ঢাকা বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৯, ৯ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৬ ঘন্টা আগে
ডা. কাবেরি সালাম

ডা. কাবেরি সালাম

এসএস-১৯তম ব্যাচ

সিনিয়র কনসালটেন্ট, গাইনী এন্ড অবস্, সাজেদা হসপিটাল


 


১৪ মে, ২০১৭ ২১:২৫

মেডিকেল লাইফটা আসলে এমনই, এখানে পড়ার কোনো শেষ নেই

মেডিকেল লাইফটা আসলে এমনই, এখানে পড়ার কোনো শেষ নেই

"আমার ছেলের যখন জন্ম তখন আমি মিটফোর্ডের মাত্র সেকেন্ড ইয়ারে পড়ি। ফার্স্ট প্রফের আর মাত্র কয়দিন বাকি ছিলো। সেপ্টেম্বরে তখন ফার্স্ট প্রফ হত। ওর জন্ম এই মিটফোর্ড হাসপাতালেই। এত সুন্দর ফুটফুটে একটা বাচ্চা হয়েছিলো ফারদিন।
আমার সিজারিয়ানের পর স্টুডেন্ট ক্যাবিনেই ছিলাম বেশ কয়েকদিন। আমার ব্যাচমেটরা আসত আমাকে দেখতে, ফারদিনকে কোলে নিত। খারাপ লাগতো যে আমি বেড-এ শুয়ে আছি আর আমার বন্ধুরা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছে। তখন আমি এনাটমি পরীক্ষাটা শুধু দেই, তাও কোনো প্রস্ততি ছাড়াই, পাশও করে গেলাম। তবে ফিজিওলজি পরীক্ষাটা দেয়ার আর মানসিক জোরটা ছিলো না, তাই ওটা পরে দেই।

ছোটবেলায় সে খুবই মা-ঘেষা ছিলো। ওকে বাসায় রেখে কাজে যাওয়া ছিলো খুবই দুঃসাধ্য একটা ব্যাপার। খেলনা দিয়ে অনেক কিছু বুঝিয়ে তারপর কাজে যেতে পারতাম। আর বাসায় আসা মাত্রই এমনকি এপ্রন খোলার আগেই সে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরতো। ছোটবেলায় সে যখন ক্লাস টু-থ্রিতে পড়ে তখন থেকে আমি ওকে বিভিন্ন bones এর নাম শিখাতাম, সব গুলো bones এর নাম ঠিকমত বলতে পারলেও সে কেনো জানি কিছুতেই পারতো না ক্ল্যাভিকল বলতে। অবশেষে অনেক কষ্ট করে "লাভিকল "বলা শিখেছিলো!

একবার আমার হাসব্যান্ডের একটা মেডিকেল স্কলারশিপের প্রস্তাব আসে বেলজিয়াম থেকে। উনাকে ৯ টার সময় উপস্থিত হতে বলা হয়েছিলো। কিন্তু ফারদিনের সেদিন প্রচণ্ড অসুখ। উনি ১২ টার সময় গিয়ে দেখেন তারা চলে গিয়েছে, ১০ টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছিলো। এরকম আরো অনেক আত্মত্যাগ করতে হয়েছিলো আমাদের তরুণ চিকিৎসক মা- বাবা দুজনকেই। তাই ছেলেকে চিকিৎসক বানানোর চিন্তা প্রথমে ছিল না। কিন্তু একদিন ওর নানু দুর্ঘটনাক্রান্ত হয়ে প্রচুর ব্যথা পান। তিনি আমাদের ডেকে বললেন যে শারীরিক কষ্ট মানুষের সবচেয়ে বড় কষ্ট। অর্থ -বিত্ত-সম্পত্তি -টাকা দিয়ে তা লাঘব হয় না; কেবলমাত্র একজন চিকিৎসকই পারে ওই মুহূর্তে সেই যন্ত্রণার প্রশমন করতে। তোমরা আমার ফারদিনকে সেই ডাক্তার বানিও। সেদিন থেকেই আমার প্রথম মনে হয় আমার ছেলে চিকিৎসক হলে মন্দ হবে না।

সেই ছোট্ট ফারদিন যেদিন সলিমুল্লাহ তে চান্স পেলো সেদিন আমি খুব খুশি হয়েছিলাম, বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না। কিন্তু ফার্স্ট প্রফে এনাটমি পরীক্ষার আগে দেখি টেনশনে তার জ্বর এসে গিয়েছে, আমাদের দুইজনের মাঝে বসে পড়তে পড়তে কান্না শুরু করে দিয়েছে। তখন তাকে বললাম, মেডিকেল লাইফটা আসলে এমনই, এখানে পড়ার কোনো শেষ নেই। আমাদের সময়ও এমনই হত। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

প্রথম প্রথম ওর অবশ্য ইচ্ছা ছিলো না মেডিকেলে পড়ার। কিন্তু ওকে বোঝালাম যে এই সেক্টরে সততার সাথে অনেক ভালোভাবে চলা যায়, অনেক মানুষের উপকার করা যায়। সহজেই মানুষের শ্রদ্ধা, আস্থা আর ভালবাসা অর্জন করা যায়। আমার ইচ্ছা ফারদিন একদিন অনেক বড় ডাক্তার হবে, দেশবরেণ্য ক্লিনিশিয়ান হবে। রোগীদের সময় দিবে, তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবে।

একজন মা হিসেবে, একজন চিকিৎসক হিসেবে এবং এই ক্যাম্পাসের একজন সিনিয়র হিসেবে তোমাদের সবার কাছে আমার একটাই চাওয়া - ভালো মত পড়ো। ভালো ডাক্তার হও। দেশকে তোমার সর্বোচ্চ সেবাটুকু দাও।"

ডা. কাবেরি সালাম

এসএস-১৯তম ব্যাচ

সিনিয়র কনসালটেন্ট, গাইনী এন্ড অবস্, সাজেদা হসপিটাল

 

ফারদিন আব্দুর রাজ্জাক

এসএস-৪৩ তম ব্যাচ

মা দিবসের শুভেচ্ছা সকল মা'কে!

সূত্র: হিউম্যানস অব মিটফোর্ড

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত