ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

ডা. মোঃ মাকসুদ উল্যাহ্‌

চিকিৎসক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল


২৯ এপ্রিল, ২০১৭ ০৪:২৭ পিএম

ভুল চিকিৎসা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা!

ভুল চিকিৎসা ও গ্রেফতারি পরোয়ানা!

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণের আগেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে ডাক্তারদের অনেককেই শুধু আদালতে দৌড়াদৌড়ি করে আর জেলখানায় থেকে দিন পার করতে হবে। পরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রমাণিত হবে তিনি নির্দোষ ছিলেন, চিকিৎসা সঠিক ছিল। আদালতে মামলার পাহাড় তৈরি হবে। সব কিছুই স্থবির হয়ে আসবে। উচ্চবিত্তরা চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়ে টাকাগুলো বিদেশীদের দিয়ে আসবেন। বঞ্চিত হবে দেশ। আড়ালে হাসবে বিদেশীরা। রোগীর সেবার মানসিকতা এবং আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন চিকিৎসকেরা। জাতিকে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হবে।

ডাক্তারের অবহেলার সংজ্ঞা কী? অবহেলা কত প্রকার ও কী কী? অবহেলা পরিমাপের মাপকাঠি কী? একটি বাস্তব ঘটনা বলি। ৪০ বছর বয়সী এক পুরুষ রোগী একদিন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হলেন বুকে ব্যথা নিয়ে। উপস্থিত ডাক্তার দ্রুত তার ইসিজি এবং বুকের এক্স-রে করিয়ে দেখলেন সেগুলো স্বাভাবিক। এ অবস্থায় তিনি নিয়ম অনুযায়ী রোগীর জন্য অন্যান্য পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি তাকে পেপটিক আলসারের ইনজেকশন এবং মুখে খাওয়ার ঔষধ দেন। এ অবস্থায় ডাক্তার রোগীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘এখন ব্যথা কেমন’? রোগী উত্তর দিলেন, একটু কমেছে। তারপর ডাক্তার ওই রোগীর বাকী শারীরিক পরীক্ষা ও জরুরি কাগজপত্র লিখতে লিখতে প্রায় ২৫ মিনিটের সময় রোগী অভিযোগ করতে শুরু করল, ‘আমার জন্য এখনো কিছুই করলেন না’! এই হচ্ছে আমাদের রোগীদের অভিযোগের ধরণ। 

উল্লেখ্য, শুরু থেকে ২৫ মিনিট ওই ডাক্তার শুধু সেই রোগীকে নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। রোগীর এমন ভাবভঙ্গি আমরা লক্ষ করি, ডাক্তারেরা তার জন্য যত কিছুই করুক না কেন, সে সব কিছু অস্বীকার করে। রোগী মনে করে, হাসপাতালে সেই একমাত্র রোগী আর ডাক্তাররা সবাই এসে তাকে সব কিছু মুখে খাইয়ে দেবে, আর সাথে সাথেই বুক ব্যথা কমে যাবে।

এভাবেই অনেক রোগী ডাক্তারের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করেন। রোগীর এমন প্রত্যাশা কখনো যৌক্তিক হতে পারে না যে, ৬০০ শয্যার সরকারি হাসপাতালে ১৮০০ জন ভর্তি হয়ে প্রত্যেকেই সার্বক্ষণিক একজন অধ্যাপককে নিজের পাশে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পাবেন। তারা অনেক সময় সরকারি হাসপাতালের পরিবেশে নিজেরা নাকে রুমাল দেয়, কিন্তু কখনোই চিন্তা করে দেখে না, এ ধরনের পরিবেশে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, সর্বোচ্চ শিক্ষিত ডাক্তারেরা কিভাবে তাদের চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

জাতির উচিত এই ত্যাগের স্বীকৃতি দিয়ে নিজেদের উন্নত বিবেকবোধের পরিচয় দেয়া। স্বীকৃতি দিলে ডাক্তারদের কর্মস্পৃহা বাড়বে। অনেক ডাক্তারই সারা দিনের পাশাপাশি আরামের ঘুম হারাম করে রাতেও অসুস্থ্য পীড়িতদের চিকিৎসা দেন। গভীর রাতে জরুরি মুহূর্তে যখন আর কোনো রক্তদাতা পাওয়া যায় না, তখন সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে ডাক্তাররাই মুমূর্ষু রোগীকে নিজের শরীর থেকে রক্ত দিয়েছেন, এমন ঘটনাও ঘটেছে। এমন অসংখ্য অপ্রকাশিত ঘটনায় বেঁচে গেছে অগণিত রোগীর জীবন। কখনো কখনো নিজেরা চাঁদা তুলে রোগীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন তারা। দেশে এ রকম অনেক ডাক্তার আছেন, যারা প্রায় প্রতিদিনই সরকারি হাসপাতালে কোনো না কোনো গরীব রোগীকে চিকিৎসার জন্য তার সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সাহায্য করেন। নিজের চেম্বার থেকে গরীব রোগীকে সরকারি হাসপাতালে এনে চিকিৎসা দেয়ার ঘটনা ডাক্তারদের নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। 

হাসপাতালে আসা রোগীর স্বজনেরা স্বাভাবিকভাবেই বেশ আবেগপ্রবণ থাকেন। একদিকে নিজের নিকটজনের অসুস্থতা অপরদিকে হাসপাতালের সুযোগ সুবিধার সীমাবদ্ধতা অনেকক্ষেত্রেই তাদেরকে হতাশ করে দেয়। ডাক্তারদের প্রতি লালন করা অযাচিত উচ্চাকাঙ্খার প্রতিফলন না দেখতে পেয়ে তারা যে অভিযোগ করেন তার বেশীর ভাগই বাস্তবতা বিবর্জিত। কোনো ডাক্তার কখনোই ইচ্ছা করে রোগীকে ভুল চিকিৎসা দেন না। কোনো মুমূর্ষু রোগীকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী ঔষধ প্রয়োগ করার পর যদি তিনি মৃত্যুবরণ করেন তার অর্থ এই নয় যে, তা ভুল চিকিৎসা ছিল। ডাক্তারদের ক্ষমতা নেই সব রোগীকে সুস্থ করার। জীবন-মৃত্যু আল্লাহর কাছে নির্ধারিত। এ বাস্তবতা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই।

চিকিৎসা ভুল হয়েছে কি না; সেটা ডাক্তাররাই নিশ্চিত করতে পারবেন। সঠিক তদন্তের মাধ্যমে ভুল চিকিৎসা প্রমাণিত হওয়ার আগে রোগী, রোগীর স্বজন, সাংবাদিক বা অন্য কেউ এ কথা বলতে বা প্রচার করতে পারেন না । 

চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিপরীতে সুনির্দিষ্ট অপরাধ প্রমাণের আগেই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে ডাক্তারদের অনেককেই শুধু আদালতে দৌঁড়াদৌঁড়ি করে আর জেলখানায় থেকে দিন পার করতে হবে। পরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই প্রমাণিত হবে তিনি নির্দোষ ছিলেন, চিকিৎসা সঠিক ছিল। আদালতে মামলার পাহাড় তৈরি হবে। সব কিছুই স্থবির হয়ে আসবে। উচ্চবিত্তরা চিকিৎসার জন্য বিদেশ গিয়ে টাকাগুলো বিদেশীদের দিয়ে আসবেন। বঞ্চিত হবে দেশ। আড়ালে হাসবে বিদেশীরা। রোগীর সেবার মানসিকতা এবং আগ্রহ হারিয়ে ফেলবেন চিকিৎসকেরা। জাতিকে এর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক ফল ভোগ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ডাক্তার এবং তার পরিবারের চেয়ে জাতীয় অর্থনীতির ক্ষতি হবে বেশি। এ অবস্থা চলতে থাকলে ভবিষ্যতে তরুণ মেধাবী ডাক্তাররা আরো বেশি করে বিদেশমুখী হবেন। কারণ, আত্মরক্ষা করা মানুষের সহজাত ধর্ম। দুর্বৃত্তদের হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার জন্য তারা সারা জীবন লেখাপড়া করে ডাক্তার হন না।

অবহেলা বা ভুল চিকিৎসার অভিযোগে বা অন্যায় দাবিতে ডাক্তারকে লাঞ্ছিত করা এবং হাসপাতাল-ক্লিনিক ভাঙচুর করা হলে বরং সেক্ষেত্রে দেশের স্বার্থেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ডাক্তারের কর্তব্য-কাজে বাঁধা দেয়া, হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা এবং মানহানি ও ক্ষতিপূরণ মামলা করা এবং অজামিনযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানার আইন থাকা উচিত। কারণ, হাসপাতাল ভবনসহ যাবতীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি অবশ্যই জাতীয় সম্পদ। ডাক্তাররা যেন নির্বিঘেœ পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারেন এবং একই সাথে রোগীরাও যাতে বঞ্চিত না হন পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতও যাতে ধারাবাহিকভাবে স্থিতিশীলতা অর্জন করতে পারে এ বিষয়গুলো লক্ষ্য রেখে ইতিবাচক আইন প্রণয়ন জরুরী। সমান্তরালে সৎ, যোগ্য ও দায়িত্বশীল ডাক্তার তৈরীর প্রচেষ্টা আরো বৃদ্ধি করা দরকার।
 

(মেডিভয়েস : সংখ্যা ৭, বর্ষ ৩, এপ্রিল-মে ২০১৬ তে প্রকাশিত)

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত