ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ২, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী

কৃত্রিম পেসমেকার

আধুনিক বিশ্বে যখন নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ এর পরিমাণ বেড়েই চলেছে। বাড়ছে হৃদরোগীর সংখ্যা। ঠিক সে সময় অসংখ্য মানুষের হৃদপিন্ডের সংকোচন-প্রসারণের সহায়তা করে ত্রাতার ভূমিকা পালন করছে পেসমেকার। হৃদপিন্ডে পেসমেকার স্থাপন এখন খুবই পরিচিত ঘটনা।  মেডিভয়েসের ইন্সট্রুমেন্ট রিভিউতে আজ আমরা জানবো এই পেসমেকার কি? কিভাবেই বা এটি কাজ করে?

আসলে পেসমেকার হল হাতঘড়ি আকারের ব্যাটারিচালিত ছোট্ট একটি যন্ত্র। এটি মাত্র এক আউন্স ওজনের (২৫ গ্রাম), যা কিনা বিশ্বের প্রায় এক মিলিয়ন লোককে বাচিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে। এই যন্ত্রটি একদিনে আবিস্কার হয় নি। যখন প্রথম আবিস্কৃত হয় তখন এটি বহনযোগ্য ছিল না। এর ওজন ছিল প্রায় ৪৫ কেজির মত । পেসমেকারকে মানুষের দেহে স্থাপনযোগ্য  করার জন্য যারা কাজ করেছেন তাদের মধ্যে কিংবদন্তী হলেন - সার্জন একি সেনিং এবং শরীবদি বুনি। ৮ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে সুইডেনের কারোলিন্সকা ইনস্টিটিউটে এই দুই বিজ্ঞানী প্রথম পেসমেকার স্থাপন করেন আর্নি লারসন নামে একজন রোগীর শরীরে। কিন্তু এটি স্থায়ী হয়েছিল মাত্র আট ঘন্টা পরেরদিন লারসনের গায়ে আরেকটি  পেসমেকার স্থাপন করা হয় যেটা স্থায়ী হয় মাত্র দু সপ্তাহ। আর্নি লারসন বেঁচে ছিলেন প্রায় ৮৬ বছর বয়স পর্যন্ত। এর মধ্যে তার গায়ে মোট ২৫টি পেসমেকার লাগাতে হয়েছিল। তিনি ২০০১ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তবে মজার ব্যাপার হলো তিনি রোগী হয়েও তার অপারেশনকারী দুইজন ডাক্তারের চেয়ে বেশি দিন বেঁচে ছিলেন। 

এবার আসা যাক কৃত্রিম পেসমেকার কিভাবে কাজ করে। ডান অলিন্দের প্রাচীরে স্বাভাবিক ভাবেই  এস এ নোড পেসমেকার হিসেবে কাজ করা শুরু করে মায়ের গর্ভে থাকা কালীন ১৮-২১ দিনের মধ্যে। যা আর কখনো থামার সুযোগ পায় না। আমাদের দেহের প্রাকৃতিক এই পেসমেকারের কাজের সমাপ্তি ঘটে মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। তবে হার্ট ব্লক হলে এটি সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই সময়টা যদি ৩-৪ মিনিটের বেশী স্থায়ী হয় তাহলে রক্তের অভাবে মানুষের মস্তিষ্কের মৃত্যু ঘটে। তাই হৃদপিন্ডকে সচল রাখতে দায়িত্বটি পালন করে এই কৃত্রিম পেসমেকার। এই যন্ত্রটির মধ্যে হার্টরেট একটা নির্দিষ্ট সীমায় প্রোগ্রাম করা থাকে। যদি হার্টরেট এর চেয়ে কম বা বেশী হয়ে যায় তাহলে যন্ত্রটি বুঝতে পারে। হার্টব্লকের সময় হার্টরেট কমে গেলে এটি সাথে সাথে ইমপালস পাঠাতে থাকে এবং হৃদস্পন্দনের হ্রাস বৃদ্ধি ঘটায়। ফলে রোগীর কোন সমস্যা হয় না। এটি রক্তের তাপমাত্রা এবং শরীরের কাজকর্মের সাথে হৃদস্পন্দনের যোগসূত্র তৈরী করে। 

প্রকারভেদঃ স্থায়িত্বের ভিত্তিতে পেসমেকার দুই প্রকার।
১. টেম্পোরারি পেসমেকার
২. পার্মানেন্ট পেসমেকার

আর হৃদপিন্ডের কোন প্রকোষ্ঠে বসানো হচ্ছে তার ভিত্তিতে পেসমেকার তিন প্রকারঃ
১. এক প্রকোষ্ঠি ( শুধু ডান অলিন্দে)
২. দুই প্রকোষ্ঠি (ডান অলিন্দ ও ডান নিলয়)
৩. তিন প্রকোষ্ঠি (ডান অলিন্দ ও দুই নিলয়)

যন্ত্রটি বসানো হয় বুকের চামড়ার নিচে; ক্ল্যাভিকলের ঠিক নিচের দিকে। ডানহাতি ব্যক্তির জন্য বামদিকে এবং বামহাতি ব্যক্তির জন্য ডানদিকে স্থাপন করা হয়। বসানোর স্থান থেকে ইলেকট্রোডগুলো শিরার মধ্য দিয়ে হৃদপিন্ডে প্রবেশ করানো হয়।
 

ব্যবহারকালীন সতর্কতাঃ
*    পেসমেকার ব্যবহারকারী রোগীকে সাধারণত কোন শক্তিশালী চৌম্বকক্ষেত্রে যেতে নিষেধ করা হয়। কারন এতে যন্ত্রটি বাধাগ্রস্থ হতে পারে। তাই এসব রোগীদের ক্ষেত্রে গজও করা নিরাপদ নয়।
*  নিরাপত্তাকর্মীদের দেহ পরীক্ষার সময় এই যন্ত্র মেটাল ডিটেক্টরে ভুল তথ্য দিয়ে বিড়ম্বনার সৃষ্টি করতে পারে। তাই কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে আগে থেকে জানিয়ে রাখা ভাল।
*   অপারেশনের সময় রোগীর শরীরে পেসমেকার থাকলে ইলেক্ট্রোকটারি করা যাবে না। তাই এ ব্যাপারে চিকিৎসককে আগেই জানানো জরুরী।
 

লেখক : এম আর হোসেন
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৫, বর্ষ ২, জুন-জুলাই ২০১৫ তে প্রকাশিত)

 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর