ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

লেখক, কলামিস্ট

বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ।


২৫ মে, ২০১৭ ০৭:৪৯ এএম

দেশের আইসিইউ- এনআইসিইউগুলো কি আদৌ মান সম্পন্ন?

দেশের আইসিইউ- এনআইসিইউগুলো কি আদৌ মান সম্পন্ন?

রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে আইসিইউ(ICU), এনআইসিইউ (NICU) নাম দিয়ে এতো প্রতিষ্ঠান পসরা খুলে বসেছে তারা কি সঠিক সেবা দিচ্ছে? স্বাস্থ্যসেবার ব্যবসা এমনিতে সোনার ডিম পাড়া হাঁস। আর এই ক্রিটিকাল কেয়ার তো দিনের মাঝেই ডজন ডিম পাড়া হাস! তাই অর্থের লোভে কতো যে প্রতিষ্ঠান প্রতারণার ফাঁদ ছড়িয়ে বসেছে তার হিসেব কি রাখা আছে সরকারের কাছে? হাতে গোনা হাতে গোণা অল্প কিছু স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান ছাড়া বাকি সব গুলোর ব্যবসা চলছে দালাল দিয়ে। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে সেকী রমরমা ব্যবসা!

নামকা ওয়াস্তে খোলা এসব আইসিউর সেবার মান নিয়ে কি বলবো! কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে একজন মেডিকেল অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়। সে হয়তো MBBS পাস কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যায় ক্রিটিকাল কেয়ার সাপোর্ট দেয়ার মতো দক্ষতা তার নাই (দক্ষ লোক নিয়োগ দিতে বেশি টাকা লাগে যে!)। তার কাজ হচ্ছে সাইনবোর্ড হিসেবে থাকা যে, 'এখানে ডাক্তার আছেন!' আর দরকারে রোগীদের স্বজনকে কাউন্সেলিং করা। আর রোগী ম্যানেজের কাজ করবে ব্রাদার সিস্টার বা ওয়ার্ডবয়টাইপ কেউ! কিসের একাডেমিক নলেজ কিসের কি? আবার কোনটাতে যদি ডিউটি ডক্টরের ভুয়া কাউকে বসিয়ে রাখে তা বুঝতে পারার সাধ্য আপনার কোথায়!

কিছু কিছু আইসিইউর হয়তো মন্দের ভালো একজন অন কল এনেস্থেসিওলজিস্ট থাকেন যিনি দিনে একবার বা দুইবার এসে রোগীকে দেখে যান, চিকিৎসা তদারকি করেন; তবে কোন কোন প্রতিষ্ঠানের তাও নেই! কাচঘেরা বন্ধ ঘরে কি ঘটনা চলে তা বাইরের রোগীর উদ্বিঘ্ন স্বজনেরা কিভাবে জানবে! সমস্যা যদি খুব জটিল কিছু না হয় বা আল্লাহ যদি হায়াত রেখেই থাকেন তাহলে কিছু রোগী হয়তো বাঁচে কিন্তু অধিকাংশের ক্ষেত্রেই যা ঘটার তাই ঘটে। রোগী মৃত্যু বরণ করে। যেহেতু সবচেয়ে ক্রিটিকাল অবস্থাতেই রোগী এসেছে সুতরাং সে তো মারা যেতেই পারে। সুতরাং কি আর করা! আমার কথা হলো রোগী মারা যেতেই পারে, সবাইকে চিকিৎসকেরা বাঁচাতে পারবেন না আল্লাহর দেয়া হায়াত থাকতে হবে; কিন্তু যে সেবাটা তাকে দেয়ার কথা ছিলো; তার জীবন রক্ষার জন্য যা যা করার কথা ছিলো তা কি সব করা হয়েছে? নিশ্চয়তাটা কোথায় পাই?

একজন রোগী এনে দিতে পারলে দালালেরা দিন প্রতি ৩০০০-৪০০০ টাকা করে পাবে। হ্যাঁ, প্রতিদিনের জন্য আলাদা আলাদা কমিশন! মাত্র কয়েকদিন এখানে থাকলেই যেখানে বিল চলে আসবে লাখ টাকার ওপরে সেখানে এই মধ্যস্বত্বভোগীদের ভাগের টাকা মরার উপর খাঁড়ার ঘাঁ এর মতো। মানুষের জমি বেঁচা, গরু বেচা টাকায়, ভিক্ষা করে তুলে আনা টাকায় এরা উদরপুর্তি করে! থু!

এখানে দালাল কারা? স্বাস্থ্য খাতের বাইরের কেউ? অধিকাংশ ক্ষেত্রেই না। আইসিউগুলোর বেতনভুক্ত কর্মচারী ছাড়াও বড় হাসপাতালগুলোর (সরকারী বা বেসরকারি ভালো আইসিইউগুলো যেখানে সচরাচর সিট পাওয়া যায় না) লিফট ম্যান, ঝাড়ুদার, আয়া, সিকিউরিটি গার্ড, এম্পবুলেন্সের ড্রাইভার, ইমার্জেন্সি বিভাগের নার্স, ডাক্তার কে নয়। যে লোভের কাছে বিক্রি হয়ে যেতে পারবে দালাল হতে পারবে।

প্রিয় পাঠক, দয়া করে অমুক তমুকের কথা শুনে বিভিন্ন ঘুপচি গলির চিপা চাপায় বা অন্য হাসপাতাল থেকে তাদের নাম ও ফ্লোর ভাড়া করে একটা দুইটা ফ্ল্যাট নিয়ে তৈরি করা আইসিউ ও এনআইসিইউ গুলোতে ভর্তি না হবার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন। চেষ্টা করবেন বড় বড় হাসপাতালগুলোর আইসিউতে ভর্তি হতে। এগুলোর কোনটাতে দুর্নীতি হয় না? হয় অবশ্যই। কিন্তু সম্ভাব্যতা থাকে নূন্যতম একটা মান বজায় থাকার। খুব সাবধান। সুযোগ থাকলে পরিচিত চিকিৎসক এর সাথে আলোচনা করে হাসপাতাল নির্বাচন করুন।

একদিকে কিছু মানুষ যখন পরিবারের সবচেয়ে কাছের মানুষটার জীবন মৃত্যু নিয়ে দারুণ উৎকন্ঠাতে থাকে তখন তাদের দুর্বলতাকে এই পুঁজি করে অজস্র টাকা আয় করে নেয় কিছু অর্থলোভী পিশাচ। মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে ব্যবসা করা অর্থলোলুপ মালিকের উত্তপ্ত দৃষ্টির তাপে কেটে যায় পড়ালেখার খরচ যোগাতে সপ্তাহে দুদিন ডিউটি করা মেডিকেল অফিসারের নৈতিকতার পাত। এতোসব অবিচারের প্রতিবাদ করা হয়ে ওঠে না অধিকাংশ সময়েই। যারা প্রতিবাদ করতে যায় তাদের আর পরদিন সেখানে দেখা যায় না। হাজার বেকার চিকিৎসক বসে আছে এ শূণ্যস্থান পূরণ করতে।

মাঝে মাঝে ভাবি স্বাস্থ্যখাতের এতো দূর্নীতি অনাচার নির্মূল করা কি আদৌ সম্ভব? খুব হতাশ লাগে তখন। নিজেদের অক্ষমতা টের পাই খুব। অনিয়মের এতো বড় জগদ্দল পাথরের সামনে নিজের অস্তিত্ব খুব তুচ্ছ মনে হয়। জানি না আদৌ এর পরিবর্তন করা সম্ভব হবে কীনা। নাকি যেমন চলছে তেমনই চলবে সব...

Add
  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত