ডা. আব্দুর রব

ডা. আব্দুর রব

মেডিকেল অফিসার, বিসিএস (স্বাস্থ্য)। 

এফসিপিএস-২ ট্রেইনি (সার্জারি)।

 সাবেক শিক্ষার্থী, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। 


১২ এপ্রিল, ২০১৭ ০১:৫২ পিএম
রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে যাবেন, সেই সুযোগ চিকিৎসা পেশায় কম

ইন্টার্নী করা জুনিয়রদের একটাই প্রশ্ন: ভাই এর পর কি করব?

ইন্টার্নী করা জুনিয়রদের একটাই প্রশ্ন: ভাই এর পর কি করব?

চিকিৎসা মূলত দশ -পনের বছরের পরিশ্রম আর সাধনালব্দ একটি পেশা। আপনি হুট করে রাতারাতি বিখ্যাত কিছু হয়ে হয়ে যাবেন, সেই সুযোগ এখানে কম। জীবনের একটি বড় অংশ হাসপাতালের বারান্দায় কাটিয়ে, রাত আর দিনের তারতম্য হারিয়ে বছরের পর বছর ধরে নিজের মন, মস্তিষ্ক আর শরীরের পরীক্ষা নিতে হয়। এই পেশায় মহান যাদের কে আমরা দেখি তারা সবাই দু:সহ সেই পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন। পুরো জীবন কে স্যাক্রিফাইস করার মানুষিকতা না থাকলে এই পেশায় কারো আসা উচিত না। আমাদের ভুলটা হয় এখানেই, এই গননায়। পাঁচ বছর পড়ে পাশ করে বের হবো, এরপর নিজের ও পরিবারের সবকিছু উদ্ধার করে ফেলবো ; এই ভাবনা নিয়েই মেডিকেল কলেজে ঢুকি। তারপর দেখি আমাদের কল্পনা আসলেই কল্পনা। যে বড় বড় প্রফেসরদের চেম্বার আর তার সামনে সারি বাধা লাইন দেখে আমরা মেডিকেলে ঢুকি, প্রফেসর হওয়ার কষ্টকর পথটা আমাদের হিসাবে থাকে না। তখন কষ্টের রাস্তা আর তার দুরত্ব দেখে আমরা হতাশ হয়ে পড়ি। 
.
ইন্টার্নী করা জুনিয়র ছেলেগুলোর একটাই প্রশ্ন: ভাই এর পর কি করব?? 
আমি বলি:: বিসিএস কর, এফসিপিএস কর, এমএস কর। করার তো বহুকিছু আছে!! দশ বার বছরের এই ফিরিস্তি চিন্তা করলে নিজের ই গায়ে কাটা দেয়, ওরা তো ছোট ওরা আকাশের দিকে তাকায়। 
.
এগুলো সবই সম্ভব এবং সময়মত সম্ভব যদি আপনার বাবা মা আপনার ভরনপোষনের দায়িত্ব নেন। উন্নত দেশ গুলোতে মানুষ ডাক্তারি পড়তে চায় না অমানুষিক পরিশ্রম আর এই বার তের বছরের সময়ের কারনে। বর্তমান আর ভবিষ্যত সকল অভিভাবকদের আমি একটা কথাই বলি:: আপনার সন্তানকে ডাক্তার বানাবেন আমার কোন আপত্তি নাই, সম্ভবত সৃষ্টিকর্তারও আপত্তি নাই কিন্তু আপনার মানিব্যাগ আর ভাড়ারে আপত্তি থাকলে কিন্তু চলবে না। ছেলেমেয়ের আয় খেয়ে যাবেন, বিলাসী জীবন যাবন করবেন, সবই সম্ভব। তবে সময় দিতে হবে। পাশ করার পর পরই তাদের হাতে বাজারের লিস্ট ধরায়ে দিবেন, ভাঙা ঘর দেখিয়ে দিবেন সেটা অন্যায় হবে। প্রত্যাশার চাপ সামলাতে না পেরে সে হতাশ হবে, বিড়ি খাবে, ক্যারিয়ার করার চিন্তা বাদ দিবে, মেডিকেল পেশার নানা দুর্নীতি আর অসঙ্গতিতে জড়িয়ে পড়ে এ মহান পেশাটাকে দূষিত করবে। এবং হচ্ছে ও এটাই। 
.
কিন্তু কষ্ট টা হচ্ছে আমাদের মত মধ্যবিত্ত, নিম্ন বিত্ত আর দরিদ্র পরিবারের ছেলেমেয়েরা যারা মেধার জোরে বিভিন্ন সরকারী মেডিকেলে অথবা দরিদ্র কোটায় বেসরকারি মেডিকেলে পড়ে পাশ করে। ব্লাক হোলে যেমন পদার্থ বিজ্ঞানের সকল সূত্র অকেযো হয়ে পড়ে তেমনি জীবনে সকল সূত্র এদের বাস্তবতায় অক্ষম হয়ে পড়ে। এ ধরনের ফেলিমির একটা ছেলেকে পাশ করার পর পরই পরিবারের দায়িত্ব নিতে হয়, কখনও কখনও সেটা পাশের আগেই নিতে হয়। ছোট ভাই বোনের পড়াশুনার দায়িত্ব, বাবা মায়ের অসূস্থতা সবকিছু মিলিয়ে প্রায় সাগরে এসে পড়ে ছেলেটি। কাজের উপর প্রেসার দিতে যেয়ে পড়াশুনা হয় না, ক্যারিয়ার হয় না, জীবনে দেখে আসা স্বপ্নগুলো এক সময় ফিকে হতে শুরু করে। এরা বিভিন্ন হাসপাতালে ডিউটি ডাক্তার নামের নির্জীব বোধহীন বোবা শ্রেনীতে নাম লেখায়। পরিবার আত্মীয় স্বজনের আসমান সমান প্রত্যাশা আর নিজের আজন্ম দেখা স্বপ্নগুলোর কাছে পরাজিত হয়ে হাল ছেড়ে দেয়। হাসিখুশি আর মিশুক মানুষটা একসময় অসামাজিক হয়ে পড়ে। এই জীবনে আর কখনও সামাজিক হতে পারে না। বয়স বেড়ে যেতে থাকে, বিয়ের চিন্তা বাদ দিয়ে এরা বিভিন্ন সরকারী হাসপাতালে বিনা বেতনে ট্রেইনিং করে মধ্যযুগে প্রচলিত শিক্ষিত দাস শ্রেনীতে পরিনত হয়। এদের দেখে সরকারী নীতিনির্ধারকদের ন্যূনতম লজ্জাবোধ ও হয় না। কিছু ছেলে আছে সবকিছুই করে: পরিবারের দায়িত্ব নেয়, ক্যারিয়ার করে। বিনিময়ে তাদের জীবন টা আর জীবন থাকে না। হাসপাতালে হাসপাতালে কাটিয়ে এক সময় দয়া মায়াহীন যন্ত্র হয়ে যায়।
.
ডাক্তার হিসেবে বেড়ে ওঠা শুধু এ দেশেই নয়, সারা পৃথিবীতেই কষ্ট। কষ্ট টা আরো বড় হয়ে যায় যখন পরিবার সাপোর্ট দিতে পারে না, হাত ধরার কেউ থাকে না। নিজের দু:খ আর কষ্টগুলো কাউকে বলতে ও পারে না। এ ছেলেগুলোই ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করে :: ভাই কি করব?? আমরাও আমাদের হেটে আসা পথ দেখিয়ে দিই। নিষ্ঠুর এই নিয়মের শেষ নেই। দেশের সকল বোবা, বোধহীন, আর মধ্যযুগীয় দাসদের জন্য রইল শুভকামনা। আবার একটি জুলাই আসিতেছে সামনে।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত