ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর ২০১৯, ২ কার্তিক ১৪২৬,    আপডেট ৪২ মিনিট আগে
অনির্বাণ আবরার

অনির্বাণ আবরার

Student of Mandy Dental College. He is a Traveler & Freelance Journalist. He is also a

  • CEO and founder of Doctorch.com
  • Founder member of Sohay
  • Founder of Ghurist Team Bangladesh.

২৭ এপ্রিল, ২০১৭ ১২:০৭

দাঁত ব্যথা : নিদারুণ এক যন্ত্রণার ইতিহাস

দাঁত ব্যথা : নিদারুণ এক যন্ত্রণার ইতিহাস

ধ্যযুগের একটা শহরের বাজারে, জাঁকালো পোশাক-পরা একজন হাঁতুড়ে ডাক্তার দম্ভের সঙ্গে বলছেন যে, তিনি কোনোরকম ব্যথা না দিয়েই দাঁত তুলতে পারেন। তার সহকারী, কিছুটা গড়িমসি ভাব করেন, সামনে এগিয়ে যান আর সেই হাতুড়ে ডাক্তার তার সহকারীর একটা দাঁত তোলার ভান করেন, একটা রক্তাক্ত দাঁত ওপরে তুলে সবাইকে দেখান। এরপর, দাঁত ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছে এমন ব্যক্তিরা সঙ্গে সঙ্গে টাকা দিয়ে দাঁত তুলতে উৎসাহিত হয়। প্রচণ্ড জোরে ড্রাম তুরী বাজানো হয়, যাতে তাদের ব্যথার চিৎকার শুনে অন্যেরা দাঁত তোলা থেকে বিরত না হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই, সেই জায়গায় কখনো কখনো মারাত্মক পচন ধরে কিন্তু ততদিনে সেই হাঁতুড়ে ডাক্তার উধাও হয়ে গিয়েছেন

আজকে দাঁত ব্যথায় ভুগছে এমন অল্প লোকেরই এই ধরনের ভণ্ড ব্যক্তিদের কাছে দাঁত তোলার জন্য যেতে হয়। আধুনিক দন্তচিকিৎসকরা ব্যথা উপশম করতে পারে এবং তারা প্রায়ই দাঁত পড়ে যাওয়াকে রোধ করতে পারে। তা সত্ত্বেও, অনেক লোক একজন দন্তচিকিৎসকের কাছে যেতে ভয় পায়। দন্তচিকিৎসকরা তাদের রোগীদের ব্যথা উপশম করার বিষয়টা প্রথমে কীভাবে শিখেছিল, তা বিবেচনা করা আমাদের হয়তো আধুনিক দন্তচিকিৎসার প্রতি কৃতজ্ঞ হতে সাহায্য করবে

সাধারণ সর্দিকাশির পর দন্তক্ষয়ই হচ্ছে মানবজাতির দ্বিতীয় সাধারণ রোগ। এটা শুধুমাত্র আধুনিক সময়ের কোনো রোগ নয়। রাজা শলোমনের কাব্য প্রকাশ করে যে, "প্রাচীন ইস্রায়েলে বয়স্ক লোকেদের অল্প কয়েকটা দাঁত থাকার অস্বস্তি এক সাধারণ বিষয় ছিল।" - উপদেশক ১২:.

এমনকি রাজবংশীয় লোকেরাও ভুগেছিল এই দাঁত ব্যথা নামক যন্ত্রণায়। এলিজাবেথ ১ম, যদিও ইংল্যান্ডের রানি ছিলেন কিন্তু তিনি পর্যন্ত দাঁত ব্যথা থেকে রেহাই পাননি। রানির কালো দাঁত দেখে একজন জার্মান পর্যটক রিপোর্ট করেছিলেন যে, ‘প্রচুর পরিমাণে চিনি খাওয়ার কারণেএটাইংরেজদের একটা সাধারণ খুঁত বলে মনে হয়।১৫৭৮ সালের ডিসেম্বর মাসে, দাঁত ব্যথার কারণে রানি রাতদিন প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ভুগেছিলেন। তার চিকিৎসকরা তাকে রোগাক্রান্ত দাঁত তুলে ফেলার পরামর্শ দিয়েছিল কিন্তু তিনি তাতে সম্মত হননি, সম্ভবত ব্যথার কথা ভেবে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। তাকে দাঁত তুলতে রাজি করানোর জন্য লন্ডনের বিশপ জন এলমার, রানির সামনে সম্ভবত তার নিজের একটা ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত তুলে ফেলার ব্যবস্থা করেছিলেনএক দুঃসাহসিক আত্মত্যাগমূলক কাজ, কারণ এই বয়স্ক ব্যক্তির মাত্র অল্প কয়েকটা দাঁতই অবশিষ্ট ছিল!

সেই সময়ে, যেসব সাধারণ লোকের দাঁত তোলার প্রয়োজন হতো, তারা এরজন্য একজন ক্ষৌরকার অথবা এমনকি একজন কামারের কাছে যেত। কিন্তু যখন বেশির ভাগ লোকের চিনি কেনার সামর্থ্য হয়েছিল, তখন থেকে দাঁত ব্যথা বৃদ্ধি পেয়েছিল আর সেইসঙ্গে দাঁত তোলায় দক্ষ ব্যক্তিদের চাহিদাও বেড়ে গিয়েছিল। এই কারণেই, কিছু চিকিৎসক এবং সার্জন রোগাক্রান্ত দাঁতের চিকিৎসা করার প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছিল। কিন্তু, এই বিষয়টা তাদের নিজে নিজে শিখতে হয়েছিল কারণ বিশেষজ্ঞরা ঈর্ষাবশত তাদের ব্যবসায়িক কলাকৌশলকে গোপন রাখত। ছাড়া, এই বিষয়ের ওপর বইপত্রের সংখ্যাও খুব বেশি ছিল না

এলিজাবেথ ১ম এর সময়কালের একশো বছর পর, চতুর্দশ লুই ফ্রান্সে রাজা হিসেবে শাসন করেছিলেন। তিনি তার জীবনের অধিকাংশ সময় দাঁত ব্যথায় ভুগেছিলেন এবং ১৬৮৫ সালে তিনি তার ওপরের পাটির বাম দিকের সব দাঁত তুলে ফেলেছিলেন। কেউ কেউ দাবি করে যে, রাজার দাঁতের সংক্রমণই সেই বছর তার দ্বারা নেওয়া এক ধ্বংসাত্মক সিদ্ধান্তের কারণ, যার ফলে তিনি ফ্রান্সে ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রদান করার এক চুক্তিতে সই করেছিলেন, যে-পদক্ষেপটা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে এক তীব্র তাড়নার ঢেউ বইয়ে দিয়েছিল

আধুনিক দন্তচিকিৎসার উৎপত্তি নিয়ে আগ্রহ থেকে ঘাঁটাঘাটি করতে গিয়ে দেখা যায় প্যারিসের শৌখিন সমাজে, চতুর্দশ লুইয়ের ব্যয়বহুল জীবনধারার প্রভাব দন্তচিকিৎসা পেশার উৎপত্তি ঘটিয়েছিল। বিচারালয় এবং সমাজে সফল হওয়াটা একজনের বাহ্যিক সৌন্দর্যের ওপর নির্ভর করত। খাবার খাওয়ার চাইতে চেহারার সৌন্দর্য রক্ষায় নকল দাঁত বেশি ব্যবহৃত হওয়ায় এর চাহিদা বেড়ে গিয়েছিল আর এর ফলে সার্জনদের দাঁত ব্যথার শিকার অভিজাত শ্রেণীর লোকেদের জন্য কর্মরত দন্তচিকিৎসকদের এক নতুন দলের উদ্ভব হয়েছিল। প্যারিসের প্রধান দন্তচিকিৎসক ছিলেন পিয়ার ফশার। যিনি ফ্রেঞ্চ নৌবাহিনীতে থাকার সময় অপারেশন করতে শিখেছিলেন। তিনি সেই সার্জনদের সমালোচনা করেছিলেন, যারা দাঁত তোলার কাজটা অদক্ষ ক্ষৌরকার হাঁতুড়ে ডাক্তারদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিল আর তিনিই প্রথম নিজেকে একজন ডেন্টাল সার্জন হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন

ব্যাবসায়িক কলাকৌশল গোপন করে রাখার ধারা ভঙ্গ করে, ফশার ১৭২৮ সালে একটি বই লিখেছিলেন, যেখানে তিনি তার জানা সমস্ত পদ্ধতি প্রকাশ করেছিলেন। ফলে, তিনিইদন্তচিকিৎসাবিদ্যার জনকবলে পরিচিত হয়ে উঠেছিলেন। তিনিই ছিলেন প্রথম ব্যক্তি, যিনি রোগীদেরকে মেঝেতে বসানোর পরিবর্তে বিশেষ এক ধরনের চেয়ারে বসিয়েছিলেন। ছাড়া, ফশার দাঁত তোলার জন্য পাঁচটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেছিলেন, তবে তিনি শুধুমাত্র দাঁতই তুলতেন না। তিনি দাঁতের চিকিৎসার জন্য এক ধরনের ছোট্ট ড্রিল মেশিনের এবং দাঁতের মধ্যে সৃষ্ট গর্ত ভরাট করার বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন। তিনি রুট ক্যানেল করা এবং দন্তমূলে এক কৃত্রিম দাঁত বসাতেও শিখেছিলেন। তার ডেন্চার (কৃত্রিম দাঁতের পংক্তি) যেটা হাতির দাঁত থেকে খোদাই করে তৈরি করা হয়েছিল, সেটাতে একটা স্প্রিং লাগানো ছিল, যাতে ডেন্চারের ওপরের অংশটুকু জায়গামতো বসানো যায়। ফশার দন্তচিকিৎসাকে একটা পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার খ্যাতি এমনকি আটলান্টিক মহাসাগরের ওপারে আমেরিকাতেও প্রসারিত হয়েছিল

ছবি: জর্জ ওয়াশিংটন এর ডেনচার

 রাষ্ট্রপতির মত ব্যাক্তিও রেহাই পায় নি দাঁত ব্যথা নামক নরক যন্ত্রণা থেকে। চতুর্দশ লুইয়ের শাসনের একশো বছর পর, আমেরিকাতে জর্জ ওয়াশিংটন দাঁত ব্যথায় ভুগেছিলেন। ২২ বছর বয়স থেকে প্রায় প্রতি বছরই তাকে তার দাঁত তুলতে হয়েছিল। কন্টিনেন্টাল আর্মি-কে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় তিনি যে-যন্ত্রণায় ভুগেছিলেন, তা একটু কল্পনা করুন! ১৭৮৯ সালে তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন, সেই সময়ের মধ্যে তার প্রায় সব দাঁতই পড়ে গিয়েছিল

দাঁত পড়ে যাওয়ার কারণে চেহারা বিকৃত হয়ে যাওয়ায় সেইসঙ্গে তার মুখে বসানো নড়বড়ে ডেন্চারের কারণে জর্জ ওয়াশিংটন মানসিক যন্ত্রণায়ও ভুগেছিলেন। তিনি এক নতুন দেশের রাষ্ট্রপতি হওয়ার জন্য জনগণের সামনে এক উত্তম ভাবমূর্তি তুলে ধরার সংগ্রাম করার সময় তার চেহারা সম্বন্ধে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। সেই সময়ে ডেন্চারগুলোকে ছাঁচে ঢেলে আকার দেওয়া হতো না কিন্তু হাতির দাঁত থেকে খোদাই করে তৈরি করা হতো আর তাই সেগুলো যথাস্থানে বসানো খুব মুশকিল ছিল। ইংরেজ লোকেরাও ওয়াশিংটনের মতো একই অসুবিধাগুলো ভোগ করেছিল। কথিত আছে যে, হাস্য-রসাত্মক কথাবার্তার সময় তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হাসার পরিবর্তে মুচকি হাসি হাসতো, যাতে তাদের নকল দাঁত লুকাতে পারে

এমন কথা প্রচলিত আছে যে, ওয়াশিংটন কাঠের তৈরি ডেন্চার ব্যবহার করতেন কিন্তু এটা স্পষ্টতই মিথ্যা। তার ডেন্চার মানুষের দাঁত, হাতির দাঁত এবং সীসা দিয়ে তৈরি ছিল কিন্তু কাঠ দিয়ে নয়। তার দন্তচিকিৎসকরা সম্ভবত কবর লুটকারীদের কাছ থেকে দাঁত সংগ্রহ করেছিল। ছাড়া, দাঁত ব্যবসায়ীরা সৈন্যদের পিছনে পিছনে যেত এবং যুদ্ধের পর নিহত বা মারা যাচ্ছে এমন সৈন্যের দাঁত তুলে নিত। তাই, ডেন্চার বসানো ধনী ব্যক্তিদের বিলাসিতার এক বিষয় ছিল। ১৮৫০ দশকে ভালকানাইজড রবার আবিষ্কৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা ডেন্চারের ভিত হিসেবে ব্যবহৃত হতে শুরু করে এবং তখন থেকে ডেন্চার সাধারণ লোকেদের কাছে প্রাপ্তিসাধ্য হয়ে উঠে। জর্জ ওয়াশিংটনের দন্তচিকিৎসকরা এই পেশায় অগ্রদূত হওয়া সত্ত্বেও, তারা দাঁত ব্যথার কারণ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি

প্রাচীনকাল থেকেই লোকেরা মনে করত যে, এক ধরনের পোকা দাঁত ব্যথার কারণ যে ধারণাটা ১৭০০ শতাব্দী পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল ১৮৯০ সালে, উইলোবি মিলার নামে আমেরিকার একজন দন্তচিকিৎসক, জার্মানির বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময় দন্তক্ষয়ের কারণ শনাক্ত করেছিলেন, যা দাঁত ব্যথার একটা প্রধান কারণ। বিশেষভাবে চিনির মধ্যে বৃদ্ধি পায় এমন এক নির্দিষ্ট ধরনের ব্যাকটিরিয়া অম্ল উৎপন্ন করে, যা দাঁতকে আক্রান্ত করে। কিন্তু, দন্তক্ষয়কে কীভাবে রোধ করা যেতে পারে? এর উত্তরটা আসলে অপ্রত্যাশিতভাবে পাওয়া গিয়েছিল

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কলোরাডোতে বেশ অনেক বছর ধরে দন্তচিকিৎসকরা মনে মনে চিন্তা করছিল যে, সেখানকার অনেক লোকের কেন দাগযুক্ত দাঁত রয়েছে। অবশেষে জানা যায় যে, জলে মাত্রাতিরিক্ত ফ্লোরাইড থাকার কারণে এমনটা হয়েছে। কিন্তু, স্থানীয় এই সমস্যার বিষয় নিয়ে গবেষণা করার সময় গবেষকরা অপ্রত্যাশিতভাবে এক আবিষ্কার করেছিল, দাঁত ব্যথা প্রতিরোধের জন্য পৃথিবীব্যাপী যে-বিষয়টার গুরুত্ব ছিল: যেসব জায়গার খাবার জলে অপর্যাপ্ত মাত্রায় ফ্লোরাইড রয়েছে, সেখানে যে-লোকেরা বড় হয়ে উঠেছে, তাদের দন্তক্ষয় বেশি হয়েছে। ফ্লোরাইড হচ্ছে দাঁতের ইনামেলের (দাঁতের শক্ত বহিরাবরণ) একটা উপাদান, যা অনেক জায়গার জল সরবরাহে প্রকৃতিগতভাবেই থাকে। যে-লোকেদের জল সরবরাহে ফ্লোরাইডের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণে ফ্লোরাইড সরবরাহ করা হলে, দাঁতের ক্ষয়ের প্রকোপ অন্তত ৬৫ শতাংশ কমে যায়

এভাবে সেই রহস্যের সমাধান হয়েছিল। দন্তক্ষয়ের কারণেই অধিকাংশ দাঁত ব্যথা হয়। চিনি দন্তক্ষয়ের কারণ। ফ্লোরাইড এর প্রতিরোধে সাহায্য করে। অবশ্য, এটা ভালভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, ফ্লোরাইড কখনোই পর্যাপ্ত ব্রাশ ফ্লস করার বিকল্প হতে পারে না

চেতনানাশক পদার্থ আবিষ্কারের আগে, দন্তচিকিৎসার প্রক্রিয়া রোগীদের জন্য নিদারুণ যন্ত্রণা সৃষ্টি করত দন্তচিকিৎসকরা ধারালো যন্ত্রপাতি দিয়ে দূর্বল, ক্ষয়প্রাপ্ত দাঁত তুলে ফেলত আর এরপর গর্তটা ভরাট করার জন্য সেখানে উত্তপ্ত গলিত ধাতু ঢেলে দেওয়া হতো। যেহেতু তাদের কাছে অন্য ধরনের কোনো চিকিৎসা ছিল না, তাই তারা যে-দাঁতের আভ্যন্তরীণ তন্তু (পাল্প) সংক্রামিত হয়েছিল, সেখানকার কোষগুলোকে নষ্ট করার জন্য রুট ক্যানেলের মধ্যে একটা জ্বলন্ত গরম লোহার শলাকা ঢুকিয়ে দিত। বিশেষ যন্ত্রপাতি চেতনানাশক পদার্থ আবিষ্কারের আগে দাঁত টেনে তোলাও এক চরম অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতা ছিল। দাঁত ব্যথা অত্যন্ত কষ্টদায়ক বলে লোকেরা এই ধরনের এক অত্যাচারকে মুখ বুজে সহ্য করত। যদিও বিভিন্ন ভেষজ উপাদান যেমন আফিম, ভাং এবং নিদ্রা উদ্রেককারী গাছের নির্যাস শত শত বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে কিন্তু এগুলো কোনোভাবেই ব্যথার তীব্রতা কমাতে পারেনি। তা হলে, দন্তচিকিৎসকরা কি কখনো ব্যথাহীন অপারেশন করতে সক্ষম হবে?

 

ইংরেজ রসায়নবিদ জোসেফ প্রিস্টলি যখন ১৭৭২ সালে প্রথম নাইট্রাস অক্সাইড বা লাফিং গ্যাস প্রস্তুত করেন। তার কিছু পরেই এটার চেতনানাশক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়েছিল। কিন্তু, ১৮৪৪ সালের আগে পর্যন্ত কেউই এটাকে এক চেতনানাশক পদার্থ হিসেবে ব্যবহার করেনি। সেই বছরের ১০ই ডিসেম্বর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কানেকটিকাটের হার্টফোর্ডে হরেস ওয়েলস নামে একজন দন্তচিকিৎসক এমন একটা বক্তৃতায় যোগ দিয়েছিলেন, যেখানে লোকেদের লাফিং গ্যাসের সাহায্যে আনন্দদান করা হয়েছিল। ওয়েলস লক্ষ করেছিলেন যে, এই গ্যাসের প্রভাবে একজন ব্যক্তি একটা ভারী বেঞ্চে তার পা ঘষেও ব্যথার কোনো লক্ষণ প্রকাশ করেননি। ওয়েলস একজন সহানুভূতিশীল ব্যক্তি ছিলেন আর দাঁতের চিকিৎসার সময় তার রোগীদের তিনি যে-ব্যথা দিতেন, সেই কারণে নিজে বেশ অস্বস্তি বোধ করতেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে এই গ্যাসকে চেতনানাশক পদার্থ হিসেবে ব্যবহার করার বিষয় চিন্তা করেছিলেন। কিন্তু, এটা অন্যের ওপর প্রয়োগ করার আগে, তিনি নিজের ওপর প্রয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। ঠিক পরদিনই তিনি তার নিজের সেই বিশেষ চেয়ারে বসেন এবং অচেতন না হওয়া পর্যন্ত তার শ্বাসের সঙ্গে সেই গ্যাস গ্রহণ করেছিলেন। এরপর একজন সহকর্মী তার আক্কেল দাঁত তুলে ফেলেছিলেন। এটা ছিল এক ঐতিহাসিক ঘটনা। অবশেষে, ব্যথাহীন দন্তচিকিৎসা সম্ভব হয়েছিল!

সেই সময়ের পর থেকে দন্তচিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অনেক উন্নতি ঘটেছে। তাই, আপনি দেখতে পাবেন যে, আজকে দন্তচিকিৎসকের কাছে যাওয়া বেশ আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতাই হবে

 

[ Note: অনির্বাণ আবরারের এই লেখাটি লন্ডনের ওয়াচ টাওয়ার নামে একটি অনলাইন ম্যাগাজিন প্রথম প্রকাশ করে ]

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত