ডা. আব্দুর রব

ডা. আব্দুর রব

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)। 

এফসিপিএস-২ ট্রেইনি (সার্জারি)।

 সাবেক শিক্ষার্থী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। 


০২ মে, ২০১৭ ০২:৫৯ পিএম

ভালবাসার রসায়ন

ভালবাসার রসায়ন

(‘আর্বতময়ী’ গত ১০ মার্চ ২০১৬ তারিখে মুক্তি পায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের রোমান্টিক থ্রিলারধর্মী টেলিফিল্ম ‘আর্বতময়ী’। টেলিফিল্মটি প্রযোজনা করেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ সম্মানিত উপাধ্যক্ষ ডা. মো: নওশাদ আলী। কাহিনী, চিত্রনাট্য, চিত্রগ্রহণ, পরিচালনা ও সম্পাদনায় নাহিদ হাসান। এতে অভিনয় করেন মেডিকেল কলেজের সকল বর্ষের শিক্ষার্থীরা। বৈচিত্রময় ঘটনার উপর ভিত্তি করে রচিত টেলিফিল্মটি ইতোমধ্যেই বেশ দর্শকপ্রিয়তা পেয়েছে।)

রেজাউল স্যারকে অনেকদিন থেকে চিনি। হোস্টেলের পুকুর ঘাটে বসে বিড়ি টানতেন আর বলতেন, ‘বুঝছো রব, নিজের চেয়ে কাউকে বেশী ভালবেসো না, মেয়েরা ফেন্সিডিলের মত। একবার মায়ায় পড়েছো তো নিজেকে শেষ করেছো।’ তেতাল্লিশ বছর স্যারের বয়স। তখনও বিয়ে করেননি। নিজ গ্রামের এক মেয়েকে ভালবাসতেন। রাজশাহী ভার্সিটিতে পড়ার সময় মেয়েটার বিয়ে হয়ে যায়। স্কুল পড়ুয়া দুই ছেলেসহ মেয়েটা এখন প্রায় মধ্যবয়সী। মাঝে মাঝে রাতে ঘুরতে বের হতাম। একটা ছোট্ট গোল আলো অন্ধকারে উঠানামা করলেই বুঝতাম স্যার একা বসে বিড়ি খাচ্ছেন। কাছে ডেকে গল্প করতেন। প্রায় দিন ঐ মেয়েটার গল্প শুনতাম। একটি বাগানের গল্প, কান্নাকাটির গল্প। ভাবতাম, এতকাল পরে একটি মেয়েকে মনে রাখার মত মানুষও আছে তাহলে!

মেয়েটার সংসার হয়েছে, বাচ্চা হয়েছে। শুধু স্যারের কিছু হয়নি। বিড়ি টানেন আর উদাস হয়ে ধোঁয়া ছাড়েন। প্রচন্ড ঝড়ের রাতেও দেখেছি পুকুর ঘাটে একা একা বসে বিড়ি খাচ্ছেন। এক ঝড়ের রাতে উনাকে সাপে কাটল। গিয়ে দেখি রক্ত ঝরছে গোড়ালির উপর থেকে। ঠান্ডা মাথায় আমাদের বললেন, সাপ আমি দেখেছি, গোখরা সাপ। এখন অমাবশ্যা থাকার কথা। তোমরা অযথা আমাকে নিয়ে টানাটানি করো না। আমরা টানাটানি করেছিলাম এবং সে যাত্রায় উনি বেঁচে গিয়েছিলেন।

এই অসম্ভব দুঃখী মানুষটি আমাদের অনেকের কাছে ছিল দার্শনিকের মত। উনার কিছু কথা আজীবন মনে রেখেছি। উনি প্রায় বলতেন, প্রকৃতি সবচেয়ে ফিট প্রজাতিকে বেছে নেয়; আনফিটকে বিলুপ্ত করে দেয়। স্ত্রী হায়েনা সবচেয়ে শক্তিশালী পুরুষ হায়েনাটিকে বেছে নেয়, যে তার জন্য আর সব পুরুষের সাথে যুদ্ধে জিতে আসতে পারে। কোন মেয়ে তোমার চেয়েও ভাল কাউকে যদি বেছে নেয়, তো একটুও দুঃখ পেও না। এটা তাই, যা প্রকৃতির আর দশটা প্রজাতির মধ্যে ঘটে থাকে।

তাই যখন দেখি কোনো মেয়ে তার বহু পুরোনো প্রেমের ‘খ্যাতায়’ আগুন লাগিয়েছে বা নতুন কাউকে বেছে নিয়েছে, আমি একটুও অবাক হই না। সঙ্গী নির্বাচনে সমগ্র প্রাণিজগতে একটি দুর্বোধ্য স্বার্থপরতা আছে। এই স্বার্থপরতা আসলে স্ত্রী জাতীয় প্রাণীদের মধ্যে বেশি। কোন দয়ামায়া ছাড়াই এরা সবচেয়ে ভাল পুরুষ সংগীটি বেছে নেয়। আমি অবাক হই ছেলেদের প্রতিক্রিয়া দেখে। 

একটা সম্পর্ক যখন ভেঙ্গে যায়, মেয়েটা হাউ মাউ করে কাঁদে। সে জানে না এই হাউমাউ করে কান্নাটা তাকে বাঁচিয়ে দিয়েছে, তাকে ভুলতে শিখিয়েছে। সে তার প্রেমিককে ভুলতে শুরু করে। মেয়েদের ভালোবাসায় 'অষষ ড়ৎ হড়হব ষধ'ি ব্যাপারটি থাকে। কাউকে ভালবাসলে সমগ্র প্রাণ দিয়ে ভালবাসে, কোন কারণে তাকে ঘৃণা করলে সর্বস্ব দিয়েই ঘৃণা করে। আপন-পরের ব্যাপারটায় তাদের চরম ধরণের নিষ্ঠুরতা থাকে।

ছেলেটার জন্য এগুলো খুব সহজ নয়। ব্রেকআপের রাতে সে খুব শান্তিমত ঘুমায়। সকালে হাই তুলতে তুলতে বলে, ওর সাথে আমার ব্রেক আপ হয়ে গেছে। নিজেই নিজেকে বলে, কিচ্ছু হবে না, ও রকম কত মেয়ে আছে! তারপর একটু একটু করে তার খারাপ লাগে। প্রতিদিনের অভ্যাসগুলো তাকে কষ্ট দেয়। রাত এলে ফোনের পুরানো মেসেজগুলো তাকে পোড়ায়। খুব ধীরে সে বুঝে ফেলে, জীবনের একটি অংশ সে হারিয়ে ফেলেছে, যাকে ছাড়া সে অচল। হারানো মানুষটাকে ফিরে পেতে সে তখন যুদ্ধ শুরু করে, তবে দেরি হয়ে যায়। ততদিনে মেয়েটার কাছে সে অচেনা কেউ। হতাশা আকড়ে ধরে তাকে। সিডেটিভের ‘ডিব্বা’ তার আশ্রয় হয়ে যায়। নিজের প্রতি বেখেয়ালে কখন যে বনমানুষ হয়ে যায় বুঝতে পারে না। হাউমাউ কান্নাটা মানুষের শেষ আশ্রয়। বিধাতা এটাও তাকে দেয়নি!

কিছুদিন আগে প্রায় মাঝরাতে একটা ছেলে ইমার্জেন্সিতে এসেছিল আমার কাছে। প্রায় বদ্ধ নেশাখোর। হাতের কোথাও ইনজেকশন দেয়ার শিরা নাই। সব শিরায় সে নিজে ইনজেকশন দিয়েছে। ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ার সময় মোবাইলে একটি মেয়ের সাথে পরিচয়। তারপর প্রেম, অতঃপর ব্রেক আপ। ঘটনা ২০১১ সালের। প্রবাসী একটি ছেলেকে বিয়ে করে স্বামী বাচ্চা নিয়ে ভালোই আছে মেয়েটি। শুধু এই পাগলটার রাত কাটে না। মাঝে মাঝেই আসতে হয় ইমার্জেন্সিতে। ছেলেটার বাবা ব্যবসায়ী। ভদ্রলোক প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে বললেন, ‘স্যার ওর বিয়ে ঠিক করেছি। তারপর থেকে আবার শুরু করেছে। মাঝে কিছুদিন ভাল ছিল। সেনাবাহিনীর টেলিফোন এক্সচেঞ্জে  চাকুরী দিয়েছি। এরকম করলে চাকুরীটাও চলে যাবে।’ ছেলেটাকে দেখে বহুদিন আগের রেজাউল স্যারকে মনে পড়ল। মানুষ তাহলে এমনও করে!

ভালবাসায় পাপ কতটুকু জানি না, তবে প্রায়শ্চিত্ত অনেক বড়। ভালবাসা কাউকে কাউকে ঋণী করে দেয়। আর কেউ কেউ সে ঋণ জীবন দিয়ে শোধ করে। সস্তা ভালবাসার যুগে মানুষ ভালবাসে একজনকে, আর প্রেমে পড়ে দশজনের। এগুলোর নাম ক্রাশ। ভালবাসা ছুটে গেলে এদের দিকে হাত বাড়ায়। এই ক্রাশের যুগেও আপাত কঠিন কিছ মানুষ থাকে। এরা শুধু ভালবাসতেই জানে, ভুলতে শিখে না। এরা হয়ত দার্শনিক হয়ে যায়, নয়ত মাঝরাতে হুটহাট করে ইমার্জেন্সিতে চলে আসে।

লেখক: ডা. আব্দুর রব
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৭, বর্ষ ৩, এপ্রিল-মে ২০১৬ তে প্রকাশিত)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত