০৬ মে, ২০১৭ ১২:২৮ পিএম

চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাইবেল ‘কানুন ফিত তিব্ব’

চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাইবেল ‘কানুন ফিত তিব্ব’

মানবদেহ, সৃষ্টিকর্তার তৈরী এক অনন্য রহস্যের নাম। একটা মানুষ জন্মগ্রহণ করছে, বেড়ে উঠছে, পৃথিবীর বুকে তার নানা কার্যকলাপের সাক্ষর রেখে বিদায় নিচ্ছে পৃথিবী থেকে। মানুষ বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে ভোগে,কেউ সেরে ওঠে,আবার কারো জন্য সেই রোগ হয়ে পড়ে মৃত্যুর কারণ। কীভাবে ঘটে এই সব কিছু? এই প্রশ্নের জবাব খুজতে গিয়ে সৃষ্টি হয়েছে চিকিৎসাবিজ্ঞান। অসংখ্য চিকিৎসাবিজ্ঞানী কাজ করে গেছেন, রচিত হয়েছে অসংখ্য গ্রন্থ।

“কানুন ফিততিব্ব” এসব গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসা বিজ্ঞানী ইবনে সিনা রচিত এ বইটি চিকিৎসা শাস্ত্রের বাইবেল নামে পরিচিত।

পাশ্চাত্যে 'দি ক্যানন অভ মেডিসিন' নামে পরিচিত ৫ খণ্ডের এ সুবিশাল গ্রন্থটির রচনা সম্পন্ন হয় ১০২৫ খ্রিষ্টাব্দে এবং সময়কাল ছিল ১৩ বছর। মূল বইটি আরবি ভাষায় রচিত হলেও ইংরেজি, ফারসি, ল্যাটিন, চাইনিজ, হিব্র“, জার্মান ইত্যাদি অসংখ্য ভাষায় এটি অনূদিত হয়।

১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মেডিকেল কলেজগুলোতে বইটি ছিল প্রধান পাঠ্য।

মানবজাতির ভাগ্যাকাশে যখন ঘোর অমানিশা, রোগে শোকে জর্জরিত পৃথিবী, ঠিক তখন আলোর প্রদীপ হাতে যে কজন মহা মনিষীর আবির্ভাব ঘটেছিল, ইবনে সিনা তাদের মধ্যে অন্যতম। তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি কানুন ফিততিব্ব, আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু হয় এ বইটির হাত ধরে।

বইটিতে প্লুরিসি ও মিডিয়াস্টিনাইটিস আলাদাভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। মাটি ও পানির মাধ্যমে ছড়ায় এমন সব সংক্রামক রোগের বর্ণনা করা হয়েছে। 

বইটিকে পাঁচটি খন্ডে ভাগ করেছেন। যার প্রতিটি খন্ডে আলাদা আলাদা বিষয় নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

বইটির প্রথম খন্ডের নাম General Principles মহাজাগতিক বস্তু যা এ বিশ্বজগৎ ও মানবদেহ তৈরী করেছে, বিভিন্ন বস্তুর সাথে মানবদেহের ক্রিয়া-বিক্রিয়া, অঙ্গসংস্থান, শারীরবিদ্যা ইত্যাদি বিষয়ের সাধারণ বর্ণনার পাশাপাশি মানবদেহ ব্যবচ্ছেদের পদ্ধতিও বর্ণনা করা হয়েছে।

বইটির দ্বিতীয় খন্ড Materia Medica যাতে চিকিৎসকদের ব্যবহৃত প্রায় ৮০০ জিনিসের ব্যবহার তুলে ধরা হয়েছে ।

তৃতীয় খণ্ড Deases in the individuales organs এ মানুষের মাথা থেকে পা পর্যন্ত বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও সেগুলোর বিভিন্ন রোগের বর্ণনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে ।

চতুর্থ খন্ডটি হলো General Diseases. এই খন্ডে আলোচনা করা হয়েছে এমনসব রোগ নিয়ে যে সকল রোগে মানুষ প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হচ্ছে। যা আমাদের পুরো দেহকে আক্রান্ত করে।

বইটির পঞ্চম খন্ড- Formula for remidiesএ প্রায় ৬৫০ টি ওষুধের প্রস্তুতপ্রণালী, ব্যবহার, গুণাগুণ বর্ণিত হয়েছে। এই বইটির আরেকটি বিশেষত্ব লক্ষণীয়। স্বচিকিৎসা নামক নতুন একটি ধারার জন্ম দেয় বইটি। স্ব-চিকিৎসা অর্থ হলো কলাকৌশল ও খাদ্য প্রয়োগ করে সুস্থ,সবল ও নিরোগ থাকা। কলাকৌশল ও খাদ্য সুচিকিৎসারও মুল ভিত্তি। দেহের যাবতীয় অঙ্গ প্রত্যঙ্গ সক্রিয় সচল ও সক্ষম থাকাই সুস্থতার লক্ষণ এবং এগুলোর ভারসাম্যহীনতা মানে অসুস্থতা নির্দেশ করে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনে তার এই গ্রন্থে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ৪ পদ্বতির কথা উল্লেখ করেছিলেন যা চিকিৎসা বিজ্ঞানে যোগ করে নতুন এক মাত্রা। পদ্ধতিগুলোর দিকে খেয়াল করলে দেখা যায় কলাকৌশল প্রানায়াম, যোগব্যায়াম, খেলাধুলা, হাটা, ধ্যান আকুপ্রেশার আকুপাংচারসহ যাবতীয় শারীরিক কসরত গুলো প্রথম পদ্ধতির অন্তর্ভুক্ত। 

দ্বিতীয় পদ্ধতির মধ্যে  অন্তর্ভুক্ত হয়েছে দেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধি ছাড়াও অম্ল ও ক্ষারের সমতা বিধান করে pH মাত্রা সঠিক অবস্থায় রাখে। এতে দেহের জৈবিক ক্রিয়াকলাপ ও সঞ্চালণ প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। যা জীবন চেতনার অপরিহার্য উপাদান। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রথম ও দ্বিতীয় পদ্ধতি অকার্যকর হলে তৃতীয় পদ্ধতির প্রয়োগ করা যেতে পারে। এ পদ্ধতিতে রয়েছে প্রাণীজ ও উদ্ভিজ্জ উপাদান নিয়ে উৎপাদিত বিভিন্ন ঔষধ প্রয়োগ করে শরীর কার্যক্ষম করা। 

যদিও এটি বিকল্প পদ্ধতি এবং এর বিধিসম্মত ব্যবহার না ঘটলে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়ে যায়। সর্বশেষ পদ্ধতি হলো শল্যচিকিৎসা। শল্যচিকিৎসকদের মান অনুযায়ী যেখানে নির্ভর করে এর ব্যবহার কিংবা অপব্যবহার। ইবনে সিনা তার বইয়ের একটা অংশে মজা করে বলেছিলেন আনাড়ী শল্যচিকিৎসক তার হাত পাকানোর জন্য “When to Cut" করতে উদগ্রীব থাকেন। কম অভিজ্ঞ শল্যচিকিৎসক How to Cut নিয়ে ভাবেন কিন্তু অভিজ্ঞ শল্যচিকিৎসক Not to Cut করে রোগীকে সারিয়ে তোলার চেষ্টা করেন।

লেখক : নাহিয়ান মুনতাসির

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৫, বর্ষ ২, জুন-জুলাই ২০১৫ তে প্রকাশিত)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত