ঢাকা      মঙ্গলবার ১৬, জুলাই ২০১৯ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৬ - হিজরী

ইনস্ট্রুমেন্ট রিভিউ : এম আর আই মেশিন

বিংশ শতাব্দির চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে যে যন্ত্রটি দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে সেটি এম আর আই মেশিন। রেমন্ড ভাহান দামাদিয়ান নামে একজন আর্মেনিয়ান-আমেরিকান চিকিৎসক সর্বপ্রথম এই যন্ত্র আবিষ্কার করেন। এর মাধ্যমে শরীরের অভ্যন্তরের বিভিন্ন অংশের নিঁখুত ছবি তোলা যায়। ছবি দেখে দেহের বিভিন্ন অংশের টিউমার, ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যু, ভাঙ্গা হাড় শনাক্ত করা যায়। প্রচলিত অন্যান্য যন্ত্রের তুলনায় এটি অনেক নিখুঁত এবং কোনো প্রকার ক্ষতিকর প্রভাব ছাড়াই কাজ করে। 

হ্যালোফিলস নামে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণার সময় বিজ্ঞানী দামাদিয়ান নিউক্লিয়ার ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ব্যবহার করে দেখতে পান এই ব্যাকটেরিয়ার দেহে পটাশিয়ামের মাত্রা অন্যান্য ব্যাকটেরিয়ার তুলনায় প্রায় বিশ গুণ বেশী। ফলাফলটি তার এতোটাই মনোঃপুত হল যে তিনি তার এর ফলাফল ক্যান্সারসহ অন্যান্য রোগ নিরুপণের কাজে ব্যবহার করতে উদ্যোগী হলেন। এভাবেই আবিষ্কৃত হল চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই অসাধারণ যন্ত্রটি। বিজ্ঞানী দামাদিয়ান তার জীবনের বেশীর ভাগ সময়ই এই যন্ত্রটির উন্নয়নে ব্যয় করেছেন।

মানবদেহের শতকরা ৭০% ভাগই পানি আর চর্বি। এতে থাকে প্রচুর পরিমাণে হাইড্রোজেন পরমাণু। সাধারণত এই পরমাণুগুলো লাটিমের মত তাদের নিজস্ব চৌম্বক ক্ষেত্রে এদিক ওদিক ইতঃস্ততভাবে ঘুরতে থাকে। যদি মানবদেহকে একটি শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রে রাখা হয় তবে এই হাইড্রোজেন পরমাণুসমূহ জোড়ায় জোড়ায় এমনভাবে সজ্জিত হয় যে প্রায় অর্ধেক সংখ্যক পরমাণু চৌম্বকক্ষেত্রের দক্ষিণ মেরুর দিকে সজ্জিত হয়ে যায়। কিন্তু কিছু হাইড্রোজেন পরমাণু বেজোড় থেকে যায়। এমতাবস্থায় যদি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি ওয়েভ পাল্স পাঠানো হয় তবে এই বেজোড় পরমাণুগুলো শক্তি গ্রহণ করে বর্তমান অবস্থান পরিবর্তন করে অপর দিকে ঘুরে যায়।

অতঃপর যদি রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি পালস বন্ধ করে দেয়া হয় তবে এই পরমাণুগুলো আবার আগের অবস্থানে ফিরে আসে এবং শক্তি নিঃসরণ করে। এই শক্তি কম্পিউটারে সংকেত পাঠায় এবং কম্পিউটার গানিতিক সুত্র এবং এলগরিদমের সাহায্যে তা দিয়ে বৈজ্ঞানিক চিত্র গঠন করে। এম আর আই মেশিনে যে রেডিও পালস পাঠানো হয় তার কম্পাঙ্ক থাকে সাধারনত হাইড্রোজেনের নিজস্ব কম্পাঙ্কের সমান। ফলে হাইড্রোজেন পরমাণুতে অনুরণন সৃষ্টি হয়। এ কারণেই একে রেজোনেন্স ইমেজিং বলা হয়। 

এই মেশিনে চৌম্বক ক্ষেত্র তৈরীর জন্য যে চুম্বক ব্যবহার করা হয় তার শক্তি সাধারণত ৫০০০ থেকে ২০০০০ গস পর্যন্ত হয়ে থাকে। যেখানে পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্রের মান মাত্র ০.৫ গস। হাইড্রোজেন পরমাণুর ম্যাগনেটিক মোমেন্ট তথা চৌম্বক ক্ষেত্রের সংবেদনশীলতা বেশী কারণ এতে অযুগ্ম ইলেকট্রন থাকে এবং মানবদেহে এদের সংখ্যা অসীম। তাই হাইড্রোজেনকেই বেছে নেয়া হয়। 

৩রা জুলাই ১৯৯৭ দিনটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি উজ্জল দিন। ঐদিন স্যার পিটার ম্যান্সফিল্ড এর নেতৃত্বে একদল গবেষক মানবদেহের উপর সর্বপ্রথম এম আর আই মেশিনের সফল পরীক্ষা চালান। দামাদিয়ান থেকে শুরু করে অদ্যবদি বিভিন্ন গবেষকের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এই অসাধারণ যন্ত্রটি আজকের এই অবস্থানে এসেছে।
 

লেখক : জুয়েল আহমেদ, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৭, বর্ষ ৩, এপ্রিল-মে ২০১৬ তে প্রকাশিত)

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর