ঢাকা সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯, ২৮ আশ্বিন ১৪২৬,    আপডেট ১২ ঘন্টা আগে
ডা. জাহিদুর রহমান

ডা. জাহিদুর রহমান

চিকিৎসক ও লেখক


১৯ মে, ২০১৭ ১৬:৫০

আসামী বানালেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ স্যারকে ?

আসামী বানালেন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ স্যারকে ?

আমোদপ্রিয় বাঙ্গালি যে অচিরেই ছোট ডাক্তার বাদ দিয়ে বড় ডাক্তার পেটানো শুরু করবে সেটা আমরা অনেক আগ থেকেই বলে আসছি। নগর পুড়লে স্বাভাবিক নিয়মে দেবালয়ও অক্ষত থাকে না। তাছাড়া নগরের কেউই আর আজকাল দেবালয়ের পবিত্রতা নিয়ে বিচলিত না। দেবালয়ের পুরোহিতরা সব চরিত্রের দোষে দানব হয়েছে।

ডাঃ প্রফেসর এ বি এম আবদুল্লাহ স্বাস্থ্যসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য একুশে পদক পাওয়া একজন স্বনামধন্য মেডিসিন রোগ বিশেষজ্ঞ। উনার লেখা মেডিক্যাল টেক্সট বুক শুধু আমরা না, আরো কয়েকটি দেশের ডাক্তার এবং মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীরা পড়ে। উনি একজন জনপ্রিয় কলামিস্ট এবং মিডিয়া ব্যক্তিত্ব। বিএমএ এবং স্বাচিপের রাজনীতিতেও উনার যথেষ্ট প্রভাব আছে, উনি আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীরর ব্যাক্তিগত চিকিৎসকও। সবচে বড় কথা, উনি দেশের সবচে বড় এবং পুরোনো মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডীন, একজন জনপ্রিয় শিক্ষক। আর বিরুদ্ধে মামলা করার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোক্টর কি একবারও ডাঃ আবদুল্লাহ স্যারের এই 'শিক্ষক' পরিচয়টার কথাও চিন্তা করলেন না? উনার যেখানে উত্তেজিত ছাত্রছাত্রীদের শান্ত করার কথা, তা না করে উল্টো কিভাবে উনি একজন শিক্ষক হয়ে আরেকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে তাদের উসকে দেন? দায়িত্বে অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার নুন্যতম প্রমানাদি না থাকার পরও নিজে বাদী হয়ে ১০ জন ডাক্তারের বিরুদ্ধে মামলা করেন? এমন না যে, বড় বড় ডিগ্রিধারী ডাক্তার বা প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক বলে তিনি কোন ভুল করবেন না, বা তার ভুলের সমালোচনা করা যাবে না। দৃষ্টিকটু হয়েছে উনার বিরুদ্ধে অভিযোগের ধরনটা, পরিস্থিতিটা? একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক এতটা অবিবেচক কিভাবে হন? উনার এই আচরনে দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা কি মেসেজ পেল? রুগি মারা গেলেই মিডিয়া এবং প্রশাসনের উস্কানিতে হাসপাতাল ভাংচুর? এখন থেকে যদি ঢাকা শহরের প্রাইভেট হাসপাতালগুলো নিজেদের ব্যবসা বাঁচাতে বিশ্ববিদ্যলয়ের ছাত্রছাত্রীদের চিকিৎসা দিতে আপত্তি জানায়? পারবেন ওদের কর্পোরেট কুটবুদ্ধির সাথে পেরে উঠতে? গায়ের জোরে সেবা আদায় করা যায়? একজন সংকটময় রুগি হাসপাতালে ভর্তি হবার আগেই যদি মুল্যবান সময় অপচয় হয়, তাতে আসলে ক্ষতিটা হবে কার?

সাংবাদিকরা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য করতে পারে না এমন কিছু নাই। তাছাড়া বর্তমানে বাংলাদেশের বেশিরভাগ সাংবাদিকদের যে পেশাগত দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা, ডেঙ্গু ছাড়াও যে প্লাটিলেট কমে যাওয়ার আরো হাজারো কারন থাকতে পারে, এটা তাদের মাথায় আসবে, আমরা সেরকম আশাও করি না। ক্যান্সারের চিকিৎসা মানেই তাদের কাছে বিষধর কিছু, সেটা দিলে তো রুগি মারা যাবেই। বাইরে থেকে আমরা উনাদের কলমকে যত স্বাধীন ভাবি, আসলে বাস্তবতা ঠিক তার উল্টো। কোন সাংবাদিককে এখন পর্যন্ত তাদের নিজেদের সিন্ডিকেটের বাইরে যেয়ে রিপোর্ট করতে দেখা যায়নি। যোগ্যতার অভাব থাকলে সেটা যে একাট্টা হয়ে ঢেকে রাখতে হয়, সেটা শুধু সাংবাদিক কেন একমাত্র গোয়ার গোবিন্দ ডাক্তাররা ছাড়া বাংলাদেশের আর সব পেশার দুষ্টু লোকরাই বোঝে। তাছাড়া এই ইস্যুভিত্তিক উত্তেজনার যুগে ফেসবুক বা ইলেকট্রনিক যে মিডিয়াই হোক, "ক্যান্সারের চিকিৎসা দেয়ায় ডেঙ্গু রুগির অকাল মৃত্যু" এরচে চখাম শিরোনাম আর কি হতে পারে? কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রোক্টর হয়ে আপনি এটা কি করলেন?

গতকাল সেন্ট্রাল হাসপাতালে একজন ব্লাড ক্যান্সারের রুগির মৃত্যু নিয়ে যে ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে, অন্য কোন সভ্য দেশ হলে সেন্ট্রাল হাসপাতালের ডাক্তার না, মামলা হত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে। দেশটা বাংলাদেশ বলেই হয়ত ঠিক উল্টোটি ঘটেছে। সেন্ট্রাল হাসপাতালও অন্যান্য প্রাইভেট হাসপাতালের মত হাজারো অনিনয়ম, দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। সেখানের বেশিরভাগ জুনিয়র সিনিয়র ডাক্তারদের মধ্যে সম্পর্ক কেবল গিভ এন টেকের। মেডিকেল অফিসাররা রুগি ভর্তি করে প্রফেসরদের কল দেয়, বিনিময়ে কমিশন পায়। আব্দুল্লাহ স্যারের মত ডাক্তারই বরং ঐ হাসপাতালে বেমানান। তাই স্বাভাবিকভাবেই গতকালকের ঘটনায় সেন্ট্রাল হাসপাতাল পাল্টা কোন আইনগত ব্যবস্থা নিবে না। সাংবাদিক এবং রুগির আত্মীয় পরিচয়ে ভাংচুর মারধোরে জড়িত থাকাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করবে। স্বাচিপ, বিএমএ নিয়ে আর একটা শব্দ খরচ করাও অপচয়। এখন একমাত্র ভরসা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। গত কয়েকমাস থেকেই তারা নিজেদের মধ্যে মারামারি হাতাহাতি করে বেশ ওয়ার্ম আপের মধ্যে আছেন। বহিরাগতদের কাছে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত হবার ক্ষতটা এখন দগদগে। বিভিন্ন ধরনের নিয়োগ বিনিয়োগ নিয়ে উনারা জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত। নিজেদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সম্মানিত ডীনের এরকম অপদস্থ হওয়াকে উনারা কিভাবে নেন, সেটা দেখার অপেক্ষায় থাকলাম। যে ঘটনায় গনমাধ্যম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সব ধরনের তথ্য প্রমাণ আছে, সাথে এক লাখ ডাক্তারের নৈতিক সমর্থন আছে, সেই ঘটনাতেও কি উনারা চুপচাপই থাকবেন?

সাংবাদিক ভাইয়া আপুরা, খুব বড় মাপের ভুল করে যাচ্ছেন। আমরা এক পা এগুলে দশ পা পিছিয়ে দিচ্ছেন। ডাক্তার রুগির সম্পর্কটা শেষ পর্যন্ত বিশ্বাসের। কারো বিশ্বাস অর্জন করতে না পারেন, নষ্ট করবেন না। বাঙ্গালি সর্বভুক, তাদের মনোরঞ্জনের জন্য আপনাদের সাধ্যের মধ্যেই আরো অনেক উপাদান আছে, সেগুলো নিয়ে রিপোর্ট করেন। বিষয় যেখানে মানুষের জীবন মৃত্যুর, দয়া করে সেখানে অন্তত কিছুটা হলেও পেশাদারিত্ব দেখান।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত