রবিবার ১৭, ডিসেম্বর ২০১৭ - ২, পৌষ, ১৪২৪ - হিজরী

ব্রাজিলিয়ান ফুটবলার সক্রেটিস

‘‘৮০’র দশকে বেড়ে ওঠা একজন বালক হিসেবে, ডাঃ সক্রেটিস অনেকেরই প্রিয় ব্যক্তি ছিলেন। যিনি অর্কেস্ট্রা বাদকের মত নান্দনিকতা দিয়েছিলেন ফুটবলকে। দিয়েছিলেন তারুণ্যের প্রথম প্রেমের উত্তেজনা।’’

কথাগুলো নাইজেরিয়ার একজন ফুটবল দর্শকের। ডাঃ সক্রেটিসের মৃত্যুতে শোকাহত লক্ষ ভক্তের করুণ কণ্ঠস্বর এটি। না, ইনি গ্রীক দার্শনিক সক্রেটিস নন, ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কিংবদন্তী সক্রেটিস, যাঁর পুরো নাম “ডাক্তার সক্রেটিস বাজিলিয়েরো সামপাইয়ো ডি সুজা ভিয়েরা ডি অলিভিয়েরা,” কিংবা সংক্ষেপে ডা. সক্রেটিস।

ব্রাজিলের পারা রাজ্যের বৃহত্তম শহর বেলেম, এই শহরেই ১৯৫৪’র ১৯শে ফেব্রুয়ারী জন্ম হয় এই কিংবদন্তীর। ছেলেবেলায় পাড়া কাঁপানো এই খুুদে খেলোয়াড়, লেখা পড়াতেও ছিলেন বেশ ভাল, তবে ফুটবলের নেশাটাও যে তাঁর রন্ধ্রে রন্ধে!্র তাইতো বয়স বিশ হতেই নাম লেখালেন পেশাগত ফুটবলে, যোগ দিলেন রিবেরাও প্রেতোর বোতাফেগো এস, পি, ক্লাবে (১৯৭৪)।

তবে পেশাদার ফুটবল তাঁর আজন্ম লালিত স্বপ্নকে দমিত হতে দেয়নি। ব্রাজিলের এই বিষ্ময়, সমানে চালিয়েছেন লেখাপড়াও। স্কুল ও কলেজের গন্ডি পেরিয়ে, পাড়ি জমিয়েছেন মেডিকেল স্কুলে।

ক্লাব ফুটবলের নায়কোচিত প্রদর্শন চলাকলীন, সাওপাওলো বিশ্ববিদ্যালয়ের রিবেরাও প্রেতো মেডিকেল অনুষদে নিয়মিত অধ্যয়ন করেন সক্রেটিস, সবার অগোচরেই এই ফুটবলারের আরেক স্বপ্নকুঁড়ি প্রস্ফুটিত হতে থাকে সযতেœ। ১৯৭৮ সালে বোতাফেগো- এস, পি ছেড়ে করিন্থি’য়ান্স ক্লাবে যোগ দিলেন সক্রেটিস। তবে এ বছর দার্শনিক সুলভ নাম নয়, এ নামের পূর্বে যুক্ত হল এক মহান পেশার উপসর্গ, ফুটবলার সক্রেটিস পরিচিত হলেন ডা. সক্রেটিস নামে। ডা. সক্রেটিস করিন্থিয়ান্সের হয়ে ৬ বছরে প্রায় ৩০০ ম্যাচ খেলেছিলেন। 

১৯৭৯ সালে চিকিৎসকের অসাধারণ ফুটবল শিল্পে মুগ্ধ হয়ে তৎকালীন ব্রাজিল কোচ তাঁকে মূল (জাতীয়) একাদশে স্থান দিলেন, তাঁর নেতৃত্বের দক্ষতা খুব দ্রুতই তাঁকে দলের অধিনায়কে পরিণত করে। 

’৮২ তে, নিজের প্রথম বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেন সক্রেটিস, জিকো, জুনিয়র, ফ্যালকাও, সক্রেটিসদের সেই ব্রাজিলই ৮২’র বিশ্ব ফেভারিট ছিল, প্রথম রাউন্ডে ফ্যালকাওরা সাম্বা ছন্দে বেশ আয়েশ করেই কুপোকাত করে সোভিয়েত ইউনিয়ন (২-১), স্কটল্যান্ড (২-০) ও নিউজিল্যান্ড (৪-০) কে, দ্বিতীয় রাউন্ডের প্রথম ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দী আর্জেন্টিনাকে ৩-১ ব্যবধানে পরাজিত করে। এ ম্যাচে ম্যারাডোনা থাকলেও তাঁরা নিজেদের ২য় ম্যাচে ইতালির কাছে ৩-২ গোলে পরাজিত হয়ে বিদায় হয় ব্রাজিল, অধিনায়কত্ব ঘোচে ডা. সক্রেটিসের। তবে তাঁর ব্যাক হিলের জাদু থেকে তখনো বিশ্ব বঞ্চিত হয় নি। ’৮৬ র বিশ্বকাপে আবারো ব্রাজিলের হয়ে খেলেন তিনি। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে এবারও ব্রাজিলের পরাজয় ঘটে। ’৮২ আর ’৮৬ এর এই পরাজিত ব্রাজিল দলটিকে বলা হয় শিরোপাহীন সর্বকালের শ্রেষ্ঠদল। তবে ব্রাজিলের পরাজয় ঘটলেও ব্যক্তি ডা. সক্রেটিস পরাজিত হননি কখনও। ভক্তদের কাছে “গোল্ডেন ব্যাক হিল” উপাধি পান এই এটাকিং মিড-ফিল্ডার । 

সক্রেটিসের জীবনকালের সবচেয়ে অভাবনীয় ব্যাপারটি ছিল, একজন কিংবদন্তী ফুটবলার হবার সাথে সাথে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ছিলেন তিনি, তিনি একাধারে মেডিসিন ও সাইকিয়াট্রিতে ডক্টরেট ছিলেন। এমন চমকপ্রদ উদাহরণ ইতিহাসে বিরল। 
এমনকি, কথিত আছে, ৮২ বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ডে যখন ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ডকে ৪-০ তে পরাজিত করে, তখনও ডা. সক্রেটিস, মেডিসিনের একটি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছিলেন। এই ফুটবল কিংবদন্তী ’৮৬ সালে অবসর নেন। এরপর পুরোদমে একজন ডাক্তার ও একজন ফুটবল বোদ্ধা হিসেবে মিডিয়ায় কাজ শুরু করেন।

২০০৪ সালের মার্চে ফিফা আয়োজিত এক পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে ১২৫ জন জীবিত মহান ফুটবলারের নাম ঘোষিত হয়। সক্রেটিস ছিলেন এদের মাঝে অন্যতম। এছাড়া বিশ্ব ফুটবল ইতিহাসের সেরা ৬১ তম মহান ফুটবলার হিসেবে ঘোষিত হন এই চিকিৎসক। ব্রাজিলিয়ান ফুটবল মিউজিয়াম হল অব ফেম এ তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। 

২০১১ সালের নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে একটি রেস্তোরাঁয় দূষিত খাবার খেয়ে ফুড পয়জনিং এর শিকার হন ডা. সক্রেটিস, তাঁর স্ত্রী ও কিছু বন্ধু। বাকিরা বেঁচে ফিরলেও সেপটিক শক দেখা দেয় সক্রেটিসের। বেশ কয়েক দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ১১ ডিসেম্বর সাওপাওলোর একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কিংবদন্তী। 

তাঁর মৃত্যুর পর ইতালিয়ান কিংবদন্তী রসি বলেন, ‘‘আজ আমাদের ইতিহাসের একটি অংশ যেন ভেঙ্গে পড়ে গেল।” এই রসিদের কাছেই একদিন হেরেছিলেন সক্রেটিসরা। কিন্তু মৃত্যু তাঁকে হারাতে পারেনি। তাঁর অসাধারণ ক্রিয়াশৈলীর জাদুতে ইতিহাসের সোনালী পাতায় তাই তিনি অমলিন, শোকার্ত হৃদয়ে তাই তিনি চিরজীবী, চিরউচ্ছ্বল ‘ডাক্তার সক্রেটিস’।

লেখক ফররুখ খাতির (এস.এস.এম.সি)

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৩, বর্ষ ১, নভেম্বর ২০১৪ তে প্রকাশিত)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

বার পঠিত



আরো সংবাদ


শহীদ ডা. মিলন দিবস আজ

শহীদ ডা. মিলন দিবস আজ

২৭ নভেম্বর, ২০১৭ ১১:১৭


তিনি একজন কার্ডিয়াক সার্জন

তিনি একজন কার্ডিয়াক সার্জন

২০ নভেম্বর, ২০১৭ ১৫:৪১















শিশু কিশোরদের পাইলস

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১১:৩২

স্যালুট টু ইউ ডক্টর

১৫ ডিসেম্বর, ২০১৭ ১০:৪১
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর