ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

ডা. শিরীন সাবিহা তন্বী

মেডিকেল অফিসার, রেডিওলোজি এন্ড ইমেজিং ডিপার্টমেন্ট,

শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, বরিশাল।


২৭ এপ্রিল, ২০১৭ ০১:০৫ পিএম

হাসপাতালের চালচিত্র: পড়ুন এবং চোখ বন্ধ করে ভাবুন

হাসপাতালের চালচিত্র: পড়ুন এবং চোখ বন্ধ করে ভাবুন

আপনি বাংলাদেশে বসবাসরত? আপনি ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ, প্রশাসন/পুলিশ/ট্যাক্স/সমাজ সেবা কর্মকর্তা?? কিংবা শিক্ষক? জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট??
ডাক্তার ভিন্ন আপনি যেই হোন। পড়ুন এবং চোখ বন্ধ করে ভাবুন।

● হাসপাতালের রেডিওলোজি বিভাগের সামনে আসতেই এক পরোপকারী রোগীর সাহায্যে এগিয়ে গেলেন। এক্স রে করতে হবে শুনে কত টাকা লাগবে, কি পরীক্ষা, কোন রুমে যাবে সব বললেন। রোগীর পরীক্ষায় ৩০০ টাকা লাগবে। রোগীর কাছে ১০০০ টাকার নোট। মানি রিসিট কাটতে টাকাটা নিল সে। দু চার দশ মিনিট পর রোগী রিসিপশন রুমে ঢুকে পরোপকারীকে খুঁজতে লাগল। তিনি এক হাজার টাকার নোট সমেত হাওয়া। রোগীর গগন বিদারী কান্না।

● সিসি টিভি ক্যামেরা ফুটেজ দেখতে চাইলাম। পরিচালক স্যারের রুমে গিয়ে রেডিওলোজি বিভাগের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম পরোপকারী কত সচেতন। বিনামূল্যের সরকারী হাসপাতাল। সকলের অবাধ আসা যাওয়া। ওরা সিসি টিভির আওতার বাইরে দাঁড়িয়েই এক হাজার টাকা নিয়ে লোপাট।আই টি এক্সপার্ট আরো বহু কিছু জানাল। রাত বারো টার পরে যারা হাসপাতালের বেঞ্চিতে ঘুমায়, তারা ক্যামেরার ফেস ঘুরিয়ে বা ক্যামেরার উপর গামছা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। সব কিছু হয়ে যায় ইনভিসিবল।

● টয়লেটে পানি জমা সমস্যা। পরিচালক স্যার পরিদর্শনে গেলেন। জানা গেল, টয়লেটে বদনা নাই। রোগীরা পানির বোতলের কাটা অংশকে ব্যবহার করে বদনা হিসেবে। ওগুলো এই বিপত্তি ঘটায়। একদিনে পঁচাত্তর টি বদনা কিনে দিলেন পরিচালক স্যার। পনের দিন পর স্যার আবার পরিদর্শনে গেলেন।জানা গেল, ত্রিশটি বদনা নেই। হাসপাতাল থেকে বাড়ী ফেরার সময়, ভিখারী, টোকাই কদিনেই চল্লিশ খানা বদনা লোপাট করেছেন।

● আলট্রাসনো রুমে সহকারী বুয়া চাকরী জয়েন করার সময় বয়স ছিল ত্রিশ। অফিসিয়ালি আঠের। তিনি অক্ষর জ্ঞানহীন। একটি নাম ও বুঝেন না। দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ। পাস করা মেয়ে গুলো ফ্যাঁ ফ্যাঁ করে ঘুরছে। আর ষাটোর্ধ বুড়ীর আরো সাত আট বছর চাকরী আছে। এই বারো বছরের বয়স চুরি! এত বয়স্ক একজন। মেজাজ খিটখিটে। রোগীর সাথে পোলাইট হবে কি, নিজেই তো বাধ্যক্যজনিত অসুস্থ। তিনশ টাকায় জব শুরু করেছিল এখন বেতন বাইশ হাজার টাকা। এই ফাঁকে বলে রাখি, ইন্টার্ন ডাক্তারের বেতন পনের হাজার টাকা। আর ইন্টার্ন শেষ হলে অনারারী ডাক্তারের বেতন শূন্য। একজন ক/খ না জানা লোকের বেতন বয়স শেষ হবার বারো বছর পর ও যে সরকার বাইশ হাজার করে গুনছেন। সেখানে উচ্চ শিক্ষিত এমবিবিএস ডাক্তারদের জন্য সরকারের বরাদ্দ নেই। গরীব বৃদ্ধা। স্বামীর মৃত্যুর পর একা সংসারের ঘানি টানছে। আমরা ডাক্তাররা মানবিক। সব জেনে চুপ থাকি। মাঝে মাঝে ভয় দেখাই। রোগীর সাথে ক্যাচ ম্যাচ করলে আপনাকে কিন্তু ট্রলী ঠেলতে পাঠাব!

● একটি প্রতিষ্ঠানে সব গ্রেডের কর্মকর্তা কর্মচারী লাগে। প্রতিটি সিনিয়র নার্স এবং একশ শতাংশ ডাক্তারদের অভিযোগ। চতুর্থ শ্রেনীর নিয়োগ না হওয়ায় যারা আছেন তারা সকলে স্বেচ্ছাচারী। কোন ডাক্তারের রুমে ডিউটি পালনে বেয়াদবী করলে তাদের অন্য রুমে দেয়া হয়। ঐ ডাক্তার তখন বুয়ার দায়িত্ব নিজেই করেন। আর লোক পাওয়া যায় না। নার্সদের শুধু সংখ্যাটাই বাড়ানো হয়েছে। কোয়ালিটি একেবারে পুওর। ওদের ভাষায় আগে তারা সরকারী ইনিষ্টিটিউড থেকে পাস করে বিভিন্ন হাসপাতালে চাকরী করে অভিজ্ঞতা নিয়ে সরকারী জবে ঢুকত। এবারে নামহীন বহু ইনিষ্টিটিউড থেকে এসে কোন অভিজ্ঞতা ছাড়াই ঢুকেছে। সংখ্যায় বিপুল। সেবার মনোভাব তো দূর, পেশাদারীত্বের মনোভাবটুকুও নাই। সম্মানিত চিকিৎসকদের অসম্মানিত করা, ইন্টার্ন ডাক্তারদের এমনকি মিড লেভেল ডাক্তারদের আদেশ, অনুরোধ, উপরোধ উপেক্ষা করার ঘটনা রোজ ঘটছে।

অথচ আপনি প্রতিরক্ষার হাসপাতালে যান।  এই সেবিকারাই সেখানে সত্যিকারের সেবা দিচ্ছে। সরকারী হাসপাতালের কমান্ডিং সিস্টেম ভেঙ্গে দিতে আছে অকারন সংগঠন/ অতি রাজনীতি/ অপরাজনীতি। রাজনীতির যেটা মূলনীতি তাতে রাজনীতির মাধ্যমেই আরো উন্নত কমান্ডিং সিস্টেম থাকার কথা।

● আপনি হাসপাতালের গেটে নামা থেকে রুম পর্যন্ত ঢুকতে একজন কলেজ শিক্ষক, অন্য অফিসার, ভার্সিটি শিক্ষক দশ বিশটা সালাম পাবেন। আর ডাক্তারের? সিড়ির গোঁড়াতে নিত্য নতুন বাহানায় পা জড়িয়ে ধরবে ভিক্ষুক। সিড়িতে রোগীর লোক, রোগী হয় গায়ে থু থু ছিটাবে, তরকারীর ঝোল ফেলবে নইলে আরো মারাত্মক কিছু। কিছু অল্পবয়সী ফাজিল আপনি নারী ডাক্তার হলে সিটি দেবে। গায়ে ধাক্কা তো কমন। আর বহু লোক এসে আপনার কনুই ঠেলে বলবে, মনু দেহ তো,, এই কাগজে কি লেখছে?? এই পরীক্ষা কোনহানে??? শুনতে যত সহজ, প্রতিদিন এই ফেস করা ডাক্তাররূপী মানুষগুলির পিন্ডি চটকানো যত আনন্দের, ডাক্তারের জীবন ততই কঠিন।।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত