ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, জুলাই ২০১৮ - ১, শ্রাবণ, ১৪২৫ - হিজরী



নাজমুল হোসাইন

ইন্টার্ন চিকিৎসক, গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ। 


ডাক্তার ভাই এড্রিক সার্জিসন বেকার

পুরো নাম ডাক্তার এড্রিক সার্জিসন বেকার। গরীব মানুষের কাছে যিনি "ডাক্তার ভাই" নামেই পরিচিত। গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান এই মন্ত্রে উজ্জীবিত একজন ঋজু মানুষ হিসেবে ১৯৭৯ সালে এড্রিক বেকার বাংলাদেশে আসেন।

টাঙ্গাইল জেলার মধুপুর উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র মানুষদের স্বাস্থ্য সেবা দেবার নিমিত্তে গড়ে তোলেন ‘কাইলাকুড়ি হেলথ কেয়ার সেন্টার’। শুরুতে যেটি ছিল একটি ছোট বৃক্ষের ন্যায়, আজ তা রুপ নিয়েছে বিশাল বটবৃক্ষে। টাঙ্গাইল, জামালপুর, ময়মনসিংহ জেলার দরিদ্র মানুষদের জন্য এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র এক আশির্বাদ ।

জন্ম, শৈশব এবং লেখাপড়া ডাক্তার এড্রিক ১৯৪১ সালে নিউজিল্যান্ডের ওয়েলিংটন শহরে জন্মগ্রহণ করেন। এই শহরেই প্রাথমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক লেখাপড়া শেষ করে ১৯৬০ সালে তিনি ডুনেডিন শহরের ওটাগো মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। ১৯৬৫ সালে চিকিৎসা শাস্ত্রে স্নাতক সম্পন্ন করেন। মেধাবী ছাত্র বেকার এরপরে ১৯৭০ সালে পোষ্ট-গ্র্যাজুয়েশনের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে গমন করেন। সিডনিতে ট্রপিকাল মেডিসিনের উপর ডিপ্লোমা ডিগ্রী অর্জন সম্পন্ন করে মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন। অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ধাত্রীবিদ্যার উপর ডিপ্লোমা লাভ করেন ১৯৭১ সালে। জ্ঞানের জন্য তৃষ্ণার্ত পাগল এই মানুষটি ১৯৭৭ সালে যুক্তরাজ্যের লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিশু বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রী লাভ করেন।

যা কিছু মহান কীর্তি মিস্টার বেকার ছোট বেলায় নিজ হাতের আঙ্গুল কেটে যাবার ব্যাথা থেকে ডাক্তার হবার অনুপ্রেরণা লাভ করেন তাঁর মায়ের কাছে থকে।ছোট বেলা থেকেই তিনি আর্তমানবতার জন্য কিছু করার তাড়না বোধ করতে থাকেন। ডাক্তার হবার মধ্যে দিয়ে তাঁর দ্বার খুলে যায়। এমবিবিএস পাস করে সরকারের শল্য চিকিৎসক দলের সদস্য হিসাবে যুদ্ধবিধ্বস্ত ভিয়েতনামে যান তিনি। সেখানে কাজ করার সময়ই তিনি পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে পারেন। যুদ্ধকালীন ও তার পরবর্তী এখানকার মানুষের দুর্ভোগের চিত্র দেখে তিনি ঠিক করেন সম্ভব হলে বাংলাদেশে আসবেন।

সেই পরিকল্পনা থেকেই ১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশে আসার পর তিনি মেহেরপুর জেলার বল্লভপুর মিশন হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮১ সালে তিনি টাঙ্গাইল চলে আসেন এবং শিশু বিষয়ক মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কুমুদিনী হাসপাতালে জয়েন করেন। সেখানে মন টিকাতে না পেরে চলে আসেন টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলায়। মধুপুরের থানার বাইদের চার্চ অফ বাংলাদেশ হাসপাতালে মেডিক্যাল অফিসার ইনচার্জ হিসেবে কাজ আরম্ভ করেন। এই দায়িত্ব ২০০৪ সাল পর্যন্ত পালন করেন।

"গরীবদের চিকিৎসা, গরীবরাই তা করবে" এই মূলমন্ত্রকে সামনে রেখে ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ব্যতিক্রমী চিকিৎসাকেন্দ্র ‘কাইলাকুড়ি হেলথ কেয়ার সেন্টার’। ২০০ শতক জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতাল থেকে প্রতিদিন প্রায় ২০০ রোগী ফ্রি চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকে। ছোট ছোট মাটির ঘরে ডায়াবেটিস বিভাগ, যক্ষ্মা বিভাগ, মা ও শিশু বিভাগ, প্রশিক্ষণ কক্ষ, মাতৃসদনসহ নানা বিভাগ রয়েছে। সব বিভাগ মিলিয়ে ৪০ জন রোগী ভর্তি করানোর ব্যবস্থা রয়েছে এখানে। সাভারের গণস্বাস্থ্য মেডিকেল কলেজ থেকে দুইজন ইন্টার্ন ডাক্তার সেখানে নিয়মিত সেবা দিয়ে থাকেন।

অর্জনঃ বাংলাদেশের খ্যাতিমান নির্মাতা এবং উপস্থাপক হানিফ সংকেত ২০১১ সালের ৩০ ডিসেম্বর এড্রিক বেকারের ওপর একটি প্রতিবেদন তুলে ধরেন বিনোদন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে। প্রান্তিক গোষ্ঠীর মানুষের সেবা দেয়ার অবদান স্বরপ বাংলাদেশ সরকার জনাব বেকারকে ২০১৪ সালের পাঁচ আগস্ট নাগরিকত্ব দেয়। ১৯৯৯ সালে নিজদেশে তিনি" Officer of the New Zealand Order of Merit" পুরষ্কারে ভূষিত হন। ২০১৫ সালের ১লা সেপ্টেম্বর এই মহান সেবক পরলোকগমন করেন। শারীরিকভাবে ব্যক্তি বেকারের প্রস্থান ঘটলেও তাঁর আদর্শকে বুকে ধারণ করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ‘কাইলাকুড়ি হেলথ কেয়ার সেন্টারে" কর্মরত ১০০ স্টাফ।

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


জীবন ও কর্ম বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া নারী চিকিৎসকের গল্প

পররাষ্ট্র ক্যাডারে প্রথম হওয়া নারী চিকিৎসকের গল্প

ডা. সুবর্ণ শামীম আলো। একজন মেধাবী চিকিৎসক। লাখ লাখ প্রতিযোগীকে পেছনে ফেলে…

টিভি উপস্থাপিকা ডা. মলির সাফল্যগাঁথা

টিভি উপস্থাপিকা ডা. মলির সাফল্যগাঁথা

ডা. এসএম মলি রেজা। পেশায় চিকিৎসক এই নারী টিভি পর্দার সামনে ও পেছনে কাজ…

রেডিও জকি ডা. নিতুলের জীবনের গল্প

রেডিও জকি ডা. নিতুলের জীবনের গল্প

নাদিয়া ইসলাম (নিতুল)। পেশাগত জীবনে তিনি একজন দন্তচিকিৎসক (ডেন্টিস্ট)। কিন্তু তার শিল্প,…

আরো সংবাদ














জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর