শেখ আদনান ফাহাদ

শেখ আদনান ফাহাদ

সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


২৭ মে, ২০১৭ ১০:৪০ এএম

ডাক্তার পেটানো আর হাসপাতাল ভাংচুরের এ কোন সংস্কৃতি!

ডাক্তার পেটানো আর হাসপাতাল ভাংচুরের এ কোন সংস্কৃতি!

কষ্ট, পরিশ্রম আর জীবন-মৃত্যু সংক্রান্ত স্পর্শকাতরতার হিসেবে ডাক্তারি পেশার সাথে আর কোনো পেশার তুলনা চলে না। আমাদের দেশে কর্মঘণ্টার হিসাবে আর দুটি পেশার সাথে ডাক্তারের পেশার একটু তুলনা করা যায়। এরা হলেন পুলিশ ও সাংবাদিক। যদিও সাম্প্রতিককালে ডাক্তারদের মধ্যে সাংবাদিকবিরোধী মনোভাব প্রকট। তবে এক্ষেত্রে কোন কোন বিষয়ে সাংবাদিকদের একটা অংশের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকাও অনেকাংশে দায়ী। শুধুই নেতিবাচক বিষয়ে সাংবাদিকতা করায়, এদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো শুধু ডাক্তার না, সাধারণ মানুষের কাছেও কোন কোন বিষয়ে প্রশ্নবিদ্ধ। আবার কোন কোন ডাক্তারের কথাবার্তাও খুব আপত্তিজনক। এদের কথা শুনে মনে হয়, পুরো সাংবাদিক সমাজকেই তারা প্রশ্নবিদ্ধ করছেন, এটা অপমানজনক। দুটো জনগুরুত্বপূর্ণ পেশার মধ্যে এত দ্বন্দ্ব কাম্য নয়। যাই হোক, কর্মঘণ্টার কোনো হিসাব না থাকায় ডাক্তার, পুলিশ, সাংবাদিক- এদের মধ্যে আমি একটা তুলনা খুঁজে পাই।

ডাক্তারদের ছুটি এক অর্থে নাই বললেই চলে। সরকারি হাসপাতালে সপ্তাহে একদিন ছুটি, তাও জরুরি অবস্থায় সে ছুটিও বাতিল করা হয়। ২৪ ঘণ্টাই কোন না কোন ডাক্তার সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মাঝরাতে উঠে দৌড় দিতে হয়। প্রতিদিনই পালাক্রমে ডাক্তাররা নাইট ডিউটি করে থাকেন। সাংবাদিক আর পুলিশেরও তাই। পুলিশের ছুটিও যে কোন সময় বাতিল হতে পারে। সাংবাদিকরাও ছুটি পান না তেমন। ডে অফও যে কোন পরিস্থিতিতে বাতিল হতে পারে। তবে পেশার ব্যস্ততা, কষ্ট, কাজের ধরন, অনিরাপত্তা, পাবলিকের ‘মাইর’ খাওয়ার আশঙ্কা, সময়ের বেহিসেব, সব মিলে ঝুঁকি আর কষ্টের বিবেচনায় ডাক্তারি পেশার ধারেকাছেও অন্য কোন পেশা আছে বলে আমি মনে করি না। যারা ডাক্তারদের টাকা পয়সা নিয়ে খুব কথা বলেন, তাদেরকে বলছি, একটু খোঁজ নিয়ে দেখুন, ডাক্তাররা ঠিক কোন স্টেজে এসে টাকা কামাই শুরু করেন। বড় বড় বেসরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের ফি নিয়ে অনেকের আপত্তি আছে। কম হলে ভালো হতো। কিন্তু প্রাইভেট প্রাকটিসে সরকারি কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই বলেই এই বাড়াবাড়ি। সেখানে সব ডাক্তারকে এক পাল্লায় মাপা মস্ত ভুল। অনেক ডাক্তার আছেন, গরিব রোগী পেলে ফি নিতে চান না। উনাদের চেম্বারের দেয়ালে লেখা থাকে ‘আর্থিক সমস্যা থাকলে আমাকে বলুন’। কমিশন বাণিজ্য নিয়েও অনেক কথা হয়। কিন্তু এখানে যে অসৎ ব্যবসায়ীচক্র মূল দায়ী সেটা অনেকে ভুলে যান। শুধু ডাক্তারদেরকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। এর অন্যতম কারণ, ডাক্তারদের মারলে বা গালি-গালাজ করলে বিচারের সম্মুখীন হওয়ার সম্ভাবনা এদেশে কম। ডাক্তারদের অবস্থা এদেশে নন্দ ঘোষের মতো।

এমবিবিএস করে বিসিএস ক্যাডার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করা একজন ডাক্তারের পেশাজীবন শুরু হয় গ্রামে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চাইতেন ডাক্তাররা গ্রামে গ্রামে গিয়ে এদেশের সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দিবেন। জাতির জনকের অগ্রাধিকার চিন্তায় ছিল এদেশের কৃষক, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষের মঙ্গল নিশ্চিত করা। আর কোন ক্যাডার সার্ভিস আছে, যেখানে সেবা নিয়ে একেবারে গ্রামের মানুষের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন কর্মকর্তারা?। হ্যাঁ, এটা সত্য যে কোন কোন ডাক্তার নিয়মিত অফিস করেন না। এমনও শুনেছি, মাসের বেতন নিতে শুধু জায়গামত সই করার জন্য অনেকে সংশ্লিষ্ট অফিসে মাসে একবার/দুবার যান। তবে এদের সংখ্যা নেহাতই নগণ্য। এমন ফাঁকিবাজি কাম্য নয়। দেশের সব দপ্তরেই এমন ফাঁকিবাজ, অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারি পাওয়া যাবে।

নিয়মিত অফিস করার পরিবেশ থাকে না অধিকাংশ ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে। এসব সাব-সেন্টার মূলত ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার ভিজিটর (এফডব্লিউভি) নামে পরিচিত পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে চাকরি করা নার্স সমমর্যাদার একজন নারী স্বাস্থ্যকর্মীর নিয়ন্ত্রণে থাকে। এই নার্স সমমর্যাদার একজন এফডব্লিউভি এর অফিস থাকে সাজানো গোছানো। যেখানে বিসিএস ক্যাডার একজন ডাক্তার এসে ঠিকমত বসার পরিবেশ পান না। চেয়ার, টেবিলগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভাঙ্গাচোরা থাকে। যদি কারো বিশ্বাস না হয়, তাহলে শহর থেকে কাছেই মানিকগঞ্জ কিংবা আশুলিয়া, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাব-সেন্টারগুলোর একটি ভিজিট করে আসতে পারেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি জায়গা আছে, নাম ক্ষুদ্র ব্রাহ্মণবাড়িয়া। ‘খুদ বাউনবাইরা’ নামে পরিচিত এ গ্রামে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। টাউন থেকে সেখানে যাওয়ার একটা মাত্র রাস্তা। তাও ভাঙ্গা। বর্ষাকালে সেখানে ভয়ংকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ওখানে সপ্তাহে এক/দু দিন শুধু বিসিএস ক্যাডার হিসেবে ডাক্তাররা যাওয়া আসা করেন। বছরের পর বছর চলে যায়, অন্য কোন ক্যাডার সার্ভিসের, স্থানীয় এমপির দেখা পান না এ গ্রামের লোকজন। এমপিরা শুধু নির্বাচনের আগে সেখানে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ তখন ভোটের দরকার হয়। একই রাষ্ট্র, একই সরকার, কাগজে-কলমে একই মর্যাদা, অথচ ডাক্তাররা দূরবর্তী গ্রামে গিয়ে যে চাকরি করেন তার জন্য থাকে না কোন বাড়তি ভাতা, যানবাহন বা নিরাপত্তা সহায়তা। শেরপুরের ভারত-ঘেঁষা ঘনজঙ্গলে যেখানে রাত হলে নেমে আসে বুনো হাতির পাল সেখানে প্রথমশ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি করে শুধু ডাক্তাররাই। গ্যাস সংযোগ নাই, বিদ্যুৎ নাই, পিয়ন-কর্মচারি নাই। আল্লাহ আর গ্রামের মানুষের ভরসার উপর ভিত্তি করে সেসব স্থানে কাজ করে নতুন নিয়োগ পাওয়া ডাক্তাররা। তাও আবার দুই বছরের জন্য। ডাক্তাররা দেশের মানুষের সেবা করার এই সুযোগকে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবেই দেখে থাকেন। কিন্তু অন্যান্য ক্যাডার সার্ভিসের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সুযোগ সুবিধা বাড়ানো কি সরকারের দায়িত্ব নয়? ঢাকায় বসে মন্ত্রী-এমপিরা যে হুঙ্কার ছাড়েন, তা হয়ত দরকারি, পাশাপাশি বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে নানা পদক্ষেপ নেয়াও সমান দরকারি বলে মনে করি।

আর কোন বিসিএস ক্যাডার নিয়মিত যান গ্রামে? যদিও যান, আরামের গাড়ি নিয়ে যান, অনুষ্ঠানের প্রধান বা বিশেষ অতিথি হয়ে যান। একজন ডাক্তার বিসিএস ক্যাডার হয়েও একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে সেবা দেন। সেখানে গ্রামের মেম্বার, মেম্বারের স্ত্রী, মোড়ল, মাতব্বর, সবার ঝাড়ি খেয়ে, কোনো কর্মচারি-পিয়ন, আর্দালি ছাড়া, ভাঙ্গা চেয়ার, টেবিল নিয়ে বসে কাজ করেন বিসিএস ক্যাডার ডাক্তাররা। এর মধ্যে অন্যান্য ক্যাডারের কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অসহযোগিতা আর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ তো আছেই। বিশেষ কয়েকটি ক্যাডারের কর্মকর্তারা বয়স এবং মর্যাদায় অনেক নিচের হওয়া সত্ত্বেও একজন সিভিল সার্জনকে ‘স্যার’ না বলে সাহেব বলে সম্বোধন করেন। ব্রিটিশ কলোনিয়াল আমলের স্টাইল এবং দাপটে চলা এই কর্মকর্তারা নিজেদের সুযোগ সুবিধার সাথে ডাক্তারদের অবস্থার একটু তুলনা করে দেখবেন বলে আশা করি।

ডাক্তারদের কাজের ধরনই এমন যে এখানে সাহেব বা স্যার হয়ে আলিশান অফিসে কর্মচারিদের সেবায় বসে বসে অফিস করার সুযোগ নেই। সকালে ঘুম থেকে উঠে সরকারি হাসপাতালে ৮-২ টা পর্যন্ত আউটডোরে কী পরিস্থিতি বিরাজ করে তা নিজের চোখে না দেখলে কাউকে বলে বোঝানো যাবে না। গিজগিজ করে মানুষ, এদের অধিকাংশই গ্রামের, মফস্বলের সাধারণ গরিব মানুষ। ৫/১০ টাকার টিকেট কেটে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে ডাক্তারের সেবা নেন তারা। প্রতিদিন একেকটি হাসপাতালে কয়েক হাজার মানুষ আসেন সেবা নেয়ার জন্য। একজনকেও ভালোমত সেবা দেয়ার সুযোগ পান না ডাক্তাররা। এত বিশাল সংখ্যক একটি জনগোষ্ঠীর দেশে একজন ডাক্তার দিনে কতজন মানুষকে সেবা দেন তার হিসাব কেউ করেছেন? হোক গ্রামের কমিউনিটি ক্লিনিক কিংবা ল্যাব এইড বা স্কয়ার হাসপাতালের চেম্বার, সবখানেই রোগীর ভিড়। ডাক্তাররা যদি মনোযোগ দিয়ে একজন রোগীকে ভালো করে দেখতে চান, তাহলে বাংলাদেশের কয়জন মানুষ ডাক্তারের সান্নিধ্য পাবেন? যে সরকারি হাসপাতাল নিয়ে, ডাক্তারদের নিয়ে এত সমালোচনা তাদের কাছেই আবার জরুরি চিকিৎসা নিতে এসে বড় বড় আমলারা কী আচরণ করেন, তা ডাক্তারদের সাথে কথা বললেই জানা যাবে। আজকেই, এক্ষনি ‘স্যার’ এর অপারেশন করা লাগবে। ডিসি, এসপি হওয়া লাগে না, উনাদের পিয়ন-আর্দালিরা যে কী পরিমাণ প্রভাব খাটায় তা ভাবলে লজ্জায় সচেতন নাগরিকের মাথা নুয়ে যায়।

হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা দেয়ার দায়িত্ব ডাক্তারের। কিন্তু একজন ডাক্তার কি হাসপাতালের অবকাঠামো, অপারেশন থিয়েটার, হাসপাতালের বেড, ওষুধের সরবরাহ, ম্যানেজমেন্ট, পরিবেশ ইত্যাদির জন্য দায়ী? ডাক্তার ছাড়া হাসপাতালে আর কেউ দায়িত্ব পালন করেন না? নার্সদের যে পরিমাণ তোয়াজ করে চলেন ডাক্তাররা ভাবলে অবাক হতে হয়। আয়া, ওয়ার্ডবয়, প্রশাসনিক দায়িত্বের নানা লোকজন, এরা মিলে যে কী ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তা একজন ভুক্তভোগীই বলতে পারেন। একজন ডাক্তারের ফেসবুক পোস্ট থেকে একটু পরিস্থিতি তুলে ধরছি। সেই ডাক্তার ফেসবুকে লিখেছেন:

‘এক রোগীকে আমরা ছুটি দিলাম। সে যাবে নাবেড নাকি সে কিনেছে পাঁচশ টাকায়! সরকারি হাসপাতালে এই কেনাবেচাটা করে ওয়ার্ডবয় আর আয়ারা। ইমার্জেন্সি থেকে আমার এক আত্মীয়কে তিনতলায় ট্রলি দিয়ে তুলে দিয়েছে এবং নিয়েছে চারশত টাকা। কাজটা করেছে ইমার্জেন্সির আয়া। টাকা দিবেন তো ট্রলি মিলবে নইলে মিলবে না। আউটডোরের এসিবিহীন ওটিতে গরমে দাঁড়িয়ে আমরা একের পর এক ওটি করে দেই। আর বাইরে গিয়ে দাদুরা রোগীপ্রতি বিজনেস করে পকেট ভরে আসে। নাম হয় ডাক্তার টাকা খেয়েছে! ইমার্জেন্সি ওটির বাইরে দুই দফা টাকা দেওয়া নেওয়ার পর রোগী পোস্ট অপারেটিভ রুমে যাবে এর আগে নয়। অপারেশনের আগে রোগী শেভ করেছে তো মরেছেটাকা ছাড়তে হবে নইলে ছয় সেন্টিমিটার চুল নিয়ে রোগী ওটি টেবিলে হাজির হবে। এসব ক্ষেত্রে রোগী জানে ডাক্তার টাকা নেয়। আরো বড় করে জানে সরকারি হাসপাতালেও টাকা দিতে হয়। মিডফোর্ডে এক ঘটনা শুনলাম। অপারেশনের পরে রোগী আমাদের সম্মানিত স্যারকে ১২ হাজার টাকা সাধছেসে নাকি বিশ হাজার টাকা দিতে পারবে না বলে। স্যার তো হতবাক। সরকারি হাসপাতালে আবার টাকা কিসেরপরে শুনেছেন আমাদের এক কর্মচারি স্যারকে দিবে বলে অপারেশন বাবদ বিশ হাজার টাকা চেয়েছে। গাইনীর অবস্থা আরো খারাপ। ওখানে বেসরকারি খালা নামে অদ্ভূত এক সিস্টেম আছে। রোগীর যাবতীয় খোঁজখবর ও দেখাশুনা হাসপাতালের বাইরে থেকে আসা খালারা করে। বিনিময়ে টাকা নেয়। আমরা ইন্টার্ন থাকার সময় সেই সময়কার ডিরেক্টর স্যার এদেরকে ঝেটিয়ে হাসপাতাল ছাড়া করেছিল। এতদিন বাদে শুনছি আবার এসে জুটেছে। লেবার ওয়ার্ড ও অবস ওটিতে যেটা হয় সেটা পুরোপরি সার্কাস। প্রতিটি বাচ্চা বের হবে আর ন্যুনতম পাঁচ শত টাকা দিতে হবে। রোগীর সাথে আসা লোকজন মরা গরিব হলেও রক্ষা নাইপ্রয়োজন হলে পরনের কাপড় বিক্রি করে দিতে হবে। নরম্যাল ডেলিভারি ও সিজার মিলে যদি প্রতিদিন চল্লিশটা বাচ্চা পয়দা হয় তো টাকা পয়দা হবে গড়ে বিশ হাজার। বিরাট বিজনেস। টাকার ভাগবাটোয়ারার ব্যাপারটা অবশ্য ভালো জানি না। যে প্রফেসরের অধীনে কাজ করিউনি একজন ফিমেল সার্জন। কর্মচারিরা বিভিন্ন ফিমেল রোগীকে আত্মীয়পরিচয়ে ম্যাডামের রুমে এনে দেখিয়ে যায়। অথচ আমি নিজে তাদের বাইরে গিয়ে টাকা নিতে দেখেছি। রোগীরা জানে টাকাটা ম্যাডাম নিচ্ছে। রোগীর  Enema দিতে গেলেও প্রতিবার ন্যূনতম তিনশ টাকা দিতে হবে। আমাদের সিস্টেমটা এতটাই জঘন্য হয়েছে যে ভাবতে গেলেও আপনার মাথাব্যথা করবে। অথচ যে ডাক্তারগণ অপারেশন করে বা ওয়ার্ডে পড়ে থেকে ঘামে ভিজে রোগী দেখে এর বেশিরভাগই অবৈতনিক।

উপরের ডাক্তার সাহেবের পোস্ট পড়ে কী মনে হয় আপনাদের? অনেক অপারেশন থিয়েটারে এসি থাকে না, থাকলেও কাজ করে না, পর্যাপ্ত বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকে না। কোটি কোটি টাকায় কেনা মেশিন পড়ে থাকে ইচ্ছাকৃত অবহেলায়। দালাল রোগী ধরে নিয়ে যায় পাশের বেসরকারি কোনো হাসপাতালে কিংবা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে। ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী আর লোভী, অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারিদের যোগসাজশে দালাল শ্রেণি তৈরি হয়। বেড তো দুরের বিষয়, একটা বালিশ নিতেও টাকা নেওয়া হয় রোগীর কাছ থেকে। ডাক্তারদের কোনো ট্রান্সপোর্ট সুবিধা নাই। সবাই শুধু গুটিকয়েক বড় বড় ডাক্তারদের গাড়ি, টাকার বস্তাটাই দেখেন, হাজার হাজার ছোট ছোট ডাক্তারদের কষ্ট কেউ দেখেন না। হাসপাতালের বারান্দায় কেন মুমূর্ষু রোগী শুয়ে থাকবে? এর জন্য কি ডাক্তাররা দায়ী? নাকি সরকারি কর্তৃপক্ষ দায়ী?

বনানীর ঘটনায় পুলিশ যে প্রথমে দুইটা ধর্ষিতা মেয়ের মামলা নিল না, থানা ভাঙ্গতে গেছেন কেউ? ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে গেলে কি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় চেয়ারম্যান বা প্রশ্নকর্তাদের অফিস ভাঙ্গতে যান কেউ? ফাঁস হয়ে যাওয়া প্রশ্ন হাতে পেয়ে থানায় জিডি করতে গেছেন কতজন? ঘুষ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে রাস্তায় নেমেছেন কতজন? যত বাহাদুরি এই অসহায়, অরক্ষিত ডাক্তারদের বেলায়।

ঘটনা ঘটেছে সেন্ট্রাল হাসপাতালে। দুঃখজনকভাবে একটি মেয়ের মৃত্যু হয়েছে। এ মৃত্যু খুবই কতটা বেদনার তা শুধু তার পরিবারই বুঝতে পারছে। কোন ডাক্তারই ভুল চিকিৎসা করেন না বা ভুল করতে চান না। তারপরও ডাক্তার যদি ভুল চিকিৎসা করে থাকে তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালত আছে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আছে। তারা তদন্ত করে দেখবে চিকিৎসা ভুল হয়েছে কি না? অভিযোগ তুলে, গুজব ছড়িয়ে পুরো হাসপাতালে ভাঙচুর করার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে? সেন্ট্রাল হাসপাতালের রোগি হিসেবে মেধাবী ছাত্রী চৈতির মৃত্যু সবার মনে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। যদি মনে হয়, চৈতির চিকিৎসায় ডাক্তারদের গাফিলতি ছিল তাহলে আইনি ব্যবস্থা নিন। তা না করে এভাবে পুরো হাসপাতালে আতঙ্ক সৃষ্টি করা কোনোভাবেই উচিত হয়নি। উদয়ন স্কুলের সামনে একইদিন এক ডাক্তারের গাড়ি ভাঙ্গা হয়েছে। গাড়ির ভেতরে দুটি বাচ্চা ছিল। স্কুলে পড়ে তারা। বাচ্চা দুটির মনে কী এক আতংক সৃষ্টি করে দিয়েছেন ভাঙচুরকারীরা, সেটা অনেকের মগজে ঢুকবেই না।

রোগী মারা গেলে ডাক্তারদের উপর হামলা চালানোর সহিংস সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসতে হবে। আমরা বাসে-ট্রেনে সামান্য তর্ক করা মানুষগুলোকে এড়িয়ে চলি, নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য। আপনার সামনে হয়ত একটা মানুষ বিপদে পড়েছে, আপনি নিজের নিরাপত্তা, স্বার্থের কথা ভেবে ‘অযথা ঝামেলায়’ পড়তে চান না। আর ডাক্তাররা একটা অসুস্থ মানুষকে মৃত্যুর থাবা থেকে বাঁচাতে কাজ করেন। আপনি সারাদিন কয়টা গরিব মানুষকে সেবা দেন? গরিব, নোংরা মানুষ কাছে গেলেই দূর দূর করেন। অথচ ডাক্তাররা গরিব-ধনী দেখেন না, মা-বাবা ডেকে সেবা দেয়ার চেষ্টা করেন। হ্যাঁ, এটা সত্য, অনেক সরকারি হাসপাতালে কিছু ডাক্তার হয়তো কথা বলেন না, কিংবা অনেক প্রশ্নের জবাব দিতে চান না। একটা কিছু কথা জিজ্ঞেস করলে হয়তো রাগ করেন। এর জন্য আমাদের দায়ও কম না। সামান্যতম সম্মান দেখিয়েও আমরা কথা বলিনা। অথচ অন্য কোন সরকারি অফিসে গেলেই আমাদের রূপ পাল্টে যায়। কর্মকর্তার সামনে ‘জো হুজুর’ টাইপ আচরণ করি।

এদেশের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে অনেক অসঙ্গতি আছে। রাষ্ট্রকে এটা স্বীকার করে, অসঙ্গতি দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে। খালি হুঙ্কারে কাজ হবে না। সব সুবিধা দেয়ার পরও, কিংবা সীমিত সুবিধার মধ্যেও যদি কোনো ডাক্তার অমানবিক আচরণ করেন বা ইচ্ছেকৃত গাফিলতি করেন তাহলে অবশ্যই আইনের হাতে সোপর্দ করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। ডাক্তারের মাথা ফাটিয়ে এর সুরাহা হবে না। আমি আপনি সহিংস হলে, ডাক্তাররাও পাল্টা কোন ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। এখানে সুব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের, সরকারের।

সূত্রঃ চ্যানেল অনলাইন.কম

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত