আসলে বাবার এত অল্প আয়, ছোট বোন দুইটার পড়াশুনা আর ঢাকা শহরে ভাড়া বাসায় থাকা এত সহজ নয়। অনারারি করে ভালো ভাবে ক্লিনিক ডিউটিও করা যায় না, বউটা কেমন করে যেন সব মানিয়ে নিয়েছে, গাইনিতে অনারারি করছে, আবার ক্লিনিকেও ডিউটি করে, মানুষের সাথে এই ভিড়ের মাঝে পাবলিক বাসে করে আসা যাওয়া করে দেখলে খুব মায়া লাগে, কিন্তু কিছু করার নেই, এটাই জীবন। বিয়ের আগে বলেছিলাম, ওকে কাঞ্চনজংগা নিয়ে যাবো, কিন্তু কবে? কুমিল্লার নীলাচলেই এখনো নিয়ে যেতে পারিনি। বড় ভয় হয় কবে যেন স্বপ্ন গুলো সব হারিয়ে যায়।

শিউলির কথা-

না, রায়হান কে নিয়ে আমি অনেক সুখী, বাবা- মা একটু আপত্তি করেছিলেন, ইয়ারমেট, কোনো উচ্চতর ডিগ্রি নেই, সরকারি চাকরি নেই, এই ছেলে খাওয়াবে কি? কিন্তু আমার ইচ্ছেকেই তারা শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছেন। সেই কোনদিন থার্ড ইয়ারে ছেলেটাকে বলেছিলাম, আমার প্রিয় রং সাদা, সাদা ফুল আমার প্রিয় ফুল। কিছুদিন পর রায়হান বই পত্র খুঁজে, গুগল থেকে কালেক্ট করে সারা পৃথিবীর একশটি সাদা ফুলের ছবি প্রিন্ট দিয়ে এলবাম করে দিয়েছিলো। এই ছেলেটাকে আমি কি করে ফিরিয়ে দেই। মানুষের প্রতি ওর যে অনেক ভালোবাসা, ওর হাসি দেখলেই বোঝা যায়। রুগীর লোক কত যন্ত্রনা করে কিন্তু রায়হানকে কখনো দেখিনি রেগে যেতে, ওর কথা একটাই মানুষগুলো বড় বিপদের সময় আমাদের কাছে আসে, ওদের সাথে রাগারাগি করে আর কি লাভ।রায়হানকে ভালো না বেসে আমি আসলে থাকতে পারিনা। মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়, অনারারি, ক্লিনিকের ডিউটি সব মিলিয়ে এত ব্যাস্ত ওকে একটু আলাদা করে সময় দিবো তাও পারিনা। আশায় বুক বেঁধে থাকি এই দিনগুলো এমন থাকবে না।

টুনটুনির গল্প-

বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই শিউলি কনসিভ করে ফেললো, দুজনেই কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও মেনে নিয়েছিলো, ভাবলো ভালোই হয়েছে, একটা ছোট্ট মেয়েকেতো তারা কতদিন কল্পনা করেছে, সেও হয়তো বাবা-মা কে দেখতে পথ চেয়ে বসে আছে। নামটা লানিকা রেহনুমা হলেও সে আসলে বাবার টুনটুনি। বাবা মাকে সে পায়না ঠিকমত, সকাল -বিকেল, রাত সব সময়েই তারা ব্যাস্ত, ডিউটি আর না হয় পড়াশুনা। দাদু-নানুর কাছেই বড় হয়ে যাচ্ছে, দুইবছর হয়ে গেলো, দাদুর হাতেই খাওয়া-দাওয়া গোসল। সর্দি -কাশি -জ্বর দাদুকেই মেনেজ করতে হয়। গত কয়েকদিন থেকে আবার টুনটুনির জ্বর, দাদু দিয়ে যাচ্ছেন প্যারাসিটামল আর কাশির ঔষুধ। কিন্তু সেই রাতে দাদুর মনে অজানা আশংকা, টুনটুনিকে ভালো মনে হচ্ছে না, রায়হান এডমিশন ওটি নিয়ে বিজি, শিউলির ক্লিনিকের নাইট ডিউটি। পরদিন সকালে ওরা মেয়েকে নিয়ে গেলো বাসার পাশের ক্লিনিকে, একজন শিশু ডাক্তার দেখে বললেন নিয়ে যেতে শিশু হসপিটালে, অবস্থা বেশি ভালো না, কি হলো? সিভিয়ার ক্রুপ কিংবা নিউমোনিয়া? রেসপিরেটরি সাপোর্ট দিয়েও লাভ হয়নি, টুনটুনি মামনি মারা যাওয়ার সময় বাবার হাতটাই ধরে ছিলো।

দুজনের জীবন-

আবার দুজন, চার মাস হয়ে গেছে, তবুও এক মুহূর্তের জন্য ভুলে থাকা যাচ্ছে না, রায়হান শুধু ভাবে, সারাদিন মানুষের বুকে স্টেথো দিয়ে পরীক্ষা করি অথচ নিজের মেয়েটার বুকে স্টেথো দিয়ে একটু শুনা হয়নি কি হয়েছিলো, মেয়েটা কি ক্ষমা করবে? শিউলি ভাবে সারাদিন কত মেয়েরা মা হয়, জন্মের পর কত মায়েদের সন্তান কোলে তুলে নিতে হয়, অথচ নিজের মেয়েটা এইভাবে চলে গেলো।

আজ অনেক দিন পর শিউলি ইচ্ছে করেই রায়হান কে একটু জড়িয়ে নিলো, তারপর শুরু হলো দুজনের কান্না, এত দিনের জমে থাকা সব কান্না। আজ ওরা কান্না করুক, এই কান্না যদি ওদের একটু শক্তি দেয়।

কেউ যদি আমার এই ভাইটির গায়ে হাত তোলে, অকারণে মারে, কেউ কি একটু ভেবেছেন ছেলেটা আর কি নিয়ে বাঁচবে?

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত