ঢাকা      মঙ্গলবার ১৭, সেপ্টেম্বর ২০১৯ - ২, আশ্বিন, ১৪২৬ - হিজরী



ডা. উত্তম কুমার পাল

Associate Professor
Department of Anatomy
Sir Salimullah Medical College


আমার জীবনে কত বাধা এসেছে, আমি কখনোই হতাশ হইনি

হে দারিদ্র, তুমি মোরে ক’রেছ মহান।
তুমি মোরে দানিয়াছ খ্রীষ্টের সম্মান
কন্টক-মুকুট শোভা- দিয়াছ, তাপস,
অসঙ্কোচ প্রকাশের দুরন্ত সাহস;

আমার মাঝে মাঝে মনে হয় কবি নজরুল আমার জীবনের জন্যেই এই কথাগুলা বলেছিলেন। আমার সারা জীবনটাই আসলে ছিল বৈরিতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের। আমার জন্ম চাঁদপুরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে, ১৯৬১ সালে। আমার বয়স এক বছর যখন বাবা মারা যান। তারপর থেকে আমার মা ই আমার পৃথিবী। মাকে অনেক ভালবাসতাম। এমনকি মাকে ছেড়ে স্কুলে যেতে হবে তা আমি ভাবতেই পারতাম না, স্কুলে না যাওয়ার জন্যে সুপারি গাছ ধরে বসে থাকতাম, মাকে ছাড়া কোথাও যাব না! মা অনেক বুঝালেন, এক ছেলেকে দেখিয়ে বললেন ও কত ভালো ছেলে, পড়ালেখা করে, স্কুলে যায়। আমি ও স্কুল শুরু করি। কিভাবে যেন পড়ালেখায় আগ্রহ তৈরি হয়ে গেল।

প্রাইমারি স্কুলে আমি ছিলাম ফার্স্ট বয়। ক্লাস ফাইভে আমি যখন বৃত্তি পেলাম, তখন চারিদিকে রব পড়ে গেল। কিন্তু আমার সাফল্যের প্রধান কারিগর ছিলেন তখনকার হেডমাস্টার জনাব মনু মিয়া পাটওয়ারী স্যার, তিনি আমাকে নিয়ে যেতেন পরীক্ষা দিতে, নিজ হাতে খাওয়ায় দিতেন, গোসল করায় দিতেন, পিতৃস্নেহে লালন করতেন স্যার। আমার এখন মনে হয় আজকে আমি যা, তার পেছনে স্যারের অবদান অনেকখানি। একজন শিক্ষক তাঁর ছাত্রকে কতটা ভালোবাসতে পারে, সেটা আমি স্যারকে দেখে বুঝেছি।

এসএসসিতে আমি হাসান আলী সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ নাম্বার পেলাম। সচ্ছল পরিবারে ছেলেরা কলেজে ভর্তির জন্য ঢাকায় চলে গেলো, কিন্তু আমার পরিবারের সেই সামর্থ্য ছিল না যে ঢাকায় গিয়ে পড়াতে পারবে। উপরন্তু সংসারের দায়িত্ব আর জীবিকার তাগিদে এসএসসির পর থেকেই টিউশনি শুরু করি। ভর্তি হই চাঁদপুর কলেজে। ওখানেও আমার রেসাল্ট ধরে রাখি আমি। অনেক বছর পর একবার মানিকগঞ্জে আমি আমার চেম্বারে বসে ছিলাম, তখন দেখা হয় আমার কলেজের বাংলার অধ্যাপক খলিল স্যারের সাথে। যখন উনাকে চিনতে পারলাম, তখনই স্যারকে সালাম করে স্যারের জন্যে আমার সাধ্যমত সবকিছুর ব্যবস্থা করি। এই ঘটনা স্যারকে এমন ভাবে নাড়া দিয়েছিলো যে স্যার একটা পত্রিকায় আমাকে নিয়ে একটা আর্টিকেল লিখেছিলেন, অনেক বড় লেখা, তার মধ্যে একটা লাইন ছিলো - ''উত্তম আমার গর্ব, সবচেয়ে বড় ধন।'' এক জন ছাত্রের জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কি হতে পারে?

ছোটবেলা থেকেই আমার ম্যাথের প্রতি একটা ফ্যাসিনেশন ছিলো। তাই স্বভাবতই বুয়েটে পরীক্ষা দিলাম। প্রথম দিককার পজিশন পেলাম। আবার মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেলাম স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেলে। মা বললেন আমার যেটা ভালো লাগে সেটাই করতে। কিন্তু বুঝতে পারলাম মা ও মনে মনে চান আমি ডাক্তার হই। তাই এই পথটাই বেছে নিলাম।

দারিদ্র্যের সাথে যুদ্ধ তখনও চলছিলো আমার। তখন স্কলারশিপ এ যা পেতাম তাতে কষ্ট করে হলেও দিন চলে যেত। বিলাসিতা করার কোনো সুযোগ তো ছিলোই না। তবে হোস্টেলের সেই ডাল খেয়েই আমি তৃপ্ত ছিলাম। আমি পরম সৌভাগ্যবান; ইন্টার্নশিপ করি প্রফেসর এম.এন.আলম স্যারের অধীনে। স্যার হলেন বাংলাদেশে মেডিসিনের অগ্রদূতদের একজন। একবারের ঘটনা, এক রোগী আসলো রাতের বেলা, অবস্থা খুব নাজুক। শকে চলে গিয়েছিলো পেশেন্ট। জান প্রাণ দিয়ে চেষ্টা করলাম বাঁচাতে, এবং লোকটা সুস্থ হয়ে গেলো। সকালে দেখলাম সুন্দরমত নাস্তা করছেন উনি। স্যার রাউন্ডে এসে রোগীকে দেখেই বললেন , ''উত্তম সাড়ে এগার/বারটার দিকে কিন্তু আবার পেশেন্টের অবস্থা খারাপ হতে পারে।'' বারটা বাজতেই সিস্টারের ফোন, পেশেন্ট এর অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও আর বাঁচাতে পারলাম না মানুষটাকে। আমি তখন বুঝলাম আসলেই স্রষ্টার পরে কেনো মানুষ ডাক্তারের ওপর বিশ্বাস রাখে।

আমি সব সময়ই এক্সট্রা কারিকুলার কাজে অগ্রগামী ছিলাম, এবং ভালোও লাগত। ক্লাস নাইনে আমি প্রথম কিছু বড় ভাইদের নিয়ে সাইন্স ক্লাব খুলে পুরো চাঁদপুর শহরে হই হই ফেলে দিলাম। কত মজার মজার এক্সপেরিমেন্ট করলাম আমরা! সবাই আমাদের ডাকা শুরু করলো ''সাইন্টিস্ট সাহেব''। ডাক্তারি জীবনেও আমি জড়িত ছিলাম শিল্প সংস্কৃতির সাথে। কলেজের স্বরস্বতী পূজার সাংস্কৃতিক প্রোগ্রামের জন্য বন্ধু ডা. আব্দুর রশিদের অবদানে ফেরদৌসি মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, সুবর্ণা মুস্তফা, ডা. অরূপ রতন চৌধুরী আরো কত জনের সাথে দেখা হয়েছে, কত জনের বাসায় গিয়েছি। কারণ আমার কাছে মনে হয় শিল্প সংস্কৃতি হচ্ছে ডিটারজেন্টের মত। মনের সব ময়লা দূর করে দেয়, মানুষকে খারাপ প্রবৃত্তি গুলো থেকে দূরে রাখে।

মনের প্রবল ইচ্ছাটা থাকতে হবে বাবা, তাহলে কোনো প্রতিকূলতাই ব্যাপার না। আমার জীবনে কত বাঁধা এসেছে, আমি কখনোই হতাশ হইনি। কখনোই মন খারাপ করি নি। সৎ মানুষের খুব অভাব হয়ে যাচ্ছে আজকাল। ভালো ভাবে বাঁচার জন্যে কিন্তু খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই। তাই সবাইকে সৎ হওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মানুষকে ভালবাসতে শিখো। কারণ আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ কিন্তু খুব অসহায়।

 

Dr. Uttam Kumar Paul
SSMC - 7th Batch
Associate Professor
Department of Anatomy
Sir Salimullah Medical College

সূত্র; হিউম্যান অব মিটফোর্ড 

সংবাদটি শেয়ার করুন:

 


আরো সংবাদ
























জনপ্রিয় বিষয় সমূহ:

দুর্যোগ অধ্যাপক সায়েন্টিস্ট রিভিউ সাক্ষাৎকার মানসিক স্বাস্থ্য মেধাবী নিউরন বিএসএমএমইউ স্বাস্থ্যমন্ত্রী ঢামেক গবেষণা ফার্মাসিউটিক্যালস স্বাস্থ্য অধিদপ্তর