যোবায়ের মাহমুদ

যোবায়ের মাহমুদ

শিক্ষার্থী, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ। 


১৭ এপ্রিল, ২০১৭ ১০:১০ এএম

আচরণগত দক্ষতা উন্নয়নের চাবিকাঠি

আচরণগত দক্ষতা উন্নয়নের চাবিকাঠি

সমস্যা নেই এমন কোন খাত বাংলাদেশে অন্তত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।

তবে অবাক করার মত বিষয় হচ্ছে, 'আচরণগত দক্ষতা উন্নয়ন' ছাড়া গ্রহণযোগ্য বিশেষ কোন সমাধান নেই এমন প্রচুর সংখ্যক খাত আপনি খুজে পাবেন। এই কথাটার সাথে যদি আপনি একমত হন, তাহলে অভিনন্দন গ্রহণ করতে পারেন ; কেউ না করুক একজন আমি আপনার সাথে একমত পোষণ করে যাবো।

আমরা প্রতিনিয়ত যে মানুষগুলোর সাথে চলাফেরা করি, তাদের সাথে আমাদের আচরণগুলো বলে দেয়, আমরা কেমন মানুষ? আমার শিক্ষা যদি আমার মধ্যে বিনয়ের বদলে অহংকারের জন্ম দেয়, আমায় স্বীকার করে নিতে হবে, যা আমি শিখেছি বলে দাবী করছি, আসলে আদৌ সেটা শিক্ষা না। শিক্ষা নিয়ে মানুষ, আরও বেশি করে 'মানুষ' হয়। আমি যদি না হতে পারি, ডেফিনিটলি সেটা আমার ব্যর্থতা।

শুনতে খারাপ লাগবে তবু বলি, বদ্ধ পরিবেশের ভারী লেকচারে বারবার শুনি, আমাদের কি করা উচিত, কি করা উচিত না? কিভাবে রোগীবান্ধব চিকিৎসক হতে হয়? কিন্তু হাতে গোণা কয়েকজন মহৎ হৃদয়ের মানুষ ছাড়া অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কথার সাথে কাজের কোন মিল দেখার সৌভাগ্য হয়ে ওঠেনি এখনো। ক্লাসরুমের 'অমায়িক' মানুষটা মুহূর্তেই 'অ-মাইক' হয়ে সাথে আনা রোগীর সামনেই ঝাড়তে থাকেন অসাধারণ ভাষায়।

এই কারণেই একটা কথা বলতে খুব পছন্দ করি আমি, ডাক্তারি পাশ করে কারো ব্যবহার ভালো হয়ে যায় না। বরং আগে থেকেই ভালো মানসিকতা আছে এমন কিছু মানুষ, ডাক্তার হওয়ার পরেও ভালো থাকে।

ফিফথ ইয়ারে এসে কোন এক আউটডোরে একবার একজনের রুমে ঢুকেছিলাম।সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, 'ভাই, আসবো'?

ভাই ডাকাটা ভদ্রতা না। স্যার ডাকা উচিত। ভুল করে বেরিয়ে গেছে শব্দটা। চোখ বড় বড় করে তাকালেন। সাথে তার চাইতেও বেশি বিরক্তি।

-'কোন ইয়ার'?

-'ফিফথ ইয়ার'। 

-'ফিফথ ইয়ারে পড়েই ভাই ডেকে ফেললে'? 

বললাম, 'স্যরি স্যার। ভুল হয়ে গেছে'।

চোখের দিকে তাকালাম না। একটা শব্দ কানে আসলো, বের হও..

খানিকটা আশা নিয়ে ঢুকেছিলাম। ফিফথ ইয়ারের একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হয়ে তার সিনিয়রকে 'ভাই' ডাকার অপরাধ মাথায় নিয়ে বেরিয়ে আসলাম।

ডাক্তারের বয়স বেশি না। রুমের সামনের কার্ডে লেখা :

'ডা. অমুক,মেডিকেল অফিসার (এমবিবিএস)'

আমার চাইতে বয়সের হিসেবে তিন-চার বছরের বড় হয়তো। কিন্তু ইগোর হিসেবে কতদূর এগিয়ে? তিনশো বছর?

এর উল্টো চিত্র কি নেই?

কিছুদিন আগে আমার ছোটবেলার এক বন্ধু অসুস্থ হয়ে ভর্তি ছিলো আমাদেরই হাসপাতালে। দায়িত্বরত ইন্টার্ণকে জ্বালিয়ে গেছি কিছুক্ষণ পরপর। একবারও দেখিনি মুহূর্তের জন্যও মুখটা হাড়ির মত করতে।
কারণ কি? ওই ইন্টার্ণের জ্ঞান বেশি?

মোটেও না। ওই ইন্টার্ণ এর ইগো-বোধ এতো টনটনে না।

আমাদের মেডিসিনে একজন আরপি ছিলেন। ভদ্রলোকের হেপাটোলজীতে এমডি ছিলো। তার ব্যবহার এত অসাধারণ ছিলো, কিছুদিনের জন্য আমার নিজস্ব প্লান ছিলো হেপাটোলজী সাবজেক্টটা নিয়ে ভবিষ্যতে চেষ্টা করে দেখবো।হয় হোক, না হয় না হোক ; দেখা তো যাক!

আমার হেপাটোলজীতে এমডি নিতে ইচ্ছে করলো একটা মানুষের জন্য, কিন্তু আমার কেন এই মেডিকেল অফিসারের মত হতে ইচ্ছে হলো না?

মূল অনুঘটক কি 'আচরণ' নয়?

কিছু মানুষকে দেখলে শ্রদ্ধা আসে ভেতর থেকে। কিছু ক্ষেত্রে আসে না।

সালফিউরিক এসিডের মধ্যে পানি ঢাললাম, আগুন ধরে যাবে। কিছু ক্ষেত্রে জ্ঞানের সাথে আচরণের মিশ্রণ সমসত্ত্ব হয় না, বাইরে ইগোর আগুন দেখে মানুষ। এই কারণেই ইবনুল কাইয়্যিম বলেছিলেন, 'A person's tongue can give you the taste of his heart'.

প্রত্যেকের মধ্যেই সমস্যা আছে। আমাদের সমস্যাগুলোকে অন্যদের জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখি। আচরণের উন্নয়ন ঘটাই।

আপনার আচরণ-ই আপনি।

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত