১৮ মে, ২০১৭ ১১:২২ এএম

মাত্র একটা কারণে উন্নত বিশ্বের চিকিৎসকদের চেয়ে পিছিয়ে আমরা

মাত্র একটা কারণে উন্নত বিশ্বের চিকিৎসকদের চেয়ে পিছিয়ে আমরা

১...

আমার এক দূর সম্পর্কের আঙ্কেলকে আমার এক নিউরোলজিস্ট স্যারের কাছে রেফার করলাম।উনার খিঁচুনী (Epilepsy) রোগ ছিল, সেটার চিকিৎসাও চলছিলো।টানা দু'বছর বা তার বেশী সময় খিঁচুনী বন্ধ থাকলে খিঁচুনীর ওষুধ আস্তে আস্তে বন্ধ করা যেতে পারে।যেহেতু উনি এই ক্রাইটেরিয়া ফুলফিল করেছেন, তাই স্যারের কাছে রেফার করেছিলাম.....

খিঁচুনীর এত ওষুধ আস্তে আস্তে বন্ধ হয়ে যাবে -এই আনন্দে উনি স্যারের সাথে দেখা করতে গেলেন। আঙ্কেল অন্ধকার মুখ নিয়ে বাসায় ফিরলেন। কোনো ধরণের কাউন্সেলিং না করে স্যার আঙ্কেলকে একটা নতুন প্রেসক্রিপশন হাতে ধরিয়ে দিয়েছেন। অথচ এই স্যাররাই আমাদের বলেন যে খিঁচুনী রোগীদের নানা ভাবে কাউন্সেলিং করতে হয়...

গতকাল আমাকে আঙ্কেল যে কথাটি বলেছিলেন তা আপনাদের হুবহু উল্লেখ করিঃ "আশা করি তোমরা যাতে এমন ডাক্তার না হও। ১০০০ টাকা ভিজিট রাখলেন, এক মিনিটও কথা বললেন না...."

 

২....

আম্মুকে নিয়ে ল্যাবএইডে গেলাম নেফ্রোলজিস্টকে (কিডনী বিশেষজ্ঞ) দেখাবো বলে।সিরিয়াল কেটে বসে রইলাম....

সিরিয়াল আসার পর রুমে ঢুকে আগের ইনভেস্টিগেশনের কিছু কাগজ টেবিলে রাখতেই উনি তা টেনে নিয়ে দেখা শুরু করলেন। আমি চিকিৎসক এ পরিচয় দেইনি, সাধারণত কোথাও দেইও না, তবে প্রস্তুত হয়ে বসে আছি-যদি কি সমস্যা জিজ্ঞেস করে, তবে কোনটার পর কোনটা বলবো...

আশ্চর্যের ব্যাপার বলি--উনি কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। আগের প্রেসক্রিপশন দেখে নতুন একটা প্রেসক্রিপশন লিখে দিলেন। মাঝে আম্মু একটি প্রশ্ন করলেন, উনি সেটিরও কোনো উত্তর দেননি....

আমি স্পষ্ট ভাষায় একটি কথা বলিঃ উনি নেফ্রোলজিস্ট হয়েছেন, স্পেশালিস্ট হয়েছেন, তবে MBBS লেভেল পাশ করার যোগ্যতাও উনি অর্জন করেন নাই....

 

৩...

আমার স্কুল জীবনের এক বন্ধু সফট্ওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে দেশের বাইরে আছে। তার স্ত্রী প্রেগন্যান্ট, শীঘ্রই দেশে আসবে। আমাকে জানালো-আমি যাতে একজন ভালো প্রসূতিরোগ বিশেষজ্ঞ ঠিক করে রাখি....

আমি ঠিকানা যোগাঢ় করলাম, ফোন নম্বর যোগাঢ় করলাম, বন্ধুকে ইনফর্ম করলাম। সব শেষে আমাকে জানাতে হলো- 'উনি ভালো ডাক্তার, তবে উনার কাউন্সেলিং ভালো না, এ ব্যাপারটা একটু সহ্য করে নিতে হবে....'

বন্ধু আমার এতদিন পর দেশে আসবে। আমি তার স্ত্রীর জন্য সবদিক থেকে ভালো এমন একজন চিকিৎসক যোগাঢ় করে দিতে পারি নাই- এ দুঃখে সে আমার সাথে কথা বলাই বন্ধ করে দিলো....

 

৪....

UK ও USA তে যারা চিকিৎসক হন, তারা যে সিস্টেমের ভেতর দিয়ে যান, সেখানে তাদের শেখানো হয় -একজন পেশেন্ট একজন চিকিৎসকের কাছে যথেষ্ট রেসপেক্ট ডিজার্ভ করেন, তাকে সে রেসপেক্ট দিতে হবে। রোগীর প্রতি Sympathy ও Empathy ব্যাপারটা সেখানে প্রায়োরিটি পায়....

আরো অবাক করা ব্যাপার- যে কেউ চাইলেই সেখানে চিকিৎসক হতে পারে না, Morality ইস্যুতেও একজন ব্যক্তিকে চিকিৎসক হিসেবে উতরাতে হয়...

আমাদের দেশের কারিকুলামেও এসব ব্যাপার কিছুটা আছে। তবে যারা এসব কারিকুলাম প্রণয়ন করেন তারা অধিকাংশই সেটা নিজেরা চর্চা করেন না, আমরা সেগুলো দেখি এবং তাদের মতই হই। কাজীর গরু যেমন কেতাবে থাকে, গোয়ালে থাকে না, রোগীর সাথে আমাদের সুন্দর আচার ব্যবহার ও কাউন্সেলিংও পরীক্ষায় পাশের মাঝেই সীমাবদ্ধ.....

 

৫...

চিকিৎসক হিসেবে আমি জানি, এদেশের চিকিৎসকদের একটি বড় অংশ হাইলি কোয়ালিফায়েড, বিশ্বের যে কোন দেশের চিকিৎসকদের সাথে জ্ঞানের ব্যাপারে এরা কমপিট করতে সক্ষম। শুধুমাত্র আাচার-ব্যবহারে আমরা পিছিয়ে যাচ্ছি এবং এই একটি কারণে দেশের জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মনোক্ষুন্ন হয়ে দেশের বাইরে চলে যাচ্ছেন। সামগ্রিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য এটি কোন শুভ লক্ষণ নয়....

একটা কথা আমরা ভুলে যাই, যারা আমাদের কাছে অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসা নিতে আসেন, তারা কিন্তু সেবা কিনতে আসেন। আপনি যেমন দোকানে গিয়ে আপনার অর্থে কোনো খারাপ ছেড়াফাঁড়া জিনিস নেবেন না, ঠিক তেমনি এরা অর্থের বিনিময়ে আপনার ভাবধরা রূপ দেখতে আসে নাই। এদেরকে চিকিৎসা দিয়ে সন্তুষ্ট করা আপনার দায়িত্ব। যদি তা না করতে পারেন, তবে চিকিৎসক নাম থেকে ইস্তফা দেয়াই ভালো....

 

৬...

তবে এদেশে নলেজেবল ডাক্তারের সাথে সাথে ভালো আচরণ করেন এমন চিকিৎসকও আছেন, সংখ্যাটা কম। সমস্যাটা হলো, সাধারণ মানুষের জন্য এদের খুঁজে পাওয়া কষ্টকর...

এমন একটা উদাহরণ দেই....

২০০৭ সাল, সেকেন্ড প্রফ আসন্ন, দিনরাত কিভাবে পার হচ্ছে তার খবর তখন আমার থাকে না। এমন সময় আম্মুর হাঁড়ের সমস্যা দেখা দিলো। ল্যাবএইডে Orthopaedics এর অধ্যাপক ডাঃ আমজাদ স্যারের কাছে আম্মুকে পাঠালাম, তখন আব্বু বেঁচে ছিলেন, আব্বুও সাথে গেলেন....

আমি যখন পড়ছি, এমন মুহূর্তে আমার মোবাইলে ফোন এলো। রিসিভ করা মাত্রই ভরাট গলা শুনতে পেলামঃ " ইয়াং ম্যান, একজন হবু চিকিৎসক হয়েও তোমার আম্মুকে তুমি Accompany কর নাই, এইটা ঠিক হয় নাই...."

স্যারের ভরাট কণ্ঠ এখনও আমার কানে বাজে। স্যার আমাকে ফোনটা না দিলেও পারতেন। তবে যে তথ্যটি আপনাদের দিতে চাচ্ছি সেটা হলো-- আপনারা কি বুঝতে পারছেন, স্যারের কাউন্সেলিং কতটা ব্যাপক ছিলো?

২০১৭ সালে জানতে পারলাম, স্যার যে শুধু অসাধারণ চিকিৎসক তা না, উনি এই দেশমাতৃকার জন্য '৭১ এ যুদ্ধও করেছিলেন, বুলেটবিদ্ধও হয়েছিলেন। দেশমাতৃকার জন্য যার এত টান, দেশের মানুষের জন্য তাই তাঁর টান থাকবে, সেটাই স্বাভাবিক.....

অসংখ্য মানুষকে আমরা হাইলাইট করি, কিন্তু এই সাদা মনের মানুষকে আমরা কতটা হাইলাইট করেছি?

একটি কথা মনে পড়ে গেলো, " বাঙালি মুসলমান জীবিত প্রতিভাকে লাশে পরিনত করে, আর মৃত প্রতিভার কবরে আগরবাতি জ্বালে..."

 

৭....

যাই হোক, রূপকথার মত একটি কাহিনী শোনালাম, বাস্তবে আসি....

"চিরসুখীজন ভ্রমে কি কখন -
ব্যথিতবেদন বুঝিতে পারে। 
কী যাতনা বিষে, বুঝিবে সে কিসে - 
কভূ আশীবিষে দংশেনি যারে...."

কবিতাটি উল্লেখ করার কারণটি বলি। এদেশের রোগীরা চিকিৎসকের কাছে কতটা অসহায়ত্বে ভোগে তা নিজে রোগী না হলে কখনও বোঝা যায় না। যারা চিকিৎসক তাদেরকে বলি, নিজেরা যখন রোগী হবেন, যে উদাহরণগুলো প্রথমদিকে দিয়েছি সেগুলো হাড়ে হাড়ে তখন টের পাবেন...

এদেশের অসুস্থ রোগীগুলো একরাশ আতঙ্ক নিয়ে অর্থের বিনিময়ে আমাদের সামনে হাজির হন। এই অসহায় রোগীগুলোর মন যদি আমরা এই অবস্থায় জয় করতে না পারি, তবে আমাদের চিকিৎসক হবার যৌক্তিকতাটা কোথায়?.....

আমি হলফ করে বলতে পারি- যে রোগীগুলো আমাদের কাছে আসেন, আমাদের হাসিমুখের কিছু কথা তাদের রোগযন্ত্রণাকে কিছুটা হলেও হ্রাস করে। এতটুকু বোধ হয় আমরা করতেই পারি, করাটা উচিতও....

 

৮....

লেখাটা শেষ করি।

এদেশে MBBS ও BDS মিলিয়ে প্রায় ৮০,০০০ বা তার বেশী চিকিৎসক রয়েছেন। রোগীর সাথে কম্যুনিকেশনের শুরুতে এদের প্রত্যেককে শেখানো হয়েছে যাতে সালাম/সম্ভাষণ জানিয়ে কথা শুরু করি, যাতে প্রতিটা রোগীকে তার রোগ ও চিকিৎসা পদ্ধতি সম্পর্কে বুঝিয়ে বলি.....

এখন কয়েকটা প্রশ্ন করিঃ  আমরা কয়জন চিকিৎসক রোগী চেম্বারে ঢুকলে সালাম/সম্ভাষণ দিয়ে কথা শুরু করি? আমরা কয়জন চিকিৎসক রোগীকে তার রোগ ও তার চিকিৎসা সম্পর্কে বুঝিয়ে বলি? আমাদের কয়জন স্যার এই নিয়মটি ফলো করেন?....

উত্তরটা আমার, আপনার কারো অজানা নয়। যারা আমাদের শিক্ষা দেন, আমরা যারা শিক্ষা নেই, ইন এ ব্রড সেন্স, আমরা অধিকাংশই আমাদের শিক্ষাকে বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারি নাই। যে শিক্ষা জীবনঘনিষ্ঠ নয়, যে শিক্ষা ব্যর্থ। নিজেদের আজ তাই বড় হিপোক্রেট বলে মনে হয়...

 

একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা

একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার

অধ্যাপক প্রাণ গোপালকে বিজয়ী ঘোষণা করে রোববার বিজ্ঞপ্তি: রিটার্নিং কর্মকর্তা

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত
তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা
পিতাকে নিয়ে ছেলে সাদি আব্দুল্লাহ’র আবেগঘন লেখা

তুমি সবার প্রফেসর আবদুল্লাহ স্যার, আমার চির লোভহীন, চির সাধারণ বাবা

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 
কিডনি পাথরের ঝুঁকি বাড়ায় নিয়মিত অ্যান্টাসিড সেবন 

বেশিদিন ওমিপ্রাজল খেলে হাড় ক্ষয়ের ঝুঁকি বাড়ে 

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না
জাতীয় হৃদরোগ ইন্সটিটিউটের সিসিউতে ভয়ানক কয়েক ঘন্টা

ডাক্তার-নার্সদের অক্লান্ত পরিশ্রমের কথা মিডিয়ায় আসে না