১৪ মে, ২০১৭ ০৫:৩১ পিএম

বিসিএস স্বাস্থ্য (প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল) ক্যাডারে নিয়োগঃ লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি

বিসিএস স্বাস্থ্য (প্রফেশনাল/টেকনিক্যাল) ক্যাডারে নিয়োগঃ লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি

বিসিএস এর মতো প্রবল প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন কুশলী প্রস্তুতি। কেমন হতে পারে সেই প্রস্তুতির ধরন? কিভাবে পার হতে হবে এই সুকঠিন বৈতরণী, একটু একটু করে নিতে হবে সেরা প্রস্তুতিটুকু- এ বিষয়ে ‘মেডি ভয়েস’ এ লিখেছেন ৩৩ তম বিসিএস- এ সেরাদের সেরা, স্বাস্থ্য ক্যাডারে ১ম স্থান অর্জনকারী, ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৬৩ ব্যাচের কৃতি ছাত্র ডাঃ রায়হান আলী মোল্লা।

বিসিএস একটি অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা। এর লিখিত পর্বে প্রতিযোগিতার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। কারণ এ পর্বে পড়াশুনার পরিমাণ অত্যধিক এবং সে তুলনায় সময় অপ্রতুল। আর পেশাগত ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য আমরা দৈনন্দিন ও সাধারণ জ্ঞানের বিষয়গুলো থেকে কিছুটা দূরেই অবস্থান করি। তাই বিসিএস পরীক্ষার লিখিত পর্ব আমাদের কাছে সবচেয়ে কঠিন।        

বিসিএস লিখিত পরীক্ষায় ভালো করতে হলে প্রয়োজন সময়ের সঠিক ব্যবহার আর সঠিক কৌশল নিরূপন। একটু কৌশল অবলম্বন করলেই খুব কম সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে ভাল নম্বর পাওয়ার মত প্রস্তুতি নেয়া সম্ভব। এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম যা করতে হবে, বিগত বছরের লিখিত প্রশ্নগুলোর সমাধান করতে হবে আর বিষয়ভিত্তিক সাজেশন তৈরী করে পস্তুতি নিতে হবে। মনে রাখবেন প্রশ্নের সমাধান ও সাজেশন করলে আপনি বিভিন্ন দিক থেকে সফলতা পাবেন। যেমনঃ
১। পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন ও মানবন্টন সংক্রান্ত বিস্তারিত ধারণা।
২। প্রশ্নের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা বিশ্লেষণ এবং পর্যালোচনা।
৩। বিগত বছরে সর্বাধিক গুরুত্ব¡প্রাপ্ত বিষয় এবং তার প্রেক্ষিতে এ বছরের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারণ।
৪। কোন একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে সর্বাধিক কতটি প্রশ্ন আসার সম্ভাবনা। 
৫। সময়বণ্টন এবং সুনির্দিষ্ট সফলতা অভিমুখী প্রস্তুতি।

বাংলা ১ম পত্রঃ 
বাংলা ১ম পত্রে নম্বর তোলা খুবই সহজ। সাহিত্যে ৩০, ব্যাকরণে ৩০, ভাব সম্প্রসারণ ২০ এবং সারাংশ-সারমর্মে ২০। সাহিত্যে প্রায় পূর্ণ নাম্বার পাওয়া অসম্ভব নয়। এজন্য লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি তো নিতেই হবে, সাথে প্রিলিমিনারি পরীক্ষাতে যেটুকু বাংলা পড়তে হয়, তাও পড়তে হবে। বাগধারা, প্রবাদ-প্রবচন, বাচ্য পরিবর্তন, সমাস, কারক- এই অংশে সামান্য চর্চা করলেই ব্যাকরণে পূর্ণ নম্বর পাওয়া সম্ভব। উল্লেখ্য যে, কখনো কখনো সারাংশ ও সারমর্ম দুইটি প্রশ্নেরই উত্তর দিতে হয়, আবার অনেক ক্ষেত্রে একটা দেয়ার কথাও বলা হয়। তবে যেটাই দেয়া হোক খেয়াল রাখতে হবে যে মূল অংশের কোন লাইন যেন সরাসরি খাতায় তুলে না দেয়া হয় এবং উত্তর যেন দীর্ঘ না হয়। ভাব সম্প্রসারণের পাশে ২০ লাইনের লিমিট আছে কিনা অবশ্যই খেয়াল করতে হবে। ভাব সম্প্রসারণের দৈর্ঘ্য না বাড়িয়ে সাহিত্য মানের দিকে নজর দেয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। 

ইংরেজী ১ম পত্র ও ২য় পত্রঃ 
ইংরজীতে ভালো করার জন্য প্রয়োজন অনুশীলন। Essay with hints এবং Essay without hints- এ ভালো নম্বর পেতে হলে important topic ঠিক করে নিয়ে সেগুলো সম্পর্কে সম্যক ধারণা নিতে হবে। মুখস্থ করার প্রয়োজন নেই। তবে যাদের ইংরেজিতে বেসিক এমনিতেই কিছুটা ভাল তাদের জন্য সুবিধা হয়। পৃষ্ঠা ভরে লেখার থেকে ভাল ও grammatically correct করে লেখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। Grammar অংশে ভাল নাম্বার পাওয়া বেশ সহজ। এক্ষেত্রেও াvoice, narration, correction, fill in the gaps, tense একটু চর্চা করলেই পূর্ণ নম্বর অর্জন করা সম্ভব।

গানিতিক যুক্তি ও মানসিক দক্ষতাঃ   
গণিত বিষয়টি সম্ভবত বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য সবচেয়ে সহজ। অনেক সময় দেখা যায় যে, বাংলা দ্বিতীয় পত্রে বা অন্য বিষয়ে একটু নতুন এবং কঠিন প্রশ্ন আসে। তখন গণিতে পূর্ণ নাম্বার পেয়ে অন্য বিষয়ের সেই কম নাম্বারকে কিছুটা হলেও প্রশমন করা যায়। অন্যদিকে লিখিত পরীক্ষার সাফল্য ও চূড়ান্ত ফলাফলে এগিয়ে থাকাও নির্ভর করে গনিতের উপর। গণিত অংশটি সম্পূর্ণ ছকে বাঁধা। নবম-দশম শ্রেণির পাটিগণিত অংশ থেকে বেশিরভাগ প্রশ্ন আসে। যেমনঃ সরল, লাভ-ক্ষতি, সুদকষা, চৌবাচ্চা, বাগান/পুকুর ও ধারের বিষয়গুলো থেকে শতকরা ৯০ ভাগ প্রশ্ন আসে। ইদানীং অবশ্য বীজগণিতের অংশ থেকে, বিশেষত উৎপাদকে বিশ্লেষণ থেকেও অনেক প্রশ্ন আসে। আর মানসিক দক্ষতার জন্য অনুশীলনের কোন বিকল্প নেই। পূর্বের প্রশ্ন সমাধানের পাশাপাশি IBA/MBA’র  Analytical part অনুশীলন করা যেতে পারে। 
 

বাংলাদেশ বিষয়াবলী ১ম পত্রঃ 
এ বিষয়ে ভালো করার জন্য থাকতে হবে প্রচুর পরিমাণে সংবাদপত্র, বিভিন্ন জার্নাল পড়ার অভিজ্ঞতা। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার উপর জোর দিতে হবে যেমন- যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বিদ্যুৎ খাতে সফলতা ইত্যাদি। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ, শিল্প, সংস্কৃতি, কৃষি, সমস্যা ও সম্ভাবনা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের স্বীকৃতি, MDG সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান বিষয়ে সম্যক ধারণা থাকতে হবে।

বাংলাদেশ বিষয়াবলী ২য় পত্রঃ 
এ বিষয়ে ভালো করার একমাত্র উপায় বাংলাদেশের সংবিধান জানতে হবে। সেক্ষেত্রে অনুচ্ছেদ ১-২৪, নির্বাচন কমিশন সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ, কর্মকমিশন সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ, প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদ সংক্রান্ত অনুচ্ছেদ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধানের ইতিহাস ও সংশোধনীগুলোও বিস্তারিত জানতে হবে। সংবিধানের ব্যাপারে ভাল জ্ঞান রাখার পাশাপাশি বাংলাদেশের শাসনবিভাগ, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ নিয়ে জানতে হবে। বাংলাদেশে পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্রনীতিও জানতে হবে।    

আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীঃ 
এ বিষয়ে ভালো নম্বর পেতে হলে সাম্প্রতিক সময়ের বিভিন্ন ঘটনার উপর ভালো দখল থাকতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন দেশের বৈদেশিক ও কূটনৈতিক নীতিমালা এবং বাংলাদেশের সাথে বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অবস্থান সম্বন্ধে ভালো ধারণা থাকতে হবে। এছাড়া বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জোট নিয়েও জানতে হবে। কারেন্ট অ্যাফেয়ারস বা এ ধরনের ছোট বইগুলো বারবার পড়তে হবে।

Medical Science Papers I & II:

এ বিষয়গুলোতে Basic science ও Clinical দুই ক্ষেত্র থেকেই প্রশ্ন আসতে পারে। তবে এক্ষেত্রে common এবং most important topic গুলো আসার সম্ভাবনাই বেশি। তাই common topic গুলো আগে পড়তে হবে। যেমনঃ Treatment of TB/kala-azar আসার সম্ভাবনা অনেক বেশি, Brucellosis, Infective endocarditis এর চেয়ে। বিসিএস চাকরির প্রথম কয়েক বছর প্রত্যন্ত অঞ্চলে দায়িত্ব পালন করতে হয়, তাই বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে যে রোগের চিকিৎসা বেশি করতে হয়, তা সংক্রান্ত প্রশ্নই বেশি আসে। সর্বোপরি, আগের বছরের প্রশ্ন দেখলে একটা বিস্তারিত ধারণা পাওয়া সম্ভব। 

টেকনিক্যাল ক্যাডার হওয়াতে আমাদের ৯০০ নাম্বারের উপর পরীক্ষা দিতে হয়, যেখানে ৭০০ নাম্বার সাধারণ বিষয় এবং ২০০ নাম্বার মেডিকেল সংক্রান্ত বিষয়। পাশ করার জন্য তথা মৌখিক পরীক্ষায় অবতীর্ণ হবার জন্য কমপক্ষে ৫০% নাম্বার বা ৪৫০ পেতে হবে। কোন একটি বিষয়ে ২৫% এর নিচে নাম্বার থাকলে এবং অন্যান্য সবগুলোতে ৫০% এর উপরে থাকলে প্রার্থী অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তবে যদি কোন বিষয়ে ২৫% এর নিচে নাম্বার না থাকে এবং গড়ে ৫০% থাকে, তবে পাশ নিশ্চিত হবে। 

মনে রাখতে হবে যে, চূড়ান্ত পরীক্ষার সাফল্যই সাফল্য। আর লিখিত পরীক্ষার সাফল্য শুধুমাত্র ভাইভা দেয়ার যোগ্যতা দান করে। আর চূড়ান্ত পরীক্ষায় তারাই সফল হবে, যাদের লিখিত ও ভাইভা মিলে মোট নাম্বার সবচেয়ে বেশি। তাই লিখিত পরীক্ষার গুরুত্ব¡ অসীম। এক্ষেত্রে প্রতিটি পরীক্ষার ক্ষেত্রেই নম্বর এবং প্রশ্ন সংখ্যার অনুপাতে সময় বন্টন করে নিতে হবে। সব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। খাতায় হাতের লেখা পরিষ্কার ও উপস্থাপনা সুন্দর হলে ভালো নম্বর পাওয়া সহজ হবে।

বিসিএস পরীক্ষায় সবার সাফল্য কামনা করছি।
 

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ২, বর্ষ ১, এপ্রিল-২০১৪ তে প্রকাশিত)

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত