ঢাকা রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯, ৫ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৫ ঘন্টা আগে
২৯ এপ্রিল, ২০১৭ ১১:৪২

একটি ফার্মেসির দোকান থেকে আজকের স্কয়ার গ্রুপ-স্যামসন এইচ চৌধুরী

একটি ফার্মেসির দোকান থেকে আজকের স্কয়ার গ্রুপ-স্যামসন এইচ চৌধুরী

হ্যাঁ, তিনি হলেন একজন সৎ, সফল ব্যাবসায়ী উদ্দ্যোক্তা প্রয়াত স্যামসন এইচ চৌধুরী। যিনি একটি ফার্মেসির দোকানি থেকে হয়েছেন স্কয়ার গ্রুপের কর্ণধার ! এমন একজন সম্পর্কে জানতে কার না ইচ্ছা করে। জানা যায় স্কয়ার গ্রুপের নামকরনের কারনটি। ছোটবেলায় গাছ গাছালি, লতাপাতা নিয়ে খেলা ছিল যার অভ্যাস। হামানদিস্তায় লতাপাতা পিশে খেলার ছলে ঔষুধ বানিয়ে মজা পেত। মানুষের হাত পা কেটে গেলে গাছের পাতা ছেঁচে লাগিয়ে দিত। বাবা ছিলেন চিকিৎসক। সে সুবাদেই ওষুধ তৈরির প্রতি তার আগ্রহ ছিল প্রচুর। লেখাপড়া শেষ করে কিছুদিন চাকুরী করেছেন। ভাল লাগেনি। বাবাকে বললেন টাকা দাও, ব্যবসা করব। বাবার কাছ থেকে টাকা নিয়ে একটি ফার্মেসী খুললেন।

চিকিৎসায় বাবার খুব সুনাম ছিল। দূর দুরান্ত থেকে লোকজন আসতো। এক সময় দেখলেন এমবিবিএস ডাক্তারের প্রতি রোগীরা বেশি ঝুঁকছে। তার এক বন্ধু ডাক্তার ছিল। তখন ঐ ডাক্তারকে গিয়ে বলা হল হাটবারের দিন ফার্মেসিতে বসতে হবে। ফার্মেসি ব্যবসা বেশ জমে উঠল। এভাবে ওষুধ বিক্রয় করতে করতেই হঠাৎ একদিন মাথায় চিন্তা এল। আমরা তো ওষুধ তৈরি করতে পারি। যে কথা সেই কাজ। চার বন্ধু এক সঙ্গে মিলে শুরু করল ওষুধ তৈরির কাজ। ২০-২৫ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে ওষুধ তৈরির কাজ শুরু করেছিলেন। দেড় বছরে তাদের পুঁজি বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ হাজার টাকা। আর চার বছর পর মুনাফা করতে শুরু করেন।

স্কয়ার আজ বাংলাদেশে শীর্ষ স্থানীয় শিল্প গ্রপ। আর এর স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন স্যামসান এইচ চৌধুরী। ৫৫ বছর আগে স্যামসান এইচ চৌধুরীর নেতৃত্বে চার বন্ধু মিলে পাবনা শহরে শালগাড়িয়া এলাকায় যে ছোট্ট শিল্প প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সেটি আজ মহিরুহ। ১৯৫৮ সালে যে প্রতিষ্ঠান দিয়ে স্কয়ারের যাত্রা শুরু হয়েছিল তার নাম ছিল স্কয়ার ফার্মা। পুঁজির পরিমাণ ছিল প্রায় ২০ হাজার টাকা। স্যামসন এইচ চৌধুরীরা চার বন্ধু কয়েক দফায় এই টাকার যোগান দিয়েছিলেন। একটি বসত বাড়ীতে স্থাপন করা সেই কারখানায় শ্রমিক ছিল মাত্র ১২ জন। ১৯৬৪ সালে স্কয়ার ফার্মা নাম পরিবর্তন করে করা হয় স্কয়ার ফর্মাসিউটিক্যাল লিঃ। ক্ষুদ্র পরিসরে হলেও ছিমছাম ছিল কারখানাটি। এখনও স্কয়ারের প্রত্যকটি কর্মকান্ডে এ ব্যাপারটি লক্ষ্য করা যায়। লোক দেখানো কোন ব্যাপার নেই। কিন্তু সবকিছুর মধ্যে আছে ছিমছামভাব ও স্বচ্ছতা। আছে আধুনিকতা ও প্রযুক্তির ছোঁয়া।

কঠোর নিয়মের মধ্যে দিয়ে চলছে সবকিছু। স্কয়ার নামের মহত্ব আরও অনেক গভীরে। সেদিন চার বন্ধু মিলে আট হাতে গড়ে তুলেছিলেন এক বর্গাকার চতুর্ভুজের। স্কয়ার মানে হচ্ছে সেই বর্গাকার চতুর্ভূজ। কিন্তু পারফেক্ট না হলে যেমন চতুর্ভূজ বর্গাকার হয় না। তেমনি নৈতিক বিশুদ্ধতা না থাকলে জীবনে সাফল্য লাভ করা যায় না। সেই পারফেক্টের চিন্তা থেকেই তাদের গ্র“পের নামকরণ করা হয় স্কয়ার। এ প্রসঙ্গে স্যামসান এইচ চৌধুরী ঐ সময় বলেছিলেন, স্কয়ার মানেই পারফেকশন। এ জন্যই আমরা নাম রাখলাম স্কয়ার। “আমরা আমাদের পণ্যের মান নিয়ে কখনোও আপোষ করিনি। ফলে এগিয়ে যাই। ১৯৫৬ সালে আমরা ওষুধ তৈরি শুরু করি, তখন কলকাতার সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ ছিল। ওষুধ, কাঁচামাল সবই আসতো তখন কলকাতা থেকে। ফলে আমরা পাবনায় প্রথম শিল্প উপস্থাপন করি। তখন আব্দুল হামিদ খানের উন্নয়নের সফলতা দেখে মনে হয়েছিল, উনি পারলে আমরা পারবো না কেন? তাকে অতিক্রম করতে আমাদের ১২/১৩ বছর সময় লেগেছিল।

১৯৫৬ সালে শুরু করলেও ১৯৫৮ সালে আমরা পার্টনারশিপ ব্যবসায় যাই। ১৯৬১ সালে আমাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে প্রাইভেট লিঃ কোম্পানীতে রুপান্তরিত করি। ১৯৬৪ সালে স্কয়ার পাবলিক লিঃ কোম্পানীতে পরিণত হয়। তখনকার দিনে অনেক বাঁধা ছিল। বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রিত ছিল। পাশ বইয়ের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা নিতে হতো। তখন এক ডলারের দাম ছিল ১.২৪ রুপী। পাবনা থেকে ঢাকা আসতে তখন ১৪ ঘন্টা সময় লাগতো। আর চট্রগ্রামে ছিল প্রধান আমদানী রফতানী নিয়ন্ত্রকের অফিস। বুঝুন তখন যাতায়াতের কি অবস্থা ছিল? প্রথম কারখানা যে ওষুধটি তৈরি হয়েছিল। সেটি ছিল রক্ত পরিশোধনের এস্ট্রন সিরাপ। দেশীয় আমদানিকারকদের কাছ থেকে চড়া দামে কাঁচামাল কিনে তৈরি করা হতো এই ওষুধ। ওষুধ তৈরিতে মানের সঙ্গে আপোষ করার কোন প্রশ্ন ছিল না। ফলে দাম পড়ে যায় বেশি। নাম করা অন্য কোম্পানীর একই ওষুধের দাম কম হলেও বাজারে ছাড়া হয় এস্ট্রন সিরাপ। গুণগত মানের কারণেই এই সিরাপের প্রেসক্রিপশন করতে থাকেন স্থানীয় ডাক্তারেরা।

ফলে এক সময় বাজারের নাম করা কোম্পানীর ওষুধের চেয়ে বেশি চলতে থাকে স্কয়ারের তৈরি এ সিরাপ। এর কিছুদিন পর রফতানী শুরু হয় এই সিরাপের। কিন্তু পাকিস্থান সরকার কর্তৃক বৈদেশিক আয়ের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ থাকার সামর্থ্য থাকলেও শুরুর দিকে ওষুধের কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য তাকে অনেক বাধা বিপত্তি মোকাবেলা করতে হয়েছে। ওষুধের কাঁচামাল আমদানীর লাইসেন্সের জন্য ঘুরতে হয়েছে সরকারের দ্বারে দ্বারে। পাবনা থেকে ঢাকায় এসে লাইসেন্স পাওয়ার জন্য তদ্বির করা ছিল এক দুঃসাধ্য ব্যাপার। কিন্তু কোন বাধা তাকে ঠেকিয়ে রাখতে পারেনি। অবশেষে একদিন দেখা মিলল তৎকালীন আমাদানী রফতানী নিয়ন্ত্রক শফিউল আযমের।

তিনি আগ্রহ সহকারে শুনলেন স্যামসান এইচ চৌধুরীর শিল্প গড়ার আগ্রহের কথা। বক্তব্যে সন্তুষ্ট হয়ে তাকে দেওয়া হলো কাঁচামাল আমদানীর লাইসেন্স। তবে শর্ত দেওয়া হলো ঐ লাইসেন্সের অধীনে ৬ মাসে ২ হাজার রুপীর সমান মার্কিন ডলারের কাঁচামাল আমদানী করা যাবে। এতেই খুশী হয়ে ফিরে যান পাবনায়। ২ বছর চেষ্টার পর লাইসেন্স পাওয়ার আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে স্কয়ার ফার্মেসিটিক্যাল কারখানার মালিক-শ্রমিক সকলের মাঝে। নতুন উদ্যমে স্কয়ারের যাত্রা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত এই আমদানীর পরিমাণ ২ কোটিতে বৃদ্ধি পায়। যে কাঁচামাল আমদানী লাইসেন্সের জন্য এক সময় স্যামসন চৌধুরী অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।

সেই স্কয়ার আজ নিজেই অনেক ওষুধের কাঁচামাল তৈরি করছে। চারজন অংশীদারের সমান মালিকানায় শুরু হয় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের কর্মযজ্ঞ। স্কয়ারের নামকরণ প্রসঙ্গে স্যামসন চৌধুরী বলেছিলেন, ‘এটি চার বন্ধুর প্রতিষ্ঠান। তাছাড়া আমাদের চার হাত সমান। এর লোগোও তাই বর্গাকৃতির।’ ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রির লোকজনের কাছে স্যমাসন এইচ চৌধুরী এক আইকন। ছোট্ট ওষুধ কারখানা স্কয়ারকে তিনি এমন এক পর্যায়ে নিয়ে গেছেন, যেখানে স্কয়ার পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানির তালিকায়ও শীর্ষে উঠে এসেছে। ১৯৫৮ সালের সেই ছোট উদ্যোগ বর্তমানে বিশাল গ্রুপে পরিণত। ২৭ হাজার কর্মীর এই বিশাল পরিবারের বার্ষিক আয় ৩০ কোটি ডলার। ‘স্কয়ার’ শুধু ওষুধেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। টেক্সটাইল, টয়লেট্রিজ, কনজ্যুমার প্রডাক্টস, স্বাস্থ্যসেবা, মিডিয়া, এমনকি বাড়ির রান্নাঘরেও সগৌরব উপস্থিতি স্কয়ারের। মিডিয়ায় উপস্থিতি মাছরাঙা টিভির মাধ্যমে। ব্যবসা মানেই মুনাফা- এ ধারণাকে অনেকটাই ভুল প্রমাণ করেছে স্যামসন এইচ চৌধুরীর নেতৃত্বে স্কয়ার গ্রুপ। এ কথার সঙ্গে দ্বিমত তার চরম প্রতিপক্ষও করবেন না। ‘আমার কাছে কোয়ালিটিই সবার আগে। সব পর্যায়েই আমরা কোয়ালিটি নিশ্চিত করি’ বলতেন কোয়ালিটিম্যান স্যামসন চৌধুরী।

তার প্রমাণও রেখে গেছেন স্কয়ার ব্রান্ডিংয়ের সব পণ্য আর সেবাতে এই কর্মবীর। ব্যবসা ও বিপণনে সাফল্যের জন্য কোনও বিশেষ কৌশল প্রসঙ্গে স্যামসন চৌধুরী বলতেন, ‘আমি সব সময় স্বপ্ন দেখেছি বিশ্বের নামিদামি ওষুধ কম্পানির আদলে গড়ে উঠুক স্কয়ার; যেখানে নিয়মিত গবেষণা হবে, উন্নয়ন হবে, কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণ থাকবে সব পর্যায়ে। এখানে প্রায় ৮০ ভাগই হোয়াইট-কলার জব। তাঁদের সবাই গুণ-মান বজায় রাখার ব্যাপারে সচেষ্ট, প্রশিক্ষিত। আমরা একটা পদ্ধতির উদ্ভাবন করেছি। আমাদের ওষুধের কোয়ালিটি আজ দেশে-বিদেশে স্বীকৃত। ডাক্তাররা অবিচল আস্থার সঙ্গে আমাদের ওষুধ প্রয়োগ করেন। পৃথিবীর ৫০টি দেশে আমাদের ওষুধ যাচ্ছে।’ ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কম্পানিগুলোর এক ধরনের যথেচ্ছচার দেখা যায়। এ ব্যাপারে স্কয়ার ফার্মার কর্ণধার বলেন, `মানসম্পন্ন ওষুধের দাম নির্ধারণের ব্যাপারে সরকারের কার্যকর নীতিমালা না থাকায় আমাদের অসুবিধা হচ্ছে। মাছের বাজারে তাজা মাছ আর পচা-বাসি মাছের দাম এক হয় না। ওষুধ কেনার সময় সে কথা ভুলে গেলে চলবে না।` দেশের গুরুত্ব¡পূর্ণ অনেক সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এই শিল্পপতি। তিনি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এমসিসিআই) সভাপতি, মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজ ডেভেলপমেন্ট অ্যাসিস্টেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস’র (এমআইডিএএস) চেয়ারম্যান, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি, ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই’র পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিকলি লিস্টেড কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও ছিলেন তিনি।

তিনি ঢাকা ক্লাবের ও আজীবন সদস্য ছিলেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের চেয়ারম্যান ছিলেন ২০০৪-২০০৭ সাল পর্যন্ত। শাহবাজপুর টি এস্টেট ও মিউচুয়াল স্ট্রাস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যানও ছিলেন তিনি। ২০০৯-১০ অর্থ বছরে সেরা করদাতা নির্বাচিত হয়েছেন স্কয়ার গ্রুপের উদ্যোক্তা স্যামসন চৌধুরী। তার সাথে ছিলেন তাঁর তিন ছেলে তপন চৌধুরী, অঞ্জন চৌধুরী ও স্যামুয়েল চৌধুরী। স্যামসন চৌধুরী ২০০৯-১০ অর্থবছরে ব্যক্তি করদাতা হিসেবে আয়কর দিয়েছেন এক কোটি ৬৩ লাখ ২২ হাজার ১৮১ টাকা। তাঁর ছেলে তপন চৌধুরী আয়কর দিয়েছেন এক কোটি তিন লাখ ৪৩ হাজার ৩৫ টাকা। অঞ্জন চৌধুরী আয়কর দিয়েছেন ৭৭ লাখ ১২ হাজার ৮৩২ টাকা। স্যামুয়েল এস চৌধুরী ৭৬ লাখ ৫৫ হাজার ৬৮৪ টাকা আয়কর দিয়েছেন। নিজের শখ-আহ্লাদ লালন করতেন স্যামসন চৌধুরী। ছবি তুলতেন অনেক আগ থেকে। ১০-১২টি ক্যামেরা ছিল তার। কাজের ফাঁকে মাঝেমধ্যে ছবি তোলার জন্য বের হতেন তিনি। ছবি তুলেছেন ঢাকা শহরের পুরনো ঐতিহ্যের নিদর্শনগুলোর।

সূত্র: বিডি সারাদিন.কম

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত