ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

ডা. আহমাদ হাবিবুর রহিম

লেখক, কলামিস্ট

বিসিএস (স্বাস্থ্য), রেসিডেন্ট, বিএসএমএমইউ।


০৮ এপ্রিল, ২০১৭ ০৩:২২ পিএম

৩৮তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার প্রস্তুতিঃ কিছু পরামর্শ

  • ৩৮তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার প্রস্তুতিঃ কিছু পরামর্শ
  • ৩৮তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষার প্রস্তুতিঃ কিছু পরামর্শ

কিছুদিন পরেই ৩৮ তম বিসিএস প্রিলিমিনারী পরীক্ষা। যদি সার্কুলারই দেয়নি এখনও। কিন্তু পরীক্ষার্থীদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে অনেক আগেই। এদের মধ্যে অনেকেই বুঝতে পারছেন না কিভাবে প্রস্তুতি নিতে হবে। তাদের জন্য এই অধমের কিছু পরামর্শ। যদিও নিজেকে এই উপদেশ দেয়ার যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারিনি তেমন। তবে মনে হয়েছে বিসিএস এর সফলতা প্রাপ্তির রাস্তাঘাটগুলো অন্তঃত চিনতে পেরেছি। তাই ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতাটুকুই ভাগাভাগি করছি আপনাদের সাথে। যদি এতে কারো উপকার হয়।

আমি নিজে যখন প্রস্তুতি শুরু করি তখন বুঝতে পেরেছি একটা আন্তরিক পরামর্শ কতোটা দামী হতে পারে। আর হ্যা, এই লেখাটা মূলত স্বাস্থ্য ক্যাডারে যারা পরীক্ষা দিতে যাচ্ছেন তাদের জন্য। অন্য ক্যাডারের প্রস্তুতি আরো কুশলী ও পরিশ্রম সাপেক্ষ । কেননা যেখানে আমাদের লক্ষ্যই থাকে ১০০-১২০ সেখানে তাদেরকে এর চেয়ে অনেক বেশী নাম্বার পেয়ে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হয়। তবে প্রাথমিক কথাগুলো সবার জন্যই এক।

এক নজরে পরীক্ষার নম্বর বন্টনঃ

[ মোট ২০০ নম্বর, সময় ২ঘণ্টা ]

১. বাংলা ভাষা ও সাহিত্য = ৩৫
২. ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য = ৩৫
৩. বাংলাদেশ বিষয়াবলী = ৩০
৪. আন্তর্জাতিক বিষয়াবলী = ২০
৫. ভুগোল (বাংলাদেশ ও বিশ্ব), পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনা = ১০
৬. সাধারণ বিজ্ঞান = ১৫
৭. কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি = ১৫
৮. গাণিতিক যুক্তি = ১৫
৯. মানসিক দক্ষতা = ১৫
১০. নৈতিকতা মূল্যবোধ ও সুশাসন = ১০

# যে সব বই থেকে প্রস্তুতি নেয়া যেতে পারে:

প্রফেসরস, এসিওরেন্স, এমপিথ্রি, ওরাকল প্রভৃতি সিরিজের বই আছে বাজারে। এখান থেকে যে কোন বই পড়া যেতে পারে। আমার পছন্দের তালিকায় প্রথম দিকে আছে প্রফেসরস আর এমপিথ্রি। এগুলোই আমার কাছে বেশী নির্ভর‍যোগ্য আর আপডেটেড মনে হয়েছে। তবে অন্য সিরিজগুলোও দেখা যেতে পারে। যে কোন একটা সিরিজের সবগুলো বই কিনে বিষয় ভিত্তিক ভাবে প্রস্তুতি নেয়া শুরু করতে হবে। চাইলে বিভিন্ন বিষয় বিভিন্ন প্রকাশনার বইও বিষয় ভিত্তিক ভাবে সংগ্রহ করা যেতে পারে।

#ডাইজেস্ট ( সবগুলো বিষয়ের বাছাইকৃত তথ্যগুলো একসাথে একটি বইয়ে থাকে) পড়ে শর্টকাট এ পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে চান অনেকে। এটা অনেক বিপদজনক। কারণ আপনার বেসিক যদি আগেই থেকেই খুব ভালো না থাকে তাহলে শুধু ডাইজেস্ট পড়ে আপনি বেশী সুবিধা করতে পারবে না। কারণ এখানে তথ্যগুলো শুধু বোঝাই করা থাকে, খুব বেশী গোছানো থাকে না। যারা প্রথমবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাদের জন্য পরামর্শ রইলো কষ্ট করে সময় বের করে বড় বইগুলো থেকেই বিশদ প্রস্তুতি নিয়ে নিন একেবারে। বিসিএস এমন একটা পরীক্ষা যেটা আপনার একাধিক বার দেয়া লাগতেই পারে। তাই প্রথমবার ব্যর্থ হলে মন খারাপের কিছু নেই। অনেকেরই একাধিকবার পরীক্ষা দিতে হয়। তাই একবার ভালো করে প্রস্তুতি নিলে পরেরবারের প্রস্তুতি নেয়াটা অনেক সহজ হয়ে যায়। অবশ্য একটু ভালো করে পড়লে একবারেই হয়ে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেশী থাকবে ইনশাআল্লাহ।

তবে ৩৩ তম বিসিএস এর মতো সুবর্ণ সুযোগ যেহেতু বারবার আসে না তাই সবচেয়ে প্রতিকূল পরিস্থিতিটাই মাথায় রাখলে ভালো। ৩৫ তম বিসিএস থেকে বিসিএস এর প্রিলিমিনারী থেকে শুরু করে প্রায় প্রতিটি পর্যায়েই পরীক্ষা গ্রহণের পদ্ধতি আগের চেয়ে কিছুটা ব্যতিক্রম ও কঠিন হচ্ছে। সুতরাং ভালো প্রস্তুতি নিতে একটু কষ্ট আপনাকে করতেই হবে। মনে রাখবেন এই কষ্টটা পুষিয়ে দিতে সরকার কিন্তু বিসিএস ক্যাডারদের বেতনের পরিমাণও বাড়িয়ে দিয়েছে সম্প্রতি!

যাইহোক বিষয়ভিত্তিক যে বইগুলো আপনি কিনবেন সেগুলোই হবে আপনার মূল বই। আর সাথে অন্য বই বা উপকরণ থেকে আপনি পড়া বুঝতে ও মনে রাখতে সাহায্য নিতে পারেন। কিন্তু কোথা থেকে কি পড়লেন বা বুঝে নিলেন তা অবশ্যই টুকে রাখবেন এই মূল বইটির পাতায়। তা না হলে পরবর্তীতে আপনি ব্যাপারটা বেমালুম ভুলে যাবেন। তখন রিভিশন দেয়ার সুযোগটুকু মিস করবেন আপনি।

#বাংলার প্রস্তুতি নিতে সিরিজের বাংলা বইয়ের বাইরেও আরো কিছু বইয়ের সাহায্যও নিতে হবে আপনাকে। যেমন ব্যাকরণের বিষয়গুলো সম্পর্কে জানতে ড. #সৌমিত্র_শেখর এর লেখা 'বাংলা ভাষা ও সাহিত্য জিজ্ঞাসা' বইটির সাহায্য নেয়া যেতে পারে। এছাড়া #নবম_দশম শ্রেণীর #বাংলা_ব্যাকরণ বইটিতো আছেই।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এর সেই প্রাচীণ যুগ থেকে বর্তমান পর্যন্ত ধারাবাহিক ক্রমবিবর্তন সম্পর্কে একটা সংক্ষিপ্ত ধারণা নিতে পড়তে পারেন ড. হুমায়ুন আজাদের '#লালনীল_দীপাবলী বা বাংলা সাহিত্যের জীবনী।' খুব সংক্ষিপ্ত আর প্রাঞ্জলভাবে বিষয়গুলোকে তুলে ধরা হয়েছে এখানে। তবে এখানে তথ্যের পরিমাণ তুলনামুলক কম। তারপরও পড়লে ভালোই উপকার হবে আপনার। আর যদি আর বিস্তারিত ভাবে বাংলা সাহিত্য নিয়ে জানতে চান পড়তে পারেন ড. #মাহবুবুল আলমের লেখা 'বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস'। এ বইটি পড়লে আপনি বিস্তারিত একটি ধারণা নিতে পারবেন।

#বাংলা ও ইংরেজী সাহিত্য উভয়ের ক্ষেত্রেই কোন লেখক কি বই লিখেছেন কিংবা কোনটি কোন ভাষার শব্দ এগুলো সুন্দর করে নোট করে পড়লে উপকার হবে এবং এমনভাবে গুছিয়ে নিতে পারেন চাইলে যেন পরবর্তীতে লিখিত পরীক্ষার সময়ও যাতে এই নোটটাই অনুসরণ করতে পারেন আপনি। চাইলে নানা বিতিকিচ্ছিরি নাম বা শব্দগুলো মনে রাখতে বিভিন্ন কবিতা বা ছন্দের সাহায্য নিতে পারেন। না হলে এসব মুখস্থ রাখা অনেক ক্ষেত্রেই বেশ অসম্ভব মনে হবে। মনে রাখবেন এগুলো মোটেই বাঁকাচোরা কোন পথ নয় বরং যুদ্ধ জয়ের কৌশল! সুতরাং এগুলোর সাহায্য নিতে কোন বাঁধা নেই।

#ইংরেজীর প্রস্তুতির জন্য প্রফেসরস এর সিরিজ এর বইটা ভালো। তাছাড়াও বাড়তি অনুশীলনের জন্য '#English_for_Competetive_exams - Md. Fazlul haque' বইটি দারুণ সহায়ক।

#বাংলাদেশ ও #আন্তর্জাতিক বিষয়াবলীর জন্য প্রস্তুতি নেয়ার ক্ষেত্রে পরামর্শ হলো প্রিলিমিনারীর প্রস্তুতি নেয়ার সময়েই সিলেবাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলীর বিস্তারিত জেনে নিতে বিসিএস এর লিখিত পরীক্ষার জন্য বের হওয়া বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিষয়ের বইগুলো থেকে সাহায্য নিন। ভেতরের নাড়ী নক্ষত্রগুলো জানা থাকার কারণে দেখবেন অনেক ব্যাপারই আপনাকে কষ্ট করে মুখস্ত করতে হচ্ছে না। এমনিই মনে থাকছে ব্যাপারগুলো।

#দেশীয় ও #আন্তর্জাতিক কিছু পত্রিকা পড়ার চেষ্টা করতে পারেন নিয়মিত। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অংশগুলো। দেখবেন বেশ সাহায্য পাবেন। যদিও স্বাস্থ্য ক্যাডারের অধিকাংশ প্রার্থীই ব্যস্ততার জন্য কাজটি করতে পারবেন না বলেই মনে হয়। আপনি যদি করতে পারেন তাহলে আপনি এক কদম এগিয়ে গেলেন!

#অন্তত এই কয়েকমাস প্রতিমাসে কারেন্ট এফেয়ার্স, নিউজ বা কিছু একটা নিয়মিত পড়ুন। লাভটা টের পাবেন অবশ্যই।

#প্রিলিমিনারী পরীক্ষার মাস খানেক আগে প্রফেসর'স এর একটা "৩৮ তম বিসিএস বিশেষ সংখ্যা" বের হবে। সংগ্রহে রাখার মতো দারুণ একটি প্রকাশনা এটি।

#বাংলাদেশের_সংবিধান সম্পর্কে সম্যক একটা ধারণা নিয়ে নিবেন অবশ্যই। প্রয়োজনে এক সপ্তাহ শুধু সংবিধান নিয়ে পরে থাকুন। এতে কি কি ভাগ আছে, অনুচ্ছেদসমূহ, কোনটা কী সম্পর্কিত, ব্যাখ্যা কি, সংশোধনীগুলো কী কী, তফসিল কি কি হ্যান ত্যান যা আছে সব জেনে নিন। গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদগুলোর ধারাক্রমসহ মুখস্ত করে ফেলুন পুরো। বিসিএস এর জন্য সংবিধান সম্পর্কিত জ্ঞান খুবই গুরুত্বপুর্ণ। দেখবেন অনেক জায়গায় আপনি সংবিধানের এই জ্ঞান বেঁচে খেতে পারছেন!

#ভৌগোলিক ব্যাপারগুলো জানতে বাংলাদেশের ও বিশ্বের দুটো ম্যাপই সংগ্রহে রাখলে এবং নিয়মিত দেখলে ভালো হয়। গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোর অবস্থান সম্পর্কে ভালো একটা দখল রাখা জরুরী। যেমন, মহাদেশ, মহাসাগরগুলো কোথায় আছে, কী কী দেশ আছে, বিভিন্ন অঞ্চলগুলো কিভাবে ভাগ করা হচ্ছে। বিভিন্ন সীমান্ত আর প্রণালী গুলো কোথায় আছে, কাদের মাঝে আছে, কাকে কাকে যুক্ত করছে এগুলো বুঝতে পারলে প্রস্তুতি নেয়াটা দারুণ মজার ব্যাপার হবে।

#বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের জন্য গণিত হচ্ছে 'গোল্ড মাইন'। যিনি গণিতে ভালো করবেন তিনি বেশ এগিয়ে যাবেন। সুতরাং একদম শেষ মূহুর্তে গণিত নিয়ে না বসে প্রথম থেকেই প্রতিদিন অন্তঃত একটা করে অধ্যায় থেকে প্রস্তুতি নিন। বেশ উপকার হবে। অংক করার সময় মূলনিয়ম আর শর্টকাট দু ভাবেই করে রাখুন। তাহলে লিখিত পরীক্ষার সময়েও আপনি বেশ এগিয়ে থাকবেন। গণিত প্রস্তুতির ক্ষেত্রে আমি এসিওরেন্স সিরিজের গণিত বইটিকে এগিয়ে রাখবো। আর শর্টকাট নিয়মে অংক করতে বাজারে বেশ ভালো কিছু বইও পাওয়া যায়। চাইলে সংগ্রহ করতে পারেন। আর মানসিক দক্ষতা বিষয়টাতে সামান্য একটু শ্রম দিলেই দারুণ ফল পাওয়া সম্ভব। সুতরাং এটাও একটু দেখবেন আপনার অলস অবসরগুলোতে।

# সাধারণ বিজ্ঞান, কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন এর প্রস্তুতির জন্য প্রস্তুতি সিরিজের নির্ধারিত ঐ বইগুলো থেকে দেখলেই যথেষ্ট হবে। আলাদা করে তেমন কিছু পড়তে হবে না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়েও কিন্তু বেশী নম্বর তোলার সুযোগ থাকে আমাদের। আর নৈতিকতা, মুল্যবোধ ও সুশাসনের কিছু প্রশ্নোত্তর কমন সেন্স থেকেই উত্তর করার সুযোগ থাকে। তাই অনুশীলন করলে নিজেকে প্রস্তুত রাখতে পারবেন।

# সার্বিকভাবে বিগত বছরগুলো প্রশ্নের ধারা বিবর্তন দেখতে চাইলে একটি বিসিএস প্রশ্নব্যাংক কিনতে পারেন। তবে এটা খুব জরুরী নয়।

# কেউ যদি প্রস্তুতি সহায়তা নিতে কোন #কোচিং এ ভর্তি হতে চান বাঁধা নেই। এটি আপনাকে ভালোই সাহায্য করবে প্রস্তুতি নিতে। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে বলছি চিকিৎসদের জন্য কোচিং করা একটু কঠিন। চাইলে শুধু পরীক্ষাগুলোও দিতে পারেন। তাতেও কিছুটা লাভ হবে। তবে কোচিং না করলেই যে চান্স পাওয়া যাবে না এমনটি ভাবার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। প্রতি বিসিএস এই শত শত চিকিৎসক কোন কোচিং না করেই স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ পাচ্ছেন।

পরিশেষে এটুকুই বলবো বর্তমানে বেসরকারী স্বাস্থ্যখাতের বেশ উন্নয়ন হলেও চাকরির বাজারে সরকারী চাকরির অবস্থান বেশ এখনো বেশ ওপরে। নানা প্রতিবন্ধকতা থাকার পরও সুযোগ সুবিধার, চাকরির নিশ্চয়তায় বিসিএসকে এখনই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। নানা দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার যে সব কথা আমরা শুনতে পাই; আমাদের স্বপ্ন থাকা উচিত কর্মজীবনে গিয়ে এই অব্যস্থাপনাগুলোকে দূর করতে আমরা কাজ করে যাবো। আমরা সৈনিকের ভূমিকা পালন করবো দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে। এই শপথটুকু যদি আমরা যোগ করে নিতে পারি আমরা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের কর্মব্যস্ততায়; আশা করি তাহলে দীর্ঘ প্রস্তুতির এই কষ্টগুলো আমাদের শপথের তীব্রতার কাছে ম্লান হয়ে যাবে।

ভালো থাকুন। আল্লাহ হাফেজ।

 

  এই বিভাগের সর্বাধিক পঠিত